আওয়াজ দ্য ভয়েস ব্যুরো
ভারতের বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাগত ঐতিহ্যে মুসলিম সমাজের বহু ব্যক্তি শিক্ষা, সমাজসেবা ও বৌদ্ধিক নেতৃত্বের মাধ্যমে দেশের অগ্রগতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। এই ব্যক্তিদের অনুপ্রেরণামূলক জীবনযাত্রা কেবল মুসলিম সমাজের জন্য নয়, সমগ্র দেশের জন্যই আদর্শ হয়ে উঠেছে।
এই প্রতিবেদনে ভারতের এমন কয়েকজন মুসলিম শিক্ষাবিদ, সমাজ সংস্কারক ও ইতিহাসবিদের বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে, যাঁরা তাঁদের দূরদৃষ্টি, নিষ্ঠা ও সেবার মাধ্যমে শিক্ষা ও সমাজকে এক নতুন দিশা প্রদান করেছেন।
১. খালিক আহমদ নিজামি: খালিক আহমদ নিজামি (Khaliq Ahmad Nizami) একজন ভারতীয় ইতিহাসবিদ, ধর্মীয় পণ্ডিত ও কূটনীতিক। ১৯২৫ সালের ৫ ডিসেম্বর উত্তর প্রদেশের আমরোহায় জন্মগ্রহণ করা নিজামি ১৯৪৫ সালে ইতিহাস বিষয়ে এম এ এবং ১৯৪৬ সালে আগ্রা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি ডিগ্রি সম্পূর্ণ করেন। ১৯৪৭ সালে তিনি আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
১৯৭৪ সালে নিজামি বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৫ সাল থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত তিনি সিরিয়ায় ভারতের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। নিজামি সাহেব মধ্যযুগীয় ভারতীয় ইতিহাস, বিশেষত দিল্লি সুলতানি ও সুফিবাদের ওপর গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন। তাঁর প্রধান গ্রন্থসমূহ হল— On History and Historians of Medieval India, Royalty in Medieval India, The Life & Times of Shaikh Nizam-u'd-din Auliya, The Life and Times of Shaikh Farid-ud-din Ganj-i-Shakar, Some Aspects of Religion and Politics in India During the 13th Century, Medieval India: A Miscellany।
খালিক আহমদ নিজামি এবং তাঁর রচিত একটি গ্রন্থ
তাঁর গবেষণামূলক কাজের মধ্যে শাহ ওয়ালিউল্লাহের রাজনৈতিক চিঠিপত্র প্রকাশ অন্তর্ভুক্ত, যা ভারতীয় মুসলিম ইতিহাসে তাঁর অবদান সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছিল। তাঁর স্মৃতিতে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘কে এ নিজামি সেন্টার ফর কোরআন স্টাডিজ’ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এটি কোরআন ও ইসলামিক অধ্যয়নের ক্ষেত্রে শিক্ষা ও গবেষণাকে প্রসারিত করে।
২. অধ্যাপক সৈয়দ আইনুল হাসান: অধ্যাপক সৈয়দ আইনুল হাসান বহুভাষাবিদ, সাহিত্যিক ও দক্ষ প্রশাসক। তিনি মৌলানা আজাদ ন্যাশনাল উর্দু ইউনিভার্সিটির (MANUU) উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর নেতৃত্বে এখানে ডিজিটাল শিক্ষা, একাডেমিক উদ্ভাবন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাদান নতুন উচ্চতা লাভ করেছিল।
অধ্যাপক সৈয়দ আইনুল হাসান
জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের পারসি ও মধ্য এশিয়ান স্টাডিজ বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে তিনি পারসি সাহিত্য, ভারত-ইরান সাংস্কৃতিক সম্পর্ক ও ঐতিহাসিক অধ্যয়নের ওপর উল্লেখযোগ্য গবেষণা করেছেন। তাঁর গ্রন্থ ও অনুবাদগ্রন্থ উর্দু, হিন্দি ও পারসি সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে ভারত সরকার তাঁকে দশক-দশক ধরে চলা একাডেমিক সাধনা ও ভাষাগত নিষ্ঠার জন্য জাতীয় সম্মান পদ্মশ্রী পুরস্কার প্রদান করে।
৩. ড. জাহির আই কাজি: ড. জাহির আই কাজি অঞ্জুমান-ই-ইসলামের সভাপতি। এই শিক্ষামূলক সংস্থাটি সারা দেশে ৯০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে। ড. কাজি শিক্ষাকে সামাজিক ন্যায় ও সম্প্রদায়ের ক্ষমতায়নের মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলেছেন। তিনি পেশাগত প্রশিক্ষণ ও মানসম্পন্ন শিক্ষাকে পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়ের জন্য সহজলভ্য করে তুলেছেন।
ড. জাহির আই কাজি
তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির অধীনে অঞ্জুমান-ই-ইসলামে মেয়েদের শিক্ষায় বিশেষ গতি দেওয়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থানমুখী পাঠ্যক্রম চালু করে। ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে তাঁকে পদ্মশ্রী পুরস্কার প্রদান করা হয়।
৪. মৌলানা ড. কালবে সাদিক: মাওলানা ড. কালবে সাদিক ছিলেন একজন ইসলামিক পণ্ডিত, যিনি ধর্মের সঙ্গে সমাজ সংস্কার ও শিক্ষার সংমিশ্রণ ঘটিয়েছিলেন। তৌহিদুল মুসলিমীন ট্রাস্টের মাধ্যমে তিনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সহায়তা কেন্দ্র স্থাপন করেছিলেন, যেখানে দরিদ্র ও অভাবগ্রস্ত ছাত্র-ছাত্রীদের সহায়তা দেওয়া হতো।
মৌলানা ড. কালবে সাদিক
তিনি বিশেষত মুসলিম সম্প্রদায়ের মেয়েদের জন্য শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন এবং ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে উদার, বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারাকে প্রসারিত করেছিলেন। তাঁর চিন্তাধারায় ঐতিহ্য ও আধুনিকতার একটি অনন্য ভারসাম্য ছিল। ভারত সরকার ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসে মরণোত্তরভাবে তাঁকে পদ্মভূষণ পুরস্কার প্রদান করে।
৫. সৈয়দ হামিদ: সৈয়দ হামিদ ছিলেন ভারতীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের একজন বিশিষ্ট শিক্ষা সংস্কারক, প্রশাসক ও সমাজকর্মী। তিনি আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য এবং সাচার কমিটির সদস্য হিসেবে পরিচিত। সৈয়দ হামিদের জন্ম হয়েছিল উত্তর প্রদেশের ফৈজাবাদে।
আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ইংরেজি ও পারসি বিষয়ে এম এ সম্পূর্ণ করেন। ১৯৪৩ সালে উত্তর প্রদেশ সিভিল সার্ভিসে নির্বাচিত হয়ে সৈয়দ হামিদ ১৯৪৯ সালে ভারতীয় প্রশাসনিক পরিষেবায় যোগ দেন। এরপর তিনি প্রশাসনিক ক্ষেত্রে বহু গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হন।
১৯৮০ সালে তিনি এ এম ইউ-এর উপাচার্য হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে শৃঙ্খলা ও শিক্ষাগত সংস্কার কার্যকর করেন। তিনি বিভাগীয় প্রধানদের মেয়াদ ব্যবস্থা চালুর পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনকে শক্তিশালী করেন। ১৯৯২ সালে ভারতীয় মুসলিমদের মধ্যে শিক্ষা সম্পর্কে সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে ‘অল ইন্ডিয়া তালিমি কারাভান’ শুরু করেন।
সৈয়দ হামিদ
সৈয়দ হামিদ ১৯৯৩ সালে দিল্লিতে হামদর্দ পাবলিক স্কুল প্রতিষ্ঠা করে ১৯৯৯ সালে দিল্লির হামদর্দ বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর হন। এই বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘ডিমড ইউনিভার্সিটি’র মর্যাদা প্রদান করতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। শিক্ষা ও সমাজসেবার জন্য সৈয়দ হামিদ সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয়ের সাংস্কৃতিক পুরস্কার, উর্দু একাডেমি পুরস্কার, হিন্দি একাডেমি পুরস্কার এবং জাতীয় ফেলোশিপসহ বহু সম্মান লাভ করতে সক্ষম হন।
তাঁর স্মৃতিতে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র সেকেন্ডারি স্কুলের নামকরণ করা হয়েছে ‘সৈয়দ হামিদ সিনিয়র সেকেন্ডারি স্কুল’ এবং মৌলানা আজাদ ন্যাশনাল উর্দু ইউনিভার্সিটি, হায়দ্রাবাদের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের নামকরণ করা হয়েছে ‘সৈয়দ হামিদ সেন্ট্রাল লাইব্রেরি’। সৈয়দ হামিদের জীবন শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতার প্রতীক, যা আজও মানুষকে অনুপ্রাণিত করে।
৬. অধ্যাপক মুশিরুল হাসান: পদ্মশ্রী অধ্যাপক মুশিরুল হাসান শুধু একজন বিশিষ্ট ইতিহাসবিদই নন, বরং একজন প্রভাবশালী শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক ও চিন্তাবিদ হিসেবেও সমাজে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করেছেন। উপাচার্য হিসেবে তিনি জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়াকে একটি সাধারণ প্রতিষ্ঠান থেকে দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত করেছেন। অধ্যাপক হাসান কেবল একাডেমিক জগতের সঙ্গেই যুক্ত ছিলেন না, সামাজিক ও রাজনৈতিক বক্তৃতাতেও তিনি সক্রিয় ছিলেন। এনডিটিভি ও বিবিসির মতো প্ল্যাটফর্মে তাঁর উপস্থিতি প্রায়ই দেখা যেত। ইংরেজি ও উর্দু—দুই ভাষাতেই তিনি সাবলীলভাবে লিখতে ও বক্তৃতা দিতে পারতেন।
অধ্যাপক মুশিরুল হাসান
তিনি আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাস বিষয়ে স্নাতকোত্তর শিক্ষা গ্রহণ করে ইউরোপে যান। সেখানে তিনি উচ্চশিক্ষা লাভ করে পরে জামিয়ায় যোগ দেন। তাঁর পিতা জামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন, যার ফলে এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর একটি গভীর সম্পর্ক ছিল।
২০১৪ সালে ঘটে যাওয়া এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনার পর তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে, যদিও তিনি বেঁচে থাকার জন্য লড়াই চালিয়ে যান। তাঁর মৃত্যু ভারতীয় শিক্ষা জগতের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। সত্যিই তিনি ছিলেন এক চলমান প্রতিষ্ঠান।
৭. ড. নাইমা খাতুন: আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের ১২৩ বছরের গৌরবময় ইতিহাসে প্রথম মহিলা উপাচার্য হিসেবে অধ্যাপিকা নাইমা খাতুনকে নির্বাচন করা মহিলাদের ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে একটি বড় উদাহরণ। রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর অনুমোদনের পর শিক্ষা মন্ত্রণালয় তাঁর নিয়োগের ঘোষণা করেছিল। এমন সর্বোচ্চ পদে মহিলা আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে—এমন দেশের অল্প কয়েকটি কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে এ এম ইউ অন্যতম।
১৯৮৮ সালের আগস্ট মাসে এ এম ইউ-এর মনোবিজ্ঞান বিভাগে প্রভাষক হিসেবে একাডেমিক যাত্রা শুরু করা অধ্যাপিকা নাইমা খাতুন কঠোর পরিশ্রম ও নিষ্ঠার মাধ্যমে সহযোগী অধ্যাপক, অধ্যাপক এবং বিভাগীয় প্রধান পদে উন্নীত হন। ২০১৪ সালের জুলাই মাসে তিনি মহিলা মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ হিসেবেও নিয়োগ পান।
অধ্যাপক নাইমা খাতুন
রেসিডেনশিয়াল কোচিং একাডেমির উপপরিচালক, উপপ্রক্টর এবং প্রভোস্ট পদে অধিষ্ঠিত হয়ে তাঁর প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাও বিস্তৃত হয়েছে। তিনি রুয়ান্ডার ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতেও এক বছর অধ্যাপনা করেছেন। রাজনৈতিক মনোবিজ্ঞানে পিএইচডি ডিগ্রিধারী অধ্যাপক খাতুন বিশ্বের বহু দেশের স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা উপস্থাপন করেছেন।
অধ্যাপক নাইমা খাতুন ছয়টি গ্রন্থ এবং বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রবন্ধের লেখিকা। তাঁর এই কৃতিত্ব শুধু এ এম ইউ নয়, সমগ্র একাডেমিক জগতের নারীদের নতুন অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।
৮. অধ্যাপক নাজমা আখতার:
নাজমা আখতার (জন্ম ১৯৫৩) একজন বিশিষ্ট ভারতীয় শিক্ষাবিদ ও একাডেমিক প্রশাসক। তিনি ২০১৯ সালের ১২ এপ্রিল থেকে ২০২৩ সালের ১২ নভেম্বর পর্যন্ত জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার (জেএমআই) প্রথম মহিলা উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি শিক্ষাক্ষেত্রে অসীম অবদান রাখার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য স্থান রেখে গেছেন। নাজমা আখতার জামিয়ায় একটি মেডিকেল কলেজ স্থাপনের জন্য অক্লান্ত প্রচেষ্টা চালিয়েছেন এবং এর প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে।
আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্বর্ণপদক প্রাপ্ত হয়ে এবং জাতীয় বিজ্ঞান প্রতিভা বৃত্তি লাভের পর নাজমা কুরক্ষেত্র বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষা বিষয়ে পিএইচডি করেন। তিনি ব্রিটেনের ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ে কমনওয়েলথ ফেলোশিপের অধীনে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের শিক্ষা গ্রহণ করেন এবং প্যারিসের আন্তর্জাতিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণ লাভ করেন।
নাজমা আখতার
নাজমা আখতার ১৫ বছর ধরে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব এডুকেশনাল প্ল্যানিং অ্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এনইউইপিএ)-এ কর্মরত ছিলেন, যেখানে তিনি ১৩০টি দেশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের জন্য পাঠ্যক্রম পরিচালনা করেছিলেন। ইউনেস্কো, ইউনিসেফ এবং ডানিডার পরামর্শদাতা হিসেবেও তিনি কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন।
নেতৃত্বের ক্ষমতা, লিঙ্গ সমতার শক্তিশালী সমর্থক এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পটভূমির দলের সফল নেতৃত্বের জন্য নাজমা আখতারকে ২০২২ সালে পদ্মশ্রী পুরস্কারে সম্মানিত করা হয়। ২০২৩ সালে তিনি জামিয়ার সম্মানীয় "কার্নেল কমান্ড্যান্ট" হিসেবেও নিয়োগ লাভ করেন। তাঁর সমগ্র জীবন শিক্ষা ও নিষ্ঠার এক অনুপম দৃষ্টান্ত।
৯. ইরফান হাবিব: ইতিহাস চর্চায় ইরফান হাবিবকে বৌদ্ধিক বিপ্লবের পিতৃপুরুষ বলা হয়। ইরফান হাবিব (জন্ম ১৯৩১) ভারতের মধ্যযুগীয় ইতিহাস এবং কৃষি ব্যবস্থার উপর বিস্তৃত গবেষণা করা একজন খ্যাতিমান ইতিহাসবিদ। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ “The Agrarian System of Mughal India” ঐতিহাসিক অধ্যয়নের এক গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ইরফান হাবিব ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ ইতিহাস রচনার এক প্রধান স্তম্ভে পরিণত হয়েছিলেন।
ইরফান হাবিব
১০. উবাইদ সিদ্দিকীঃ উবাইদ সিদ্দিকী (১৯৩২–২০১৩) ভারতের একজন অগ্রণী জীববিজ্ঞানী, প্রতিষ্ঠান নির্মাতা ও প্রেরণাদায়ক ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষাজীবন শুরু করেন এবং পরবর্তীতে গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ডক্টরেট ডিগ্রির পরবর্তী গবেষণার সময় তিনি ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়ার আলকাইলাইন ফসফাটেজ জিনে মিউটেশন আবিষ্কার করেন, যা পরে "স্টপ" কোডন তত্ত্বের ভিত্তি হয়ে ওঠে।
১৯৬২ সালে হোমি জাহাঙ্গীর ভাবার আমন্ত্রণে সিদ্দিকী মুম্বাইয়ের টাটা ইনস্টিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ (টিআইএফআর)-এ মলিকুলার বায়োলজি ইউনিট প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭০ সালে ক্যালটেকে সেমুর বেনজারের সঙ্গে মিলে তিনি ফলমাছি (Drosophila melanogaster)-এর উষ্ণতা-সংবেদনশীল পক্ষাঘাতজনিত মিউট্যান্ট আবিষ্কার করেন, যা স্নায়ু সংবহন ও সাইনাপটিক ট্রান্সমিশন বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
উবাইদ সিদ্দিকী
নব্বইয়ের দশকে উবাইদ সিদ্দিকী বেঙ্গালুরুর ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োলজিক্যাল সায়েন্সেস (এনসিবিএস)-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রথম পরিচালক হন। এই প্রতিষ্ঠানটি আজ ভারতের জীববিজ্ঞানের এক উৎকর্ষকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পদ্মভূষণ (১৯৮৪) ও পদ্মবিভূষণ (২০০৬) সহ বহু সম্মানজনক অসামরিক পুরস্কার লাভ করেন। তিনি লন্ডনের রয়্যাল সোসাইটির ফেলোও ছিলেন। তাঁর বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার অবদান ভারতীয় জীববিজ্ঞানের পরিপ্রেক্ষিতে নতুন দিক উন্মোচন করেছে।