দেশে ও বিদেশে পাকিস্তানকে ৫০০ ম্যাচে সমর্থন দেওয়া পাকিস্তান ক্রিকেটের ‘চাচা’ যাচ্ছেন অবসরে, এখন তৈরি করবেন ক্রিকেট মিউজিয়াম

Story by  Shanti Roy Chowdhury | Posted by  Aparna Das • 1 d ago
দেশে ও বিদেশে পাকিস্তানকে ৫০০ ম্যাচে সমর্থন দেওয়া পাকিস্তান ক্রিকেটের ‘চাচা’ যাচ্ছেন অবসরে, এখন তৈরি করবেন ক্রিকেট মিউজিয়াম
দেশে ও বিদেশে পাকিস্তানকে ৫০০ ম্যাচে সমর্থন দেওয়া পাকিস্তান ক্রিকেটের ‘চাচা’ যাচ্ছেন অবসরে, এখন তৈরি করবেন ক্রিকেট মিউজিয়াম
 
শান্তিপ্রিয় রায় চৌধুরী 

এতদিন দেখা গেছে ক্রিকেটাররা ঘটা করে অবসর নেন, ঘোষণা দিয়ে অবসর নেন অনেক ক্রিকেটের আম্পায়ারও। কিন্তু এমন কি কখনো দেখেছেন গ্যালারিতে যাঁরা খেলা দেখেন, সেই দর্শকও কি বলেকয়ে অবসর নিয়ে থাকেন?
 
না, না, কখনোই দেখেননি। এবার আর কয়েকটা দিন বাদেই দেখবেন। লাহোরে পাকিস্তান অস্ট্রেলিয়ার শেষ ওয়ানডে ম্যাচে এই চাচাকে নিয়ে গলা কাটাচ্ছেন পাকিস্তানের সমর্থকরা!  হয়তো তিনি ফেয়ারওয়েলও পাবেন!
 
পাকিস্তানের হয়ে দেশে ও বিদেশে খেলা দেখতে দেখতেই যাঁর নামই হয়ে গেছে ‘চাচা ক্রিকেট’। তিনি তো এখন ‘সাধারণ দর্শক’ নন। পাকিস্তানের ক্রিকেটের অতি জনপ্রিয় ব্যক্তি। সেই চাচাই গতকাল অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন।
 
আগামী ৪ জুন লাহোরে পাকিস্তান–অস্ট্রেলিয়ার তৃতীয় ও শেষ ওয়ানডেতে দেশের মাটিতে শেষবারের মতো পাকিস্তানের হয়ে গলা ফাটাবেন চাচা। তবে ৭৭ বছর বয়সী এই দর্শক চাচা এখানেই পুরোপুরি থামছেন না। আগামী আগস্ট–সেপ্টেম্বরে পাকিস্তানের তিন টেস্টের সিরিজ হবে ইংল্যান্ডে। সেই সফরে পাকিস্তানের সঙ্গী হবেন এই চাচা। আর ইংল্যান্ডের লর্ডস,ওভাল, এজবাসটনের গ্যালারিতে সবুজ কুর্তা আর টুপি পরা মানুষটি পতাকা হাতে নিয়ে শেষবারের মতো দলকে সমর্থন দেবেন।
 
সবুজ কুর্তা আর টুপি পরা মানুষটিকে চেনেন না, এমন ক্রিকেটপ্রেমী পাকিস্তানে খুব কমই আছেন। তাছাড়া বিশ্ব ক্রিকেট প্রেমিরাও চাচাকে ভালোভাবেই চেনেন। কয়েক দশক ধরে হাতে পাকিস্তানের পতাকা, মুখে চিরচেনা স্লোগান, আর দলের প্রতি নিঃশর্ত ভালোবাসা, এভাবেই পাকিস্তান ক্রিকেটের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছিলেন ‘চাচা ক্রিকেট’।
 
চাচা ক্রিকেটের আসল নাম আবদুল জলিল। ১৯৬৮-৬৯ সালে ইংল্যান্ডের পাকিস্তান সফরের সময় লাহোরের গ্যালারি থেকে প্রথম ক্রিকেট ম্যাচ দেখা শুরু করেছিলেন তিনি। এরপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তান ক্রিকেটের সবচেয়ে পরিচিত সমর্থকে পরিণত হন। বিশেষ করে ১৯৮০ ও ৯০-এর দশকে শারজা ক্রিকেট স্টেডিয়ামে পাকিস্তানের ম্যাচগুলোতে তাঁর উপস্থিতি ছিল নিয়মিত। গাঢ় সবুজ কুর্তা ও টুপিতে আলাদা পরিচয় তৈরি হয় তখন থেকেই।
 
সংযুক্ত আরব আমিরাতে চাকরি করতেন জলিল। পরে সেই চাকরি ছেড়ে পাকাপাকিভাবে পাকিস্তান দলের সমর্থকে পরিণত হন। ১৯৯৯ বিশ্বকাপে ওয়াসিম আকরামের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান দলকে সমর্থন জানাতে ইংল্যান্ডেও গিয়েছিলেন। এরপর থেকেই ক্রিকেটবিশ্বে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন তিনি। এখন ৭৭ বছর বয়সী জলিলের নতুন স্বপ্ন, নিজের শহর শিয়ালকোটে একটি রেস্তোরাঁ ও জাদুঘর গড়ে তোলা। 
 
ইএসপিএনক্রিকইনফোকে তিনি বলেছেন, ‘বছরের পর বছর ধরে সংগ্রহ করা সব স্মারক আমি জাদুঘরে প্রদর্শন করব। পাকিস্তানকে ৫০০ ম্যাচে সমর্থন দেওয়ার লক্ষ্য ছিল আমার, সেটা আমি পূরণ করেছি।’
 
এখন চাচা জলিল পাকিস্তানে এক ধরনের সাংস্কৃতিক চরিত্র। স্থানীয় টেপটেনিস টুর্নামেন্ট থেকে বিয়ের অনুষ্ঠান, সব জায়গাতেই তার উপস্থিতি কামনা করা হচ্ছে। আর অবসরের পর সেই জনপ্রিয়তাকে তিনি সমাজকল্যাণমূলক কাজে ব্যবহার করতে চান।
 
তবে পাকিস্তান ক্রিকেটের বর্তমান অবস্থা দেখে চাচা জলিল রীতিমতো হতাশ। ২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ দেখতে শ্রীলঙ্কায় যাওয়ার কথা ছিল তার, কিন্তু শেষ পর্যন্ত যাননি তিনি। কেন? জলিল চাচা বলেছেন,‘গত বছর এশিয়া কাপে ভারতের কাছে পাকিস্তানের টানা তিন হার দেখেছি। এখন ভারতের কাছে আমরা টানা নয়টি ম্যাচ হেরেছি। এশিয়া কাপের পর আরেকটি হার দেখতে আমি চাইনি।’
 
তবু চাচার স্মৃতির ভান্ডারে আনন্দের মুহূর্তও কম নেই। ১৯৮৬ সালে শারজাহতে জাভেদ মিয়াঁদাদের সেই বিখ্যাত শেষ বলের ছক্কা এখনও ভালো মনে আছে তাঁর, ‘আমি মাঠেই ছিলাম। এখনও মনে আছে, মিয়াঁদাদ বলটা ডিপ মিডউইকেটের ওপর দিয়ে পাঠিয়েছিল।’ ২০১৭ সালে ওভালে ভারতের বিপক্ষে চ্যাম্পিয়নস ট্রফির ফাইনাল জয়ের স্মৃতিও জলিলের কাছে বিশেষ। 
 
তবে কিছু হার এখনও কষ্ট দেয় চাচাকে। ২০২৪ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে নিউইয়র্কে ভারতের বিপক্ষে ১২০ রান তাড়া করতে না পারা ও ২০১১ বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে মোহালিতে ভারতের কাছে হার, দুটি ম্যাচই এখনও ভুলতে পারেন নি চাচা।
 
চাচা বলেছেন,'২০২৩ সালের পর থেকে বিদেশের মাটিতে কোনো টেস্ট জিততে পারেনি পাকিস্তান। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আইসিসির বড় টুর্নামেন্টেও সাফল্য নেই। মনে খুব কষ্ট দেয়।' তবু আশা ছাড়েননি ‘চাচা ক্রিকেট’। তিনি মনে করেন, ‘খেলাধুলায় এমনটা হয়েই থাকে। আবার দিন ফিরবে পাকিস্থানের।’