শান্তিপ্রিয় রায় চৌধুরী
পশ্চিম মেদিনীপুরের দূর পাল্লার সাঁতারু আফরিন জাবি ক্যালিফোর্নিয়ার বিখ্যাত ক্যাটরিনা চ্যানেল জয় করে এক নতুন নজির গড়লেন। ২০২৬ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর তিনি এই ঐতিহাসিক সাফল্য অর্জন করেন। আমেরিকার স্থানীয় সময় ২২ সেপ্টেম্বর রাত এগারোটা নাগাদ ভারতীয় সময় অনুযায়ী ২৩ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে দশটায় জলে নামেন আফরিন। ক্যাটরিনা চ্যানেল এমনিতে বিশ্বের ওপেন ওয়াটার সাঁতারুদের কাছে এক বড় পরীক্ষা।
প্রশান্ত মহাসাগরের প্রবল ঢেউ কনকনে ঠান্ডা প্রতিকূল স্রোত আর রাতের অন্ধকারকে জয় করে আরফিন প্রায় ৩২.৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সমুদ্রপথ অতিক্রম করে সেই কঠিন পরীক্ষাতে সফল হয়েছেন। ঘন্টার পর ঘন্টা সাঁতার কেটেছেন। শরীর ক্লান্ত হয়েছে। সমুদ্রের পরিস্থিতিও খারাপ ছিল। তবু থামেননি মাতঙ্গিনী হাজরার জেলার মেয়ে আফরিন। এই দূরত্ব অতিক্রম করতে তার সময় লেগেছে ১৫ ঘন্টা ৫১ সেকেন্ড।
আফরিন জাবি
আমেরিকার এই ক্যাটরিনার চ্যানেল জয়ের মাধ্যমে দূরপাল্লার সাঁতারে হ্যাটট্রিক করলেন এই জলকন্যা। এর আগে তিনি আরও দুটি অত্যন্ত দুর্গম জলরাশি অতিক্রম করে সফল হয়েছিলেন। তার একটি হল ইংলিশ চ্যানেল। ২০২৫ সালের ২৯ জুলাই ১৩ ঘন্টা ৪৫ মিনিটে তিনি এটি অতিক্রম করেন। এরপর ভারত শ্রীলংকার মধ্যকার পক প্রণালী তিনি অতিক্রম করেন ২০২৬ সালের ৯ মে। অতিক্রম করতে তার সময় লেগেছে সাত ঘন্টা পাঁচ মিনিট। সমুদ্রের প্রতিকূল আবহাওয়া এবং জেলিফিশের কামড় এর মতন কঠিন বাধা অতিক্রম করে আফরিনের এই সাফল্য সারা বাংলা জুড়ে প্রশংসিত হচ্ছে।
মেদিনীপুর শহরের ১২ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা আফরিনের এই বিশ্বজয়ের যাত্রা সহজ ছিল না। শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতার পরীক্ষার পাশাপাশি তাকে চরম আর্থিক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে। তার এই ব্যয়বহুল অভিযানে অংশ নেয়ার জন্য মেদিনীপুরের বেশ কিছু শিল্প সংস্থা, জেলা প্রশাসন তার পাশে দাঁড়িয়েছেন।
এই চ্যানেল অতিক্রম করার জন্য রশ্মী গ্রুপের কর্পোরেট সোশ্যাল রেস্পন্সিবিলিটির উদ্যোগে ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা আফরিন পেয়েছেন। পশ্চিম মেদিনীপুরের পুলিশ সুপারের উপস্থিতিতে এই আর্থিক সহায়তার চেকটি তার হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, এই ক্যাটরিনা চ্যানেল অতিক্রম করার জন্য তার প্রয়োজন ছিল প্রায় ২৮ লক্ষ টাকা, যার বাকি অংশের টাকা তিনি সাধারণ মানুষ এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে থেকেও সাহায্য পেয়েছেন।
ক্যাটারিনা চ্যানেল সফলভাবে অতিক্রম করার পর তাঁর প্রশিক্ষক ও কোচ বিশ্বজিৎ দে চৌধুরী উচ্ছ্বসিত প্রশংসা ও শুভেচ্ছা বার্তা জানিয়েছেন। ভারতীয় দলের প্রাক্তন কোচ বিশ্বজিৎবাবু আফরিনের এই বিশ্বমানের সাফল্যে তাঁর অদম্য জেদ এবং কঠোর পরিশ্রমকে সাধুবাদ জানিয়েছেন।
আফরিনের আর এক কোচ বাবুন নাথ। তিনি আফরিন জাবির অন্যতম প্রধান সাঁতার প্রশিক্ষক। কোচ বাবুন নাথ মূলত মেদিনীপুর সুইমিং ক্লাবের সাথে যুক্ত থেকে আফরিনের মতো প্রতিভাবান সাঁতারুকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরের জন্য তৈরি করেছেন।
আফরিনের এই অসামান্য সাফল্যে উচ্ছ্বসিত হয়ে বাবুন নাথ ভারতের এই কৃতি সাঁতারুকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, "অভিনন্দন জাবি, এগিয়ে যাও, আত্মবিশ্বাসের সাথে এগিয়ে যাও, আমরা পারবই"।
এদিকে মেদিনীপুরের বিধায়ক শংকর কুমার গুছাইত আফরিনের এই সাফল্যে বলেছেন, "আফরিনের এই সাফল্যে আমরা গর্বিত। শুধু আমরা জেলা বাসি নই,সারা বাংলা ওর জন্য গর্বিত। অভিযানে যাওয়ার আগে দেখা করে শুভেচ্ছা জানিয়েছি। ও ক্যাটরিনা অতিক্রম করে ফিরে এসেছে। ওকে নিয়ে যাতে বড় একটা অনুষ্ঠান করা যায় তার ব্যবস্থা করব।"
মেয়ের সাফল্যে উচ্ছসিত বাবা পিয়ার আলি। এই প্রতিবেদককে তিনি বললেন, "একদিকে মেয়ের প্রশিক্ষণের দিকে লক্ষ্য রাখা আর অন্যদিকে অর্থ সংগ্রহ- দুটো কাজ করতে গিয়ে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। আমার ছোট্ট ব্যবসা। এই ছোট ব্যবসা থেকে টাকা বের করা কঠিন হয়ে পড়ছে। ইংলিশ চ্যানেল ও প্রক প্রণালী পার হওয়ার সময়ও তিনি একথা বলেছেন বারবার। তাই সরকার ও বিভিন্ন সহৃদয় মানুষের কাছে এবার সাহায্যের জন্য আবেদন জানাব ভেবেছি ,আরফিন এর পরবর্তী লক্ষ্য পূরণ করার জন্য।"