স্বপ্ন থেকে ককপিটে: পাইলট হানা মহসিন খানের অনুপ্রেরণাদায়ক যাত্রা

Story by  atv | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 2 d ago
স্বপ্ন থেকে ককপিটে: পাইলট হানা মহসিন খানের অনুপ্রেরণাদায়ক যাত্রা
স্বপ্ন থেকে ককপিটে: পাইলট হানা মহসিন খানের অনুপ্রেরণাদায়ক যাত্রা

বিদুষী গৌড়

হানা মহসিন খান ভারতের ৩৪ জন মুসলিম মহিলা পাইলটের মধ্যে একজন এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় তার সক্রিয় উপস্থিতির জন্য সম্ভবত তিনিই সবচেয়ে বেশি পরিচিত।

হানার এই উত্থান সহজ ছিল না; সাংবাদিকতা এবং একটি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি পরিচালনার পরেই তিনি এই পর্যায়ে পৌঁছেছেন। একজন মুসলিম মহিলা হিসেবে বড় হয়ে ওঠার সময় হানাকে সমাজ ও পরিবারের প্রত্যাশার চাপের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে।


তিনি সৌদি আরবে স্কুলের পড়াশোনা শেষ করেন এবং পরে কলেজের পড়াশোনার জন্য উত্তর প্রদেশের মীরাট শহরে নিজের বাড়িতে ফিরে আসেন। সৌদি আরবে থাকার সময় তিনি এমন এক সমাজে বাস করেছিলেন, যেখানে মহিলাদের পুরুষদের সমান বলে মনে করা হতো না; অন্যদিকে নিজের দেশে ফিরে আসার পর মুসলিম সমাজে তাকে একটি “ফাস্ট গার্ল” (fast girl) বলে আখ্যা দেওয়া হয়।

 
 
এর ফলেই তিনি কলেজের পড়াশোনার জন্য দিল্লিতে যেতে বাধ্য হন।বিমান পরিবহন ক্ষেত্রে হানার আগমন ছিল আকস্মিক। তার মতে, ২০১৪ সালে ত্রিবান্দ্রমে কয়েকজন পাইলটের সঙ্গে দেখা করার সময়ই তিনি জীবনের প্রকৃত লক্ষ্য উপলব্ধি করেন এবং তাদের সঙ্গে কথা বলার মধ্যেই আকাশে ওড়ার সিদ্ধান্ত নেন।

পাইলট হওয়ার প্রশিক্ষণের যোগ্যতা অর্জনের জন্য হানাকে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে। খুব ভালোভাবে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর তিনি তিনটি ফ্লাইং টেস্টে পাশ করে বাণিজ্যিক উড়ানের লাইসেন্স (commercial flying license) অর্জন করেন। পরবর্তীতে, উড়ানের প্রশিক্ষণের জন্য তিনি আমেরিকার ফ্লোরিডা এবং এয়ারবাস উড়ানোর বিশেষ দক্ষতা অর্জনের জন্য গ্রিসে যান।
 

ককপিটে হানা মহসিন খান

২০২০ সালে হানা তার প্রথম বাণিজ্যিক বিমান উড়ান। “আমি একটি সুন্দর ল্যান্ডিং (অবতরণ)-এর জন্য প্রার্থনা করেছিলাম এবং সেটি সত্যিই সুন্দর হয়েছিল। আমাকে এই সুযোগ দেওয়ার জন্য আমি এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড এবং পৃথিবীর প্রতি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ অনুভব করেছিলাম। আমি ভেবেছিলাম, যদি আজ আমার মৃত্যুও হয়, তবুও আমার কোনো আক্ষেপ থাকবে না।”

তিনি মনে করেন, মহিলাদের একে অপরকে সাহায্য করা উচিত। “আমাদের যতটা সম্ভব সাহায্যের প্রয়োজন। এত কষ্টের মধ্য দিয়ে যাওয়ার পর বিশেষ করে ভারতের সব মহিলারই সহায়তা দরকার। আমরা নিজেদের সম্পর্কে এমন অনেক কথা শুনি যা সত্য নয়, আমাদের রাস্তায় উত্যক্ত করা হয়, হয়রানি করা হয়, তবুও আমরা লড়াই করি, আমরা লড়তে শিখি।”

তার মতে, প্রতিবাদ করা একটি ধাপে ধাপে এগোনো প্রক্রিয়া, যা ভয় থেকে শুরু হয় এবং ধীরে ধীরে রাগে পরিণত হয়ে পরে কাজে রূপ নেয়। “একবার কল্পনা করুন তো, আমাদের কত শক্তি আছে! ভেঙে না পড়ে, স্থির থেকে, কাজ করে, সাধারণ মানুষের মতো আচরণ করে, অন্যদের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে নিজের পরিবার ও সমাজের যত্ন নেওয়া—একবার কল্পনা করে দেখুন...”

হানা মহসিন খান

হানা বলেন, “আমি ছোট স্কার্ট পরেছি নাকি নিজেকে মাথা থেকে পা পর্যন্ত ঢেকে রেখেছি—তার ভিত্তিতে আমাকে বিচার করা উচিত নয়; এর কোনো একটি বিকল্পই আমার ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না।” তিনি আরও বলেন, “আমি হিজাব না পরলে আমি কম মুসলমান হয়ে যাই না। একজন মহিলা হিসেবে আমরা আগেই অনেক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হই। তার ওপর আমাদের ‘মুসলিম মহিলা’ হিসেবে আলাদা করে দেখা হয়, এবং আরও কিছু বাহ্যিক কারণ মুসলিম হওয়াকে কঠিন করে তোলে। তাই এখানে অনেক জটিলতা রয়েছে।”

লিঙ্গ বৈষম্য বোঝাতে হানা একটি মজার ঘটনার উল্লেখ করেন। একবার তিনি জামা মসজিদে অজু করছিলেন, তখন একজন ব্যক্তি এসে বলেন যে তিনি ভুলভাবে অজু করছেন, কারণ পানি তার কনুই পর্যন্ত পৌঁছায়নি। সঙ্গে সঙ্গে তিনি জবাব দেন, “আপনার অজুও নষ্ট হয়ে গেছে, কারণ আপনি অজু করার বদলে আমাকে দেখতেই ব্যস্ত ছিলেন।”

তিনি মনে করেন, বিমানবন্দর ও বিমানের ভেতরে অনেক সুন্দর মানবিক গল্প তৈরি হয়। “সেদিন আমি একজন মানুষকে তার স্ত্রীর সঙ্গে ভিডিও কলে বিমানের ভেতরের দৃশ্য দেখাতে দেখেছিলাম। আমি তার পাশ দিয়ে হাঁটছিলাম এবং দেখেছিলাম তারা কতটা খুশি ছিল।”

বোনদের সঙ্গে হানা মহসিন খান

সেদিন একজন সিআইএসএফ (CISF) মহিলা কর্মকর্তা হানাকে প্রশংসা করে বলেছিলেন, “ম্যাডাম, আপনাকে ইউনিফর্মে খুব সুন্দর লাগছে।” হানা জবাব দেন, “আপনাকেও আপনার ইউনিফর্মে সুন্দর লাগছে, ইউনিফর্ম সব মহিলাকেই মানায়।”

হানার সবচেয়ে প্রিয় মুহূর্তগুলোর একটি ছিল—একবার একটি ৫ বছরের ছোট মেয়ে তাকে ইউনিফর্মে দেখে তার মাকে জিজ্ঞেস করেছিল, “মেয়েরাও কি পাইলট হতে পারে?” মেয়েটির মা হানার দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “অবশ্যই পারে।” হানা স্নেহভরে মেয়েটির মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিলেন, “সোনা, আমি যদি পারি, তুমিও পারবে।”

ভবিষ্যতে যারা বিমান পরিবহন ক্ষেত্রে আসতে চায়, তাদের সাহায্য করার জন্য হানা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করেন। তার একটি ইনস্টাগ্রাম স্টোরিতে তিনি উড়ান ও এভিয়েশন ক্যারিয়ার নিয়ে প্রায় ১,০০০টি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন।

বিমান চালানোর পাশাপাশি তিনি একজন আগ্রহী পাঠক, খাদ্যপ্রেমী, পোষা প্রাণীর যত্নশীল (pet mom) এবং একজন খণ্ডকালীন লেখক। তিনি মনে করেন, “বয়স শুধু একটি সংখ্যা। আপনি যদি কিছু করতে চান, তাহলে আমাকে বিশ্বাস করুন—শুধু এগিয়ে যান, দেখবেন সবকিছু নিজে থেকেই ঠিক হয়ে যাবে।”

অন্যান্য পাইলটদের সঙ্গে হানা মহসিন খান

সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি শেয়ার করা উড়ানের অভিজ্ঞতার আরেকটি গল্প হলো হরিয়ানার এক বৃদ্ধা মহিলার প্রতিক্রিয়া। দিল্লি-গয়া গামী বিমানটি চালানোর সময় ওই বৃদ্ধা ককপিটের ভেতরে তাকিয়ে হানাকে দেখেছিলেন।

“একজন বৃদ্ধা ককপিটের ভেতরে দেখতে চেয়েছিলেন, আর যখন তিনি আমাকে দেখলেন, তিনি হরিয়ানভি ভঙ্গিতে অবাক হয়ে বলে উঠলেন, ‘অরে, এখানে তো একটা মেয়ে বসে আছে!’”

এক্স (X)-এ একটি পোস্টে তিনি লিখেছিলেন, “আমি আমার হাসি থামাতে পারছিলাম না।”