কলকাতা থেকে আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতার মঞ্চে সারা আজিজ, কলমের জোরে উঠে আসছে চাপা পড়া গল্প

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 17 h ago
কলকাতা থেকে আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতার মঞ্চে সারা আজিজ, কলমের জোরে উঠে আসছে চাপা পড়া গল্প
কলকাতা থেকে আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতার মঞ্চে সারা আজিজ, কলমের জোরে উঠে আসছে চাপা পড়া গল্প
 
শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ

কোনও খবরের শিরোনাম হওয়ার জন্য সবসময় আলোয় দাঁড়াতে হয় না। কখনও কখনও অন্ধকারের দিকে তাকিয়েই শুরু হয় সাংবাদিকতার আসল কাজ। সেই অন্ধকারে চাপা পড়ে থাকা মানুষের কথা খুঁজে বের করা, নথির স্তর সরিয়ে সত্যের কাছে পৌঁছনো এবং ক্ষমতাবানদের অস্বস্তিতে ফেললেও প্রশ্ন করতে পিছিয়ে না যাওয়া, মাত্র কুড়ির কোঠায় পৌঁছনোর আগেই এই পথ বেছে নিয়েছেন কলকাতার তরুণ সাংবাদিক সারা আজিজ।

২০২৫ সালে যুক্তরাজ্যের দ্য প্রেস অ্যাওয়ার্ডসে ‘ইয়ং জার্নালিস্ট অব দ্য ইয়ার’ বিভাগে  স্বীকৃতি পান সারা। ২২ মে অনুষ্ঠিত পুরস্কার অনুষ্ঠানে তিনি এই সম্মান অর্জন করেন। সেই সময় তাঁর বয়স ছিল ২৩। কলকাতা থেকে শুরু হওয়া তাঁর সাংবাদিকতার পথ তখন পৌঁছে গিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের পাতায়।
 
সারা আজিজ
 
সারার সাংবাদিকতা শুরু হয়েছিল খুব বেশি দিন আগে নয়। ২০২৩ সালে কলকাতায় স্নাতক পড়ার সময়ই ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি। লোরেটো কলেজে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক পড়ার পাশাপাশি তাঁর আগ্রহ তৈরি হয় অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায়। পরে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট স্কুল অব জার্নালিজমে সাংবাদিকতায় স্নাতকোত্তর পড়াশোনা করেন। তাঁর পেশাগত পরিচয়ে রয়েছে দ্য গার্ডিয়ান, দ্য টেলিগ্রাফ, সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট, দ্য ক্রিশ্চিয়ান সায়েন্স মনিটর, ভয়েস অব আমেরিকা এবং দ্য টাইমস-এর মতো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের নাম।
 
কিন্তু সারার পরিচয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ তাঁর কাজের বিষয়বস্তু। যে গল্পগুলি সাধারণত খবরের ভিড়ে হারিয়ে যায়, সেই গল্পগুলিই বারবার টেনে এনেছেন তিনি সামনে। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জীবন, কারাগারে বন্দি মহিলাদের যৌন নির্যাতন, মানবাধিকার লঙ্ঘন, নারীস্বাস্থ্য, তাঁর অনুসন্ধানের কেন্দ্রে রয়েছে সমাজের তুলনায় দুর্বল মানুষের জীবন ও অভিজ্ঞতা।
 
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত তাঁর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে পশ্চিমবঙ্গের কারাগারে বন্দি মহিলাদের যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠে আসে। প্রতিবেদনে বলা হয়, পুরুষ ও মহিলা বন্দিদের আলাদা রাখার ব্যবস্থার মধ্যেও বিভিন্ন কারাগারে নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। এই প্রতিবেদনের জন্য মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন সারা নিজেই। প্রতিবেদনে তাঁর তোলা ছবিও প্রকাশিত হয়েছিল।
 
 
এর পর রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিয়ে তাঁর অনুসন্ধান আরও আন্তর্জাতিক গুরুত্ব পায়। বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতি নিয়ে ভয়েস অব আমেরিকার হয়ে রিপোর্ট করার সময় তিনি শরণার্থীদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন। সেই কাজই পরে তাঁর পুরস্কারপ্রাপ্তির অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে। রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে তাঁর কাজ থেমে থাকেনি। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে আটকে থাকা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের পরিস্থিতি তুলে ধরেন সারা। 
 
সারা আজিজ
 
মাঠপর্যায়ের মানুষের বক্তব্য, সীমান্তের বাস্তবতা এবং রাষ্ট্রীয় নীতির প্রভাব, সব মিলিয়ে প্রতিবেদনটি তৈরি হয়েছিল। আরও একটি অনুসন্ধানী কাজ তাঁকে আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতার নজরে নিয়ে আসে। দ্য টেলিগ্রাফে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দিল্লিতে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের হেফাজতে থাকা এক রোহিঙ্গা শিশুর মৃত্যুকে ঘিরে প্রশ্ন তোলা হয়। সেই মাল্টিমিডিয়া অনুসন্ধানে শিশুটির চিকিৎসা ও হেফাজতের পরিস্থিতির পাশাপাশি ভারতে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আটক ও নির্যাতনের বৃহত্তর ছবিও সামনে আনার চেষ্টা করা হয়।
 
এই কাজগুলির জন্যই ২০২৫ সালের দ্য প্রেস অ্যাওয়ার্ডসে ‘ইয়ং জার্নালিস্ট অব দ্য ইয়ার’ বিভাগে হন সারা। নিজের লিঙ্কডইন পোস্টে সেই স্বীকৃতির কথা জানিয়ে তিনি লিখেছিলেন, এই সম্মান এসেছে দ্য টেলিগ্রাফ ও দ্য গার্ডিয়ানে তাঁর অনুসন্ধানী কাজের স্বীকৃতি হিসেবে। একই পোস্টে তিনি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন তাঁর মা, বোন, নানি, শিক্ষক, সহকর্মী এবং লোরেটো কলেজ ও কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের। সবচেয়ে বড় করে স্মরণ করেছেন সেইসব রোহিঙ্গা মানুষকে, যাঁরা তাঁদের জীবনের কথা তাঁকে বিশ্বাস করে জানিয়েছেন।
 
সারার সেই পোস্টের একটি অংশ বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি লিখেছেন, সাংবাদিক হিসেবে কঠিন সময়ের মধ্যেও আরও কঠিন হয়ে উঠতে হয়। পুরস্কার নিতে যুক্তরাজ্যে যাওয়ার প্রস্তুতি থাকলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর ছাত্র ভিসা সংক্রান্ত একটি সমস্যার কারণে শেষ মুহূর্তে যাত্রা বাতিল করতে হয়েছিল। পুরস্কারটি তাই তাঁর কাছে শুধু একটি ট্রফি নয়, বরং সাংবাদিক হিসেবে পথচলার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি। সারার পরিচয়ের আর একটি দিকও কম আকর্ষণীয় নয়। তিনি শুধু সাংবাদিক নন, কবি ও চিত্রশিল্পী হিসেবেও কাজ করেন। পোয়েট্রি ফাউন্ডেশনের প্রোফাইলে তাঁকে ভারতীয় কবি, সাংবাদিক ও ইলাস্ট্রেটর হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়েছে। তাঁর কবিতাও সেখানে প্রকাশিত হয়েছে।
 
কলকাতার একটি কলেজের ছাত্রী হিসেবে যে মেয়েটি সাংবাদিকতায় পা রেখেছিলেন, কয়েক বছরের মধ্যেই তাঁর লেখা পৌঁছে গেছে বিশ্বের প্রথম সারির সংবাদমাধ্যমে। কিন্তু সাফল্যের পরও তাঁর কাজের কেন্দ্রবিন্দু বদলায়নি। এখনও তিনি এমন মানুষের গল্প খুঁজছেন, যাঁদের কণ্ঠস্বর অনেক সময় ক্ষমতার ভারে চাপা পড়ে যায়।
 
সারা আজিজ
 
নিজের পেশাগত পরিচয়ে সারা জানিয়েছেন, তাঁর আগ্রহ অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গুরুত্বের মানবাধিকার-সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে কাজ করা। নারীস্বাস্থ্য, রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট, মানবপাচার এবং আদিবাসী মানুষের সমস্যা, এই বিষয়গুলির উপর তিনি কাজ করেছেন। তাঁর যাত্রাটা তাই শুধুই কলকাতার এক তরুণ সাংবাদিকের আন্তর্জাতিক পুরস্কার পাওয়ার গল্প নয়। বরং এটি এমন এক প্রজন্মের সাংবাদিকতার ছবি, যারা ডিজিটাল মাধ্যমকে ব্যবহার করেও মাঠের মানুষের কাছে যেতে চায়, নথি খুঁজতে চায় এবং প্রশ্ন করতে চায়।
 
কলকাতা থেকে শুরু হওয়া সেই পথ এখন অনেক দূর গিয়েছে। বয়স এখনও কম, সামনে সময় আরও অনেক। কিন্তু সারা আজিজ ইতিমধ্যেই দেখিয়ে দিয়েছেন, সাংবাদিকতার শক্তি শুধু খবর দ্রুত পৌঁছে দেওয়ায় নয়; কখনও কখনও সেই শক্তি লুকিয়ে থাকে এমন একটি গল্প খুঁজে বের করার মধ্যে, যে গল্পটি কেউ শুনতে চায়নি।