মেসির শেষ ম্যাচ দেখতে কেরালা থেকে আর্জেন্টিনা, ৪০ ঘণ্টার যাত্রায় ১৫ হাজার কিমি পাড়ি ইয়াদিল এম ইকবালের
শান্তিপ্রিয় রায় চৌধুরী
পছন্দের খেলোয়াড়ের প্রতি ভালোবাসা যে কতখানি তা দেখালেন কেরালার কেদুনগালুর ছেলে ইয়াদিল ইকবাল। আর্জেন্টিনার জার্সিতে লিওনেল মেসির শেষ ম্যাচ দেখার টিকিট অনলাইনে পাননি ইকবাল। তাই বিকল্প পথ খুঁজে নিতে তার অসুবিধা হয়নি। আর্জেন্টিনার জার্সিতে লিওনেল মেসির শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচটি দেখার জন্য কেরালার ছেলে ইয়াদিল এম ইকবাল ম্যাচের ঠিক ১ দিন (২৪ ঘণ্টা) আগে বুয়েনস আইরেসে পৌঁছান।
কেরালার কোদুনগালুর থেকে রওনা দিয়ে সড়ক ও আকাশপথ মিলিয়ে তাঁর এই দীর্ঘ ১৫,০০০ কিলোমিটারের যাত্রা সম্পন্ন করতে প্রায় ৪০ ঘণ্টা সময় লেগেছিল। তিনি ম্যাচটি শুরু হওয়ার মাত্র এক দিন আগে পৌঁছাতে পেরে ছিলেন। লন্ডন ও নিউইয়র্ক হয়ে বুয়েনস এইরেসে পা রাখেন ইকবাল। প্রায় ১৫ হাজার কিলোমিটারের এই দীর্ঘ বিমানযাত্রায় তাঁর বিপুল অংকের অর্থ ব্যয় হলেও বিমানের টিকিটের সঠিক মূল্য গণমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়নি।
ইয়াদিল ইকবাল
এদিকে বুয়েনস এইরেসে যেতে ব্যাগ গোছানোর সময় ইকবাল নীল–সাদা রঙের একটি ঘড়িও সঙ্গে নেন। ইচ্ছা ছিল ঘড়িটি মেসিকে দেবেন। তবে তার ইচ্ছা পূরণ হয়নি। দীর্ঘ এ যাত্রায় তাঁকে একাধিক জায়গায় থামার সঙ্গে বিমানবন্দরে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। ইনস্টাগ্রামে ১৭ লাখ অনুসারীর জন্য পুরো ভ্রমণের ভিডিও বা ছবি নথিভুক্ত করেন ইকবাল।
বুয়েনস এইরেসে যাওয়ার পথে একটুকুও ক্লান্তি বা উৎকণ্ঠা কাজ করেনি ইকবালের মনে। ২০২২ বিশ্বকাপের উদাহরণ টেনে আল–জাজিরাকে ইকবাল বলেছেন, 'কাতারে বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলা দেখতে গিয়েছিলাম। সেদিনও কোন ক্লান্তি আসেনি মনে। কাতারে যাওয়ার সময় সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করেছিলাম মেসি যেন বিশ্বকাপ জেতে। চার বছর আগে সে এটা অর্জন করেছে এবং আমি নিজের চোখেই দেখেছি। এখন কিছুই আর বড় চ্যালেঞ্জ মনে হয় না।’
ইকবাল প্রমাণ করেছেন ভাগ্য সাহসীদের সহায় হয়। কারণ, আর্জেন্টিনায় পৌঁছানোর কয়েক ঘণ্টা পরেই আরাধ্য সেই ম্যাচের টিকিট পেয়ে যান ইকবাল। এ নিয়ে বলতে গিয়ে ইকবাল বলেন, 'রিসেল মার্কেট থেকে শেষ মুহূর্তে টিকিটটি সংগ্রহ করতে তাঁর এক হাজার ডলার খরচ হয়েছিল। টিকিটের দাম ছিল মূল দামের তিন গুণ।'
মেসির নামে ইকবাল তাঁর সন্তানের নাম রেখেছেন ‘লিয়ান মেসিল’। ইকবালের মতোই কেরালার একটা বড় অংশ এবং ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতার মানুষও মেসির জন্য পাগল। তাঁর জন্ম হতে পারে রোজারিও শহরে। কিন্তু কেরালায় মেসি প্রায় সবারই আপনজন।
লিওনেল মেসির শেষ ম্যাচ
ইকবাল তাঁর সেই ‘আপনজনে’র জন্য ৩২ মিটার লম্বা, ২০ ফুটবল প্রস্থের ম্যুরাল বানিয়েছে। মেসির বিভিন্ন ট্রফি জয়ের মুহূর্তও রাখা হয় এ ম্যুরালে। ইকবাল বলেছেন, ‘আর্জেন্টিনা ২০২১ সালের কোপা আমেরিকা জেতার পর আমি বাড়ির কাছে এটি তৈরি করিয়েছিলাম। তবে চলতি বছরের জুনে জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানানোর পর ইনস্টাগ্রামে এটি দেখতে পান মেসি। সেটাই ছিল আমার জীবনের সেরা দিন।'
কোদুনগালু থেকে সড়কপথে ১৩ ঘণ্টা ভ্রমণ করে বেঙ্গালুরু যান ইকবাল। সেখান থেকে বিমানে লন্ডন ও নিউইয়র্ক হয়ে পৌঁছে যান বুয়েনস এইরেসে। তারপর গতকাল বুধবার ভারতীয় সময় ভোরে সেখানে মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে বসে জাতীয় দলের হয়ে মেসির খেলা শেষ ম্যাচটি দেখেন। বেনিনের বিপক্ষে এই প্রীতি ম্যাচে আর্জেন্টিনার ৩–০ গোলের জয়ে একটি গোল করার সঙ্গে আরও দুটি গোল করান মেসি। তা তিনি চোখ ভরে দেখে মনে শান্তি পেয়েছেন, এটাই বারবার বলছেন ইকবাল।
তিনটি রেস্টুরেন্টের মালিক ইকবাল বলেছেন, ‘জানি বড় ঝুঁকি নিয়েছি। ভারতে টিকিটের খোঁজ করেছি। প্রতারণার শিকার হতে পারি সেটাও জানতাম। তাই সেরা উপায় ছিল সেখানে গিয়ে টিকিট সংগ্রহ করা। সৌভাগ্যবশত একটি পেয়ে যাই, তবে তিনগুণ বেশি দাম দিতে হয়েছে। তা হোক, এই (মেসি) মানুষটা যে আমার জীবন পাল্টে দিয়েছে। আমার হৃৎস্পন্দনে শুধু তারই দখল।’
মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে পঞ্চম সারিতে বসে আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির শেষ ম্যাচটি উপভোগ করেন ইকবাল। তাঁর ভাষায়, ‘খুব কাছাকাছিই ছিলাম তার। প্রায় ১০ মিটারের দূরত্ব। এটা আমার জীবনের অন্যতম সেরা মুহূর্ত হয়ে থাকবে। হয়তো কিংবদন্তিদের ম্যাচে আমরা মেসিকে আবারও দেখব। কিন্তু জাতীয় দলে প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে তো আর দেখা যাবে না।’
কেরালায় ফুটবলের জনপ্রিয়তা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার মধ্যে সীমাবদ্ধ। আর্জেন্টিনা ও মেসির সমর্থক হওয়ায় ২০২১ সাল পর্যন্ত ইকবালকে ব্রাজিল সমর্থকদের অনেক খোঁচা সহ্য করতে হয়েছে।
শুনুন তাঁর মুখেই, ‘ব্রাজিলের সমর্থকেরা অনেক জ্বালিয়েছে। তারা বলত মেসি অভিশপ্ত। সে কখনোই আর্জেন্টিনার হয়ে ট্রফি জিতবে না। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো (২০১৬) ইউরো জেতায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। ২০২১ কোপা আমেরিকা ফাইনালের আগে তারা বলেছিল, ব্রাজিলের জার্সি পরে আমার রেস্টুরেন্টে এসে খাবার খাবে। আমি তাদের বলেছি, আর্জেন্টিনার জার্সি পরে এলে বিনা মূল্যে খাবার সরবরাহ করব। আর্জেন্টিনা শেষ পর্যন্ত জিতল এবং ভক্তরাও উদ্যাপনের উপলক্ষ পেয়ে যান।’
২০২১ কোপা আমেরিকার পর ফিনালিসিমা, বিশ্বকাপ এবং তারপর আবারও (২০২৪) কোপা আমেরিকা জেতে আর্জেন্টিনা। ইকবাল এর আগে প্রথম বিদেশ সফরে যান ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে।