অধ্যাপিকা শাবিনা নিচাত ওমর শিক্ষা, প্রশাসন ও নারী ক্ষমতায়নের এক অসামান্য দৃষ্টান্ত

Story by  Sampee Chakroborty Purkayastha | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 11 h ago
অধ্যাপক শাবিনা নিচাত ওমর
অধ্যাপক শাবিনা নিচাত ওমর
 
 শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ

পশ্চিমবঙ্গের সমাজ, প্রশাসন, শিক্ষা ও সংস্কৃতির ব্যাপক প্রেক্ষাপটে মুসলিম নারীদের অগ্রগতি আজ এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। তাঁরা দীর্ঘদিনের সামাজিক বাধা, সীমাবদ্ধতা এবং লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যকে জয় করে এখন নেতৃত্বের পদে অধিষ্ঠিত হতে সক্ষম হয়েছেন। এই পরিবর্তনের অন্যতম উজ্জ্বল মুখ হলেন অধ্যাপিকা শাবিনা নিছাত ওমর, যাঁর জীবন আধুনিক সমাজে নারীর আত্ম-ক্ষমতায়নের এক অসামান্য উদাহরণ। দীর্ঘদিনের সামাজিক বাধা এবং লিঙ্গবৈষম্য সত্ত্বেও, তিনি আজ কেবল একজন শিক্ষাবিদই নন, সমগ্র সমাজের জন্য এক শক্তিশালী অনুপ্রেরণা। 

পঁচিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে শিক্ষাজগতে সক্রিয় অধ্যাপক ওমর শুধু একজন শিক্ষাবিদই নন, তিনি একজন দক্ষ প্রশাসক, অনুপ্রেরণাদায়ী বক্তা এবং সাবলীল বহুভাষী উপস্থাপকও। তিনি বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত আছেন। একই সাথে, আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু কলেজের ইংরেজি বিভাগের প্রধান হিসেবে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্বও সমানভাবে প্রশংসনীয়।
 

তার পেশাগত জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল মিল্লি আল-আমিন মহিলা কলেজে উনিশ বছর শিক্ষকতা করা, যেখানে তিনি পনেরো বছর ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়ে তিনি প্রতিষ্ঠানটিকে একটি আধুনিক, সুশৃঙ্খল ও ছাত্রবান্ধব ক্যাম্পাসে রূপান্তরিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

প্রশাসনিক দক্ষতার পাশাপাশি অধ্যাপক ওমরের বহুমুখী কর্মকাণ্ড তাঁকে একটি স্বতন্ত্র পরিচয় দিয়েছে। তিনি একজন কৃতী যুক্তিবিদ, বাগ্মী বক্তা এবং অসাধারণ আবৃত্তিকার, যার মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মঞ্চে তাঁর সুচিন্তিত মতামত প্রকাশ করেছেন। নারী ক্ষমতায়ন, ডিজিটাল শিক্ষা, জেন্ডার স্টাডিজ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার প্রসারে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ তাঁকে সমসাময়িক সমাজে একজন প্রভাবশালী চিন্তাবিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

বিভিন্ন সেমিনার, কর্মশালা ও শিক্ষামূলক ফোরামে তাঁর উপস্থিতি তরুণ প্রজন্মের কাছে একটি জোরালো বার্তা পৌঁছে দেয়—যে শিক্ষা শুধু একটি পেশা নয়, এটি সামাজিক রূপান্তরের অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ার। একজন বক্তা ও প্রশিক্ষক হিসেবে তিনি নেতৃত্বের বিকাশ, নারীর আত্মনির্ভরশীলতা, ভাষাগত দক্ষতা এবং আধুনিক সমাজের প্রতিকূলতা মোকাবেলার কৌশলের উপর আলোকপাত করেন।

 
অধ্যাপক শাবিনা নিচাত ওমর

অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে দামিনী শি পুরস্কার এবং ডিসরাপ্ট উইমেন্স লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ডসহ একাধিক পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে। এছাড়াও, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ইন্টারন্যাশনাল ভিজিটর লিডারশিপ প্রোগ্রামে তাঁর মনোনয়ন তাঁর কাজের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিকে আরও জোরদার করেছে।

তিনি বর্তমানে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রশাসনিক ও অ্যাকাডেমিক দায়িত্বেও সক্রিয়ভাবে জড়িত। কলেজ পর্যায়ে কোষাধ্যক্ষ এবং ইন্টার্নশিপ নোডাল অফিসার হিসেবে শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে তাঁর উদ্যোগগুলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

অধ্যাপিকা শাবিনা নিশাত ওমরের জীবনযাত্রা শুধু একটি ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; এটি আধুনিক সমাজে নারীর আত্মপ্রতিষ্ঠার একটি নীলনকশা বা মডেল। তাঁর মতো ব্যক্তিত্বরা প্রমাণ করেন যে, সঠিক মনোভাব, শিক্ষার প্রতি নিষ্ঠা এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকলে একজন নারী কেবল নিজের স্থানই তৈরি করতে পারেন না, বরং অন্যদের জন্যও পথ তৈরি করে দিতে পারেন।

সেমিনার মঞ্চে তাঁর উপস্থিতি কেবল একজন বক্তা হিসেবে অংশগ্রহণই নয়, বরং তা এক অনুপ্রেরণার উৎস, যেখানে একজন নারী তাঁর জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বের মাধ্যমে আধুনিক সমাজে নিজের স্থান প্রতিষ্ঠা করেন।