শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ
সুন্দরবনের নোনা মাটির জীবনযুদ্ধে যাঁদের হাতের সঙ্গী ছিল হাঁড়ি-কলসি, আজ তাঁরাই জার্সি গায়ে মাঠ কাঁপাচ্ছেন। সন্দেশখালি-সহ গোটা সুন্দরবনের আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকার মহিলারা ফুটবলে যে বিপ্লব ঘটিয়েছেন, তারই প্রতিচ্ছবি মিলল ‘ওমেন্স গোল্ড কাপ ২০২৫’-এর উদ্বোধনী দিনে।
উত্তর ২৪ পরগনার সন্দেশখালি ১নং ব্লকের হাটগাছি গ্রাম পঞ্চায়েতের কানমারী মোহনবাগান ক্লাবের সবুজ গালিচায় বাঁশির সুর উঠতেই শুরু হয়ে যায় টুর্নামেন্টের কিক অফ। মাঠে তখন একঝাঁক তরুণী—হিঙ্গলগঞ্জ, হাসনাবাদ, মিনাখাঁ, হাড়োয়া থেকে সন্দেশখালি—সুন্দরবনের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে উঠে আসা আদিবাসী মেয়েরা। দেশজুড়ে মহিলা ফুটবলারদের উত্থান তাঁদের চোখে স্বপ্ন জাগিয়েছে। তাই ঝুমুর-পাতা নাচের নুপুর খুলে তাঁরা আঁকড়ে ধরেছেন ফুটবল, খুঁজছেন নিজের ভাগ্যের নতুন লিখন।
টুর্নামেন্টের আবহ আরও রঙিন হয়ে ওঠে দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা অতিথি দলের উপস্থিতিতে। উত্তর প্রদেশ, বিহারসহ একাধিক রাজ্যের ফুটবলাররা যোগ দেওয়ায় প্রতিযোগিতার মান এবং উত্তেজনা দুটোই বেড়ে যায় কয়েকগুণ। স্থানীয় মানুষের ভিড়, আকাশভরা ঢাকের সুর আর মেয়েদের প্রাণোচ্ছল দৌড়ে কানমারীর মাঠ যেন উৎসবে মেতে ওঠে।
উদ্যোক্তা ও সন্দেশখালীর বিধায়ক সুকুমার মাহাতো চৌধুরী বলেন, “বাংলার জনপ্রিয় ফুটবলকে আরও শক্ত ভিত্তি দিতে এবং সুন্দরবনের মেয়েদের জাতীয় মঞ্চে তুলে ধরতে আমাদের একাডেমির এই প্রয়াস। কন্যাশ্রী কাপ, কলকাতা লিগ—সব ক্ষেত্রেই ওদের এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা অপরিসীম।”
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ডেবরার বিধায়ক ও প্রাক্তন আইপিএস হুমায়ুন কবির, সন্দেশখালি ২ পঞ্চায়েত সমিতির কৃষি কর্মাধ্যক্ষ দিলীপ মল্লিক, সভাপতি রৌফানা ইয়াসমিনসহ একাধিক বিশিষ্ট অতিথি।
সুন্দরবনের ছয়টি ব্লক—সন্দেশখালি ১ ও ২, হিঙ্গলগঞ্জ, হাসনাবাদ, মিনাখাঁ এবং হাড়োয়া—এর অধিকাংশ অঞ্চলই আদিবাসী অধ্যুষিত। নৌকাভিত্তিক জীবন, নোনাজলের সঙ্গে লড়াই, আর্থিক অনটন—সব বাধা পেরিয়ে এখানকার মেয়েরা আজ ফুটবলের ময়দানে নিজের ভবিষ্যৎ খুঁজছেন। মাঠে তাঁদের চোখে তাই শুধু খেলার উত্তেজনা নয়, আছে মুক্ত আকাশে উড়তে চাওয়ার জেদও।
স্থানীয় প্রশিক্ষকদের কথায়, ফুটবলই আজ এই মেয়েদের আত্মবিশ্বাস ও আত্মনির্ভরতার ভাষা। তাঁরা শুধু খেলতে নয়, জিততেও এসেছে—জিতে ফিরতে চায় নিজের জীবনের বিরুদ্ধে লড়া লড়াইটাকেও।
সুন্দরবনের নোনা বাতাসে ফুটবলের নতুন নিশ্বাস—এই মেয়েরা প্রমাণ করছেন, সুযোগ পেলে আকাশই তাঁদের সীমানা। ‘ওমেন্স গোল্ড কাপ ২০২৫’ তাই শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়, সুন্দরবনের মহিলাদের নতুন স্বপ্ন, নতুন লড়াই এবং নতুন পরিচয়ের প্রতীক।