'কুরআন ও বিজ্ঞান' বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের একটি দৃশ্য
আওয়াজ দ্য ভয়েস / নয়া দিল্লি
দেশের সম্মানিত কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া আবারও প্রমাণ করেছে যে এটি শুধু উচ্চশিক্ষার কেন্দ্রই নয়, বরং বিশ্বব্যাপী বৌদ্ধিক আলোচনা ও মতাদর্শগত বিতর্কের এক গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চও বটে। জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ভিলায়াত ফাউন্ডেশন এবং ইরানের তেহরানের শাহিদ বেহেশতি বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে ২০২৬ সালের ২৮–৩০ জানুয়ারি তিনদিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলন “কোরআন ও বিজ্ঞান” অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এতে ভারত, ইরান, ইন্দোনেশিয়া এবং ইউরোপের খ্যাতনামা পণ্ডিত, শিক্ষাবিদ ও গবেষকরা অংশ নেন।
জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন উপাচার্য ড. এম এ আনসারী, অধ্যাপক মজহার আসিফ এবং রেজিস্ট্রার মুহাম্মদ মেহতাব আলম রিজভী। উপাচার্য অধ্যাপক মজহার আসিফ বলেন, মানবতার প্রকৃত সাফল্য নিহিত আছে কোরআনের শিক্ষা অনুধাবন, গভীর চিন্তন এবং তা বাস্তবে প্রয়োগের মধ্যে। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান যে, যে কোরআন সমাজকে নৈতিকতা, চরিত্র ও ন্যায়ের পথে পরিচালিত করত, আজ তা অনেকাংশে শুধু আনুষ্ঠানিক আচারে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, আজ কোরআনকে আবারও জীবনের পথনির্দেশক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার প্রয়োজন রয়েছে, একটি কিতাব হিসেবে যাকে বোধ ও মনন দিয়ে পড়তে হবে, হৃদয় ও চরিত্রে ধারণ করতে হবে এবং ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক জীবনের প্রাণস্পন্দন হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। অধ্যাপক আসিফ আরও উল্লেখ করেন যে, ধর্মের প্রকৃত আত্মা হলো এমন আচরণ, কথা ও কাজ যা অন্যের ক্ষতি না করে বরং মানবিক মঙ্গল বয়ে আনে।
মুখ্য অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখতে গিয়ে জামিয়ার রেজিস্ট্রার অধ্যাপক মুহাম্মদ মেহতাব আলম রিজভী বলেন, কোরআনের বহু আয়াতে বৈজ্ঞানিক সত্য ও তথ্যের প্রতি মানবতার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। পানি সৃষ্টির প্রক্রিয়া, মহাবিশ্বের বিস্তৃতি, মৃত্তিকা থেকে মানুষের সৃষ্টি, আকাশমণ্ডলের নিয়ম, দুই সমুদ্রের মধ্যবর্তী প্রাকৃতিক সীমারেখা, এমন বহু উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, কোরআন শুধু আধ্যাত্মিক দিশাই দেখায় না, বরং মানবজাতিকে মহাবিশ্বের বৈজ্ঞানিক নীতিমালা নিয়ে চিন্তায় উদ্বুদ্ধ করে।
সম্মেলনের মুখ্য বক্তা ও হায়দরাবাদের মৌলানা আজাদ ন্যাশনাল উর্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য অধ্যাপক আসলাম পারভেজ বলেন, কোরআন ও সুন্নাহ মানুষকে শিক্ষা দেয় যে ভালোবাসা ও করুণা কেবল মুখের দাবি হয়ে থাকলে চলবে না, তা অবশ্যই কর্মের মাধ্যমে প্রকাশ পেতে হবে। তিনি ইসলামের সেই নীতির কথাও স্মরণ করিয়ে দেন যেখানে বলা হয়েছে, অতিরিক্ত সম্পদ সমাজ ও মানবতার কল্যাণে ব্যয় করতে হবে, যাতে সামাজিক ভারসাম্য বজায় থাকে।
'কুরআন ও বিজ্ঞান' বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের একটি দৃশ্য
সম্মেলনের সঞ্চালক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের প্রধান ও মানবিক ও ভাষা অনুষদের অধ্যাপক ইকতিদার মুহাম্মদ খান বলেন, কোরআন মানুষকে সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে বিক্ষিপ্ত নিদর্শনগুলো সম্পর্কে জ্ঞান ও প্রজ্ঞার সহিত চিন্তা-ভাবনা করতে আহ্বান জানিয়েছে। তাঁর মতে, এই চিন্তা-চর্চা কেবল বৌদ্ধিক বিকাশের পথই নয়, বাস্তব জীবনের উন্নতিরও প্রধান মাধ্যম।
বিশিষ্ট অতিথি অধ্যাপক আখতারুল ওয়াসেই তাঁর বক্তব্যে বলেন, কোরআন ও বিজ্ঞান উভয়ই মানবতাকে একই চূড়ান্ত সত্যের দিকে পরিচালিত করে। কোরআন নীতিমালা উপস্থাপন করে, আর বিজ্ঞান সেই নীতিগুলো বোঝার ও ব্যাখ্যা করার পথ দেখায়।
অধ্যাপক সৈয়দ শাহিদ আলী, যিনি ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের প্রাক্তন প্রধান, বলেন ইসলামিক সভ্যতার সূচনা থেকেই কোরআন পর্যবেক্ষণ, যুক্তি, চিন্তন এবং জ্ঞান-অন্বেষণকে উৎসাহিত করে আসছে। তিনি প্রথম অবতীর্ণ আয়াতের প্রসঙ্গে বলেন, ইসলামে জ্ঞান সন্ধান কোনো পার্থিব প্রয়োজনেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা এক পবিত্র ইবাদত।
'কুরআন ও বিজ্ঞান' বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের একটি দৃশ্য
ইরানের প্রাক্তন প্রথম মহিলা ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. জামিলেহ সাদাত আলামোলহোদা তরুণ-তরুণীদের উদ্দেশে বলেন, বৌদ্ধিক নিরাপত্তা ও বাস্তবিক সাফল্যের জন্য কোরআনের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। একইভাবে, ভারতে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত ড. মুহাম্মদ ফাতালিও কোরআনকে তার প্রকৃত অর্থ ও বার্তার সঙ্গে পাঠ করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতার প্রতিনিধি অধ্যাপক আব্দুল মাজিদ হাকিম ইলাহী বলেন, আধুনিক বৈজ্ঞানিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ আমাদের উপলব্ধি করিয়ে দেয় যে কোরআনের উদ্দেশ্য হলো মানুষের চেতনাকে জাগ্রত করা। কুয়েতের প্রকৌশলী মুস্তাফা আব্বাস এবং সাইয়্যেদ কালবে জওয়াদ নকভীও কোরআন ও বিজ্ঞানের সুষম সম্পর্ক নিয়ে তাঁদের মতামত তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানের সূচনা হয় ড. মুহাম্মদ মুনাওয়ার কামালের হৃদয়স্পর্শী কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে। কার্যক্রম সঞ্চালনা করেন সহযোগী অধ্যাপক জুনেইদ হারিস ও ড. মেহদি বাকির, এবং ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন ড. মুহাম্মদ মুস্তাক। সম্মেলনে জামিয়ার বিভিন্ন বিভাগের প্রধান, অধ্যাপক-গবেষক, দেশ-বিদেশের পণ্ডিত এবং বিপুল সংখ্যক ছাত্র-ছাত্রী উপস্থিত ছিলেন। এই সম্মেলনের সমাপনী অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে ২০২৬ সালের ৩০ জানুয়ারি সকাল ১০টায়, জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার সেন্টার ফর ইনফরমেশন অ্যান্ড টেকনোলজি (CIT)-এ।