পূর্বসূরী রোকেয়ার স্মৃতির সামনে নতজানু তসলিমা, ১৯ বছর পর কলকাতায় ফিরে শ্রদ্ধায় স্মরণ নারীজাগরণের অগ্রদূতকে
শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ
কলকাতায় ফিরে প্রথমেই চৌরঙ্গি, ময়দান বা কলেজ স্ট্রিট নয়; বরং উত্তর ২৪ পরগনার সোদপুরে বেগম রোকেয়া শাখাওয়াত হোসেনের স্মৃতিক্ষেত্রে পৌঁছে গেলেন বাংলাদেশের নির্বাসিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন। প্রায় ১৯ বছর পর কলকাতায় ফিরে তাঁর এই সফর নিছক সৌজন্য নয়, বরং নারীজাগরণ, শিক্ষার অধিকার এবং মৌলবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের এক ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য বলেই মনে করছে সাহিত্য ও সংস্কৃতি মহল।
এদিন তসলিমা যান সোদপুরের পানিহাটি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় চত্বরে, যেখানে সংরক্ষিত রয়েছে বেগম রোকেয়ার স্মৃতিফলক। সেখানে তিনি ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান এবং কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। পরে বিদ্যালয়ের ছাত্রী, শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সঙ্গে কথাও বলেন। বিদ্যালয়ের পড়ুয়ারা তাঁকে স্বাগত জানিয়ে রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন করে।
তসলিমা নাসরিন বলেন, "মৌলবাদীদের চটিয়েছিলেন বলেই কলকাতায় রোকেয়ার শেষের মাটি হয়নি।" যদিও ইতিহাসবিদদের একাংশের মতে, এই বক্তব্যের প্রত্যক্ষ ঐতিহাসিক প্রমাণ মেলে না। তবে রোকেয়ার সমাধি নিয়ে সে সময় নানা সামাজিক বাধা ও বিতর্কের কথা বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। শেষ পর্যন্ত সোদপুরে শ্বশুরবাড়ির পারিবারিক জমিতেই ১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বর তাঁকে সমাহিত করা হয়। পরবর্তী সময়ে সেই জমির উপরই গড়ে ওঠে পানিহাটি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়।
বাংলা ভাষার দুই ভিন্ন সময়ের দুই প্রতিবাদী নারীর এই প্রতীকী মিলন বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। বেগম রোকেয়া ছিলেন নারীশিক্ষা ও মুসলিম সমাজে নারীজাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ। ১৯১১ সালে কলকাতায় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন শাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস' স্কুল, যা আজও নারীশিক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। অন্যদিকে তসলিমা নাসরিনও দীর্ঘদিন ধরে নারীস্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার এবং ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে লেখালেখি করে আন্তর্জাতিক পরিচিতি লাভ করেছেন। এই দুই নারীর সংগ্রামের মধ্যে আদর্শগত সাদৃশ্য রয়েছে বলেই মনে করছেন গবেষকরা।
রোকেয়ার সমাধিক্ষেত্র দীর্ঘদিন অবহেলায় পড়ে থাকলেও আশির দশকে ইতিহাসপ্রেমী ও স্থানীয় উদ্যোগে তাঁর স্মৃতিচিহ্ন পুনরুদ্ধারের কাজ শুরু হয়। বর্তমানে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে রয়েছে তাঁর স্মৃতিফলক ও আবক্ষ মূর্তি। সেই স্থানেই শ্রদ্ধা নিবেদন করে তসলিমা যেন ইতিহাসের এক লড়াকু নারীর কাছে আর এক লড়াকু নারীর প্রণাম জানালেন।
কলকাতায় ফিরে একাধিকবার তসলিমা জানিয়েছেন, এই শহর তাঁর অত্যন্ত প্রিয়। সুযোগ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে তিনি আবারও কলকাতায় থাকতে চান। তবে এবারের সফরের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত হয়ে রইল সোদপুরে বেগম রোকেয়ার স্মৃতির সামনে তাঁর নীরব উপস্থিতি। নারীশিক্ষা, স্বাধীন চিন্তা এবং সাম্যের আদর্শে বিশ্বাসী দুই প্রজন্মের দুই লেখিকার এই প্রতীকী সংযোগ নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিল—সময় বদলায়, কিন্তু প্রতিবাদ ও মুক্তচিন্তার উত্তরাধিকার কখনও হারিয়ে যায় না।