কলকাতাঃ
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর রাজ্যজুড়ে তৈরি হয়েছে নজিরবিহীন রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংকট। নির্বাচনে বড় ব্যবধানে পরাজয়ের দাবি উঠলেও মুখ্যমন্ত্রীর পদ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা ব্যানার্জি। বিজেপি দাবি করেছে, ২৯৪ আসনের মধ্যে তারা ২০৭টি আসনে জয় পেয়েছে এবং স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। তবে মমতা ব্যানার্জির অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনের সহায়তায় পরিকল্পিতভাবে ভোটে কারচুপি করে ফলাফল পাল্টে দেওয়া হয়েছে।
নির্বাচনী ফল ঘোষণার পর মঙ্গলবার সন্ধ্যায় এক সংবাদ সম্মেলনে মমতা ব্যানার্জি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, তিনি নির্বাচন হারেননি এবং রাজভবনে গিয়ে পদত্যাগপত্র জমা দেবেন না। তার ভাষায়, “আমি হারিনি। এই ফলাফল জনগণের রায় নয়, এটি চুরি করা ফল।” তিনি অভিযোগ করেন, বিজেপি ও নির্বাচন কমিশনের যোগসাজশে ভোটার তালিকা পরিবর্তন, প্রশাসনিক প্রভাব এবং নানা অনিয়মের মাধ্যমে নির্বাচনের ফল প্রভাবিত করা হয়েছে।
এই অবস্থানকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক উত্তেজনা দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারতের ইতিহাসে এ ধরনের পরিস্থিতির খুব কম নজির রয়েছে। কারণ, সাধারণত কোনো মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচনে পরাজিত হলে সাংবিধানিক রীতি অনুযায়ী পদত্যাগ করেন এবং নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়া পর্যন্ত কেয়ারটেকার সরকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু এবার সেই প্রচলিত রীতি মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন মমতা ব্যানার্জি।
বর্তমান পরিস্থিতিতে রাজ্যপাল আরএন রবির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রাজ্যপাল প্রথমে মুখ্যমন্ত্রীকে বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণের নির্দেশ দিতে পারেন। যদি মমতা ব্যানার্জি তা প্রমাণে ব্যর্থ হন, তাহলে রাজ্যপাল সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে বিজেপিকে সরকার গঠনের আহ্বান জানাতে পারেন।
ভারতীয় সংবিধানের ১৬৪(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মুখ্যমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা ‘গভর্নরের সন্তুষ্টি পর্যন্ত’ দায়িত্ব পালন করেন। অর্থাৎ বিশেষ পরিস্থিতিতে গভর্নর মুখ্যমন্ত্রীকে অপসারণের সুপারিশও করতে পারেন। এছাড়া পরিস্থিতি আরও জটিল হলে রাষ্ট্রপতির শাসন জারির সুপারিশ করার সাংবিধানিক সুযোগও রয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বর্তমান মেয়াদ শেষ হচ্ছে বৃহস্পতিবার রাত ১২টার পর। কিন্তু নতুন সরকার শপথ নেওয়ার সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে আগামী ৯ মে। ফলে মাঝের সময়টুকুতে প্রশাসনিক শূন্যতা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অন্তর্বর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলায় অল্প সময়ের জন্য রাষ্ট্রপতি শাসন জারির সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
নির্বাচন কমিশন ২৯৩টি আসনের গেজেট নোটিফিকেশন রাজ্যপালের কাছে জমা দিয়েছে। বিজেপি জানিয়েছে, তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে সরকার গঠনের জন্য প্রস্তুত এবং রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তীর দিন ৯ মে নতুন মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠান আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আগামী ৪৮ ঘণ্টা পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মমতা ব্যানার্জি শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত নেন, রাজ্যপাল কী পদক্ষেপ নেন এবং বিজেপি সরকার গঠনের আমন্ত্রণ পায় কি না, তার ওপরই নির্ভর করছে রাজ্যের সাংবিধানিক সংকট কোন দিকে মোড় নেয়।