অসমে বহুবিবাহের রীতি নিম্নমুখী: মুসলিম সমাজে বড় পরিবর্তন

Story by  Daulat Rahman | Posted by  Aparna Das • 2 d ago
প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি
 
দৌলত রহমান / গুয়াহাটি

বহুবিবাহের প্রথা কি কেবল অসমের মুসলমান সমাজেই প্রচলিত? নাকি এ ধারণা আমাদের কুসংস্কার বা ভুল ধারণার ফল? অসম সরকার সম্প্রতি বহুবিবাহ নিষিদ্ধ করার লক্ষ্যে যে নতুন আইন প্রণয়ন করেছে, তার প্রেক্ষিতে এই প্রশ্নগুলি আরও বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। এই আইন ভঙ্গকারীদের সর্বোচ্চ সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। একইসঙ্গে সরকার জানিয়েছে, নিষেধাজ্ঞার ফলে যেসব নারী আর্থিক বা সামাজিক সংকটে পড়তে পারেন, তাঁদের জন্য ক্ষতিপূরণের তহবিল গঠন করা হবে।
 
কিন্তু মুম্বইয়ের 'ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর পপুলেশন সায়েন্সেস' (IIPS)-এর এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বহুবিবাহ কেবল মুসলমানদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, অসমের হিন্দুসহ অন্যান্য সম্প্রদায়ের মধ্যেও এটি বিদ্যমান। অবশ্য সমীক্ষাটি বলছে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রথার প্রচলন ক্রমশ কমছে।
 

রাষ্ট্রীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষা (NFHS)-এর তৃতীয় (২০০৫–০৬), চতুর্থ (২০১৫–১৬) এবং পঞ্চম (২০১৯–২১) পর্যায়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে IIPS দেখিয়েছে যে ১৫ বছরে অসমে বহুবিবাহের হার ৩.৩ শতাংশ থেকে নেমে ২.৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
 
NFHS-5 (পঞ্চম সমীক্ষা) অনুযায়ী, অসমে মুসলমানদের মধ্যে বহুবিবাহের হার ৩.৬ শতাংশ, হিন্দুদের মধ্যে ১.৮ শতাংশ এবং অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের মধ্যেও ১.৮ শতাংশ। লক্ষণীয়ভাবে, অন্যান্য ধর্মগোষ্ঠীর মধ্যে এ হার কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে, চতুর্থ সমীক্ষায় এটি ছিল মাত্র ০.৯ শতাংশ।
 
NFHS-3 অনুযায়ী, অসমে ২.১ শতাংশ হিন্দু, ৬.৯ শতাংশ মুসলমান এবং ১.৩ শতাংশ অন্যান্য ধর্মাবলম্বী বহুবিবাহে যুক্ত থাকার কথা স্বীকার করেছিলেন। পরবর্তী সমীক্ষায় তা কমে দাঁড়ায় যথাক্রমে ১.৮, ৩.৬ এবং ০.৯ শতাংশ।
 
একটি অসমিয়া মুসলিম পরিবারের বিয়ের দৃশ্য
 
মধ্য অসমের বিশ্বনাথ জেলা ও দক্ষিণ অসমের করিমগঞ্জ জেলায় এই হার সর্বোচ্চ ৪.২ শতাংশ। এই দু’টি জেলা দেশব্যাপী বহুবিবাহপ্রবণ শীর্ষ ৪০ জেলার মধ্যে রয়েছে। মেঘালয়ের পূর্ব জয়ন্তিয়া পাহাড় জেলা (যেখানে অধিকাংশই খ্রিস্টান) এই তালিকার শীর্ষে, সেখানে ২০ শতাংশ বিবাহিত নারী জানিয়েছেন, তাঁদের স্বামীর একাধিক স্ত্রী রয়েছে। NFHS-5 অনুযায়ী ওড়িশা (৩.৯%) এবং অসমে (৩.৬%) মুসলমান সমাজে বহুবিবাহের হার সর্বাধিক।
 
ভারতের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে তফসিলি জনজাতি (ST)-র মধ্যে বহুবিবাহের প্রচলন সবচেয়ে বেশি, যদিও সময়ের সঙ্গে সব গোষ্ঠীতেই এর হার কমেছে। ST নারীদের মধ্যেই এই প্রথা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়, NFHS-3 অনুযায়ী যা ছিল ৩.১ শতাংশ, যা NFHS-5-এ নেমে এসেছে ২.৪ শতাংশে। তফসিলি জাতি (SC) নারীদের ক্ষেত্রেও হার ২.২ শতাংশ থেকে কমে ১.৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
 
IIPS-এর সমীক্ষায় দেখা গেছে, NFHS-3-এ বৌদ্ধ (৩.৮%) এবং মুসলমান (২.৬%) ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে বহুবিবাহ কিছুটা বেশি ছিল। কিন্তু NFHS-5-এ দেখা যাচ্ছে, এখন এ প্রথা সবচেয়ে বেশি অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে (২.৫%), এরপর খ্রিস্টান (২.১%) এবং মুসলমান (১.৯%)। আবার সমীক্ষা বলছে, শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে বহুবিবাহ বেশি প্রচলিত।
 
অসমিয়া বহুবিবাহ চলচ্চিত্র গ্রাফিক্স: হাশমি
 
উত্তর-পূর্বাঞ্চল বিশেষ করে মেঘালয় এবং দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলির নারীসমাজ বহুবিবাহের বিষয়টি বেশি উল্লেখ করেছেন। NFHS-3-এ উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ ভারতের ৩.৩ এবং ৩ শতাংশ বিবাহিত নারী জানান যে তাঁরা বহুবিবাহের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি। NFHS-5-এ তা কমে যথাক্রমে ২.৬ এবং ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আরও জানা গেছে, উচ্চশিক্ষিত নারীদের তুলনায় শিক্ষাবিহীন নারীদের মধ্যে এ প্রথার প্রচলন বেশি।
 
গত বছরের ডিসেম্বর মাসে অসম বিধানসভা ‘অসম বহুবিবাহ নিষিদ্ধ আইন, ২০২৫’ পাস করে। এই আইনের লক্ষ্য হল বহুবিবাহসহ সংশ্লিষ্ট সমস্ত প্রথা নিষিদ্ধ করে অসম থেকে পুরোপুরি নির্মূল করা। তবে ষষ্ঠ তফসিলভুক্ত জনজাতীয় এলাকাগুলোকে এই আইনের আওতা থেকে বাদ রাখা হয়েছে। অসমের অধিকাংশ মুসলমান, বিশেষত নারীরা আইনটিকে প্রগতিশীল পদক্ষেপ বলে স্বাগত জানিয়েছেন, যদিও সম্প্রদায়ের একটি অংশ সতর্ক করেছে, আইনটি যেন কোনও নির্দিষ্ট ধর্মবিশেষকে লক্ষ্য করে প্রয়োগ না হয়।