এহসান ফাজিলি / শ্রীনগর
উত্তরপ্রদেশের আমরোহা জেলার মাটিতে শিকড় থাকলেও, সারা রিজভির বেড়ে ওঠা মুম্বাই শহরে। জীবনের নানা বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও, সেখানকার পরিবেশ ও অভিজ্ঞতাই তাঁকে সিভিল সার্ভিসে যোগ দেওয়ার স্বপ্ন দেখায় এবং সেই লক্ষ্যেই তিনি নিজের পথ তৈরি করেন।
২০০৮ ব্যাচের গুজরাট ক্যাডারের আইপিএস অফিসার সারা বর্তমানে জম্মু ও কাশ্মীরের উদমপুর-রিয়াসি পুলিশ রেঞ্জের ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল (DIG) পদে কর্মরত আছেন, আন্তঃক্যাডার ডেপুটেশনে। তিনি ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে এই দায়িত্ব গ্রহণ করেন। গুজরাট ও জম্মু-কাশ্মীরে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করে এবং কঠিন দায়িত্ব সফলভাবে সম্পন্ন করার পর তিনি জানুয়ারি মাসে ইন্সপেক্টর জেনারেল অফ পুলিশ পদে পদোন্নতি পান।
সারা রিজভি বর্তমানে জম্মু ও কাশ্মীরে ডিআইজি পদে থাকা একমাত্র মহিলা পুলিশ অফিসার। শিক্ষক, বিদ্বান, ডাক্তার ও ইঞ্জিনিয়ারদের পরিবারে জন্ম হলেও, তাঁর দাদুর প্রভাবেই তিনি সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ হওয়ার অনুপ্রেরণা পান। কিছু কারণে তিনি তাঁর দাদুর বাড়িতেই বড় হন। পেশায় আইনজীবী সেই দাদুর কাছ থেকেই ছোটবেলা থেকেই সমাজসেবার মূল্যবোধ তিনি শেখেন এবং সেটিকেই জীবনের লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেন।
তিনি বাণিজ্যে স্নাতক (বি.কম) ডিগ্রি অর্জন করেন এবং আর্থিক সমস্যার কারণে একটি বেসরকারি সংস্থায় চাকরি শুরু করেন। একই সঙ্গে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার প্রস্তুতিও চালিয়ে যান। তাঁর লক্ষ্য ছিল সিভিল সার্ভিসে উত্তীর্ণ হওয়া।
আর্থিক সমস্যার মধ্যেও তিনি টিউশন পড়িয়ে নিজের প্রস্তুতি চালিয়ে যান। অবশেষে তৃতীয় প্রচেষ্টায় ২০০৮ সালে তিনি এই কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং গুজরাট ক্যাডারের প্রথম মুসলিম মহিলা আইপিএস অফিসার হিসেবে ইতিহাস গড়েন।
সিভিল সার্ভিসে স্থির হওয়ার পরই ব্যক্তিগত জীবনে আসে বড় ধাক্কা, কোভিডে তিনি তাঁর স্বামীকে হারান। এই ক্ষতি তাঁর জীবনে আরও এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। বর্তমানে তিনি একক মা হিসেবে তাঁর পাঁচ বছরের কন্যার দায়িত্ব সামলাচ্ছেন এবং পাশাপাশি নিজের দায়িত্বপূর্ণ কাজ নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করছেন। ব্যক্তিগত জীবনের এই কঠিন পরিস্থিতি থেকে নিজেকে সামলে নিতে তিনি চ্যালেঞ্জিং দায়িত্বকেই অগ্রাধিকার দেন এবং ২০২২ সালে গুজরাট থেকে জম্মু-কাশ্মীরে আন্তঃক্যাডার ডেপুটেশনে যোগ দেন।
বর্তমান দায়িত্বের আগে তিনি 'পুলিশ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ব্যুরোতে' এসএসপি (SSP) ট্রেনিং হিসেবে কাজ করেছেন। ২০২২ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে তিনি জম্মু-কাশ্মীর পুলিশ সদর দপ্তরে ডিআইজি (অ্যাডমিনিস্ট্রেশন) ছিলেন। পরে তিনি জম্মু-কাশ্মীরে ডিআইজি আইআরপি (ইন্ডিয়ান রিজার্ভ পুলিশ) হিসেবে নিযুক্ত হন এবং অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে ডিআইজি ট্রেনিং পদও সামলান। জম্মু-কাশ্মীরে আসার আগে গুজরাটে তিনি এএসপি রাজকোট (গ্রামীণ), এসএসপি জামনগর, ডিসিপি রাজকোট সিটি, ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর কাশ্মীর ডেস্কে সহকারী পরিচালক এবং সিকিমের গ্যাংটকে সাবসিডিয়ারি ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
তাঁর উল্লেখযোগ্য দায়িত্বগুলির মধ্যে রয়েছে ২০১২ সালের গুজরাট বিধানসভা নির্বাচন (এসএসপি জামনগর হিসেবে), ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচন (ডিসিপি রাজকোট সিটি হিসেবে), ২০১৬-১৭ সালে সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গে গোর্খাল্যান্ড আন্দোলন সামলানো, ২০১৭ সালে ভারত-চীন ডোকলাম সংঘাত মোকাবিলা, এবং ২০২৪ সালের লোকসভা ও জম্মু-কাশ্মীর বিধানসভা নির্বাচনে নির্বাচন ব্যয়ের নোডাল অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন।
IPS সারা রিজভি পদোন্নতি লাভের মুহূর্তে
তাঁর অসামান্য পরিষেবার জন্য তিনি বহু সম্মান ও প্রশংসা পেয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে পুলিশ স্পেশাল ডিউটি মেডেল ও তার প্রথম বার (২০১৯), পুলিশ অন্তরিক সুরক্ষা সেবা পদক (২০১৯), ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর ডিরেক্টর ও বিএপিআরঅ্যান্ডডি-র ডিজির প্রশংসাপত্র, ২০২৩ সালে জম্মু-কাশ্মীরের ডিজিপির প্রশংসাপত্র এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনে নোডাল অফিসার হিসেবে অসামান্য কাজের জন্য লেফটেন্যান্ট গভর্নরের প্রশংসা।