জয়পুরের গলি থেকে থিয়েটারের জাতীয় মঞ্চে আরশিয়া পারভীন

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 2 h ago
আরশিয়া পারভীন
আরশিয়া পারভীন
 
ফারহান ইসরাইলি 

জয়পুরের রামগঞ্জ বাজারের সরু গলি থেকে জাতীয় নাট্যমঞ্চে নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করেছেন আরশিয়া পারভীন। একটি রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারে বেড়ে ওঠা আরশিয়ার এই পথচলা ছিল সামাজিক কটূক্তি, রক্ষণশীল মানসিকতা ও আর্থিক সংকটে ভরা। কিন্তু সমস্ত প্রতিকূলতা পেরিয়ে ভারতীয় থিয়েটারে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন তিনি। ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে নির্দেশনা, অভিনয়, পোশাক পরিকল্পনা, আলোকসজ্জা ও চিত্রনাট্য লেখাসহ থিয়েটারের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই সক্রিয় রয়েছেন আরশিয়া।
 
আরশিয়ার বাবা-মা, রাজা হুসেন এবং রাইসা বানু, জয়পুরের ঐতিহাসিক প্রাচীরঘেরা শহরের বাসিন্দা। তিন ভাই-বোনের মধ্যে দ্বিতীয় আরশিয়া। তাঁর নামের অর্থ ‘যিনি আকাশের উচ্চতায় অবস্থান করেন’, কিন্তু তাঁর শৈশব কেটেছে কঠিন পরিস্থিতি ও আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে।
 
আরশিয়া পারভীন
 
পরিবারের জীবন চলত কায়িক শ্রমের ওপর নির্ভর করে। আর্থিক সংকটের কারণে দশম শ্রেণি থেকেই মাকে সাহায্য করার জন্য আরশিয়াকে সেলাই ও সূচিকর্মের কাজ করতে হয়। এমন এক সময়ে, যখন ওই এলাকার মেয়েদের প্রায়ই সপ্তম বা অষ্টম শ্রেণির পর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে বাধা দেওয়া হতো, তখন অশিক্ষিত মায়ের সমর্থনে আরশিয়া স্নাতক সম্পন্ন করেন।
 
২০০৮ সালে স্নাতক সম্পন্ন করার পর আরশিয়া জয়পুরের একটি বেসরকারি স্কুলে কম্পিউটার শিক্ষিকা হিসেবে কাজ শুরু করেন। তিনি যখন বোরখা পরে স্কুলে যেতে শুরু করেন, তখন প্রতিবেশীরা তাঁর সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন।
 
অনেকেই তাঁর মাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, মেয়েকে বাড়িতে রেখে সেলাই শেখাতে। এই ধরনের কটূক্তিতে ক্লান্ত হয়ে আরশিয়া বোরখা পরা বন্ধ করার কঠিন সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, শালীনতা পোশাকের বিষয় নয়, বরং মানুষের দৃষ্টি ও উদ্দেশ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাঁর এই সিদ্ধান্ত পরিবার ও সমাজ, উভয় দিক থেকেই বিরোধিতার মুখে পড়ে। তবে তাঁর মা নীরবে সবসময় তাঁর পাশে ছিলেন।
 
২০০৯ সালে স্কুলে কাজ করার সময় আরশিয়ার সঙ্গে প্রবীণ নাট্যব্যক্তিত্ব হেমচন্দ্র (রাজু) তামহনকরের পরিচয় হয়। আরশিয়া তাঁকে শ্রদ্ধার সঙ্গে ‘দাদা’ বলে ডাকতেন। রাজু তামহনকর মারাঠি ও হিন্দি থিয়েটারের একজন পরিচিত নাম ছিলেন।
 
বলিউডের অভিনেতা ইরফান খান এবং মিলিন্দ সোমানের মতো বিশিষ্ট অভিনেতাদের সঙ্গে তিনি কাজ করেছিলেন। একই সময়ে আরশিয়ার মা পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হন। মায়ের অসুস্থতার পর পরিবারের সমস্ত দায়িত্ব আরশিয়ার কাঁধে এসে পড়ে। এই কঠিন সময়ে রাজু তামহনকর তাঁর পরিবারের পরামর্শদাতা ও পথপ্রদর্শক হয়ে ওঠেন।
 
আরশিয়া পারভীন
 
মায়ের মৃত্যুর পর আরশিয়া অবসাদে চলে যান। সেই সময় তাঁর গুরু দাদা তাঁকে কঠিন পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করার জন্য থিয়েটারের জগতে নিয়ে আসেন। প্রথমদিকে আরশিয়া অভিনয় করতে অস্বীকার করেন এবং মঞ্চের নেপথ্যে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন। ২০১০ সালে তিনি পোশাক পরিকল্পনার কাজ দিয়ে শুরু করেন। ২০১১ সালে ‘ভারতম্বা’ নাটকের জন্য তিনি সেরা পোশাক পরিকল্পনার পুরস্কার জেতেন। ধীরে ধীরে তিনি সংগীত ও আলোকসজ্জার নকশাতেও দক্ষতা অর্জন করেন।
 
২০১৪ সালে আগ্রায় অনুষ্ঠিত একটি জাতীয় প্রতিযোগিতায় একটি নাটকের মুখ্য অভিনেত্রী উপস্থিত হতে পারেননি। বাধ্য হয়ে আরশিয়াকে মুখ্য ভূমিকায় অভিনয় করতে হয় এবং তিনি জাতীয় স্তরে তৃতীয় স্থান অর্জন করেন।
 
এরপর আর তাঁকে পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ২০১৫ সাল তাঁর কর্মজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হয়ে ওঠে। পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়িতে তিনি ড. শঙ্কর শেষের লেখা বিখ্যাত ‘রক্তবীজ’ নাটকে দ্বৈত চরিত্রে অভিনয় করেন। নাটকটি সারা দেশে ২৬ বার মঞ্চস্থ হয়েছে এবং ১২টিরও বেশি জাতীয় পুরস্কার পেয়েছে।
 
একই বছর আরশিয়া প্রথমবার দাদার লেখা ‘প্রহরী’ নাটকের নির্দেশনা দেন। ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে মোতায়েন সেনাদের মানসিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে নির্মিত এই নাটকটি দেশের বিভিন্ন রাজ্যে ৪০টিরও বেশি জাতীয় পুরস্কার পেয়েছে। এখনও পর্যন্ত নাটকটি ৩৬ বার মঞ্চস্থ হয়েছে।
 
তাঁর যাত্রায় একটি আকর্ষণীয় সমাপতনও রয়েছে। ২০০৯ সালে আরশিয়া রাভীন্দ্র মঞ্চে দর্শক হিসেবে দাদার ‘অন্তর্দ্বন্দ্ব’ নাটকটি দেখেছিলেন। ঠিক ১০ বছর পর, ২০১৯ সালে, সেই একই নাটকে মুখ্য অভিনেত্রীর ভূমিকায় অভিনয়ের সুযোগ পান তিনি। ২০২৬ সালে তিনি নিজেই নাটকটির নির্দেশনা দেন। সারোগেসির মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত এই নাটকটি বর্তমানে মুম্বইয়ের মতো বড় শহরগুলিতে মঞ্চস্থ হচ্ছে।
 
আরশিয়া পারভীন একটি পুরস্কার গ্রহণের মুহূর্তে
 
থিয়েটারের পথে আরশিয়াকে ক্রমাগত সামাজিক রক্ষণশীলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। একজন মুসলিম নারী গভীর রাত পর্যন্ত সহ-অভিনেতাদের সঙ্গে মহড়া দিচ্ছেন এবং নাটক পরিবেশনের জন্য অন্য শহরে ভ্রমণ করছেন, এ বিষয়টি সমাজের একাংশের কাছে অস্বস্তিকর ছিল।
 
প্রথমদিকে নিজের শহর জয়পুরেই অভিনয় করতে তিনি দ্বিধাবোধ করতেন। তবে নিজের কাজ ও প্রতিভার মাধ্যমে তিনি সমালোচকদের নীরব করে দিয়েছেন। আজ কোনও সরকারি অনুদান ছাড়াই তামহনকর থিয়েটার অ্যাকাডেমির মাধ্যমে রাজস্থানে অলাভজনক থিয়েটারকে জীবিত রাখছেন তিনি।
 
থিয়েটারের পাশাপাশি লেখালেখি ও সমাজসেবার প্রতিও আরশিয়ার আগ্রহ তৈরি হয়েছে। রাজস্থান ট্যুরিজমের জন্য তিনি বাঁসওয়াড়া ও ডুঙ্গারপুরের আদিবাসী অঞ্চল নিয়ে গবেষণাভিত্তিক ফিচার লিখেছেন। দিল্লির একটি মিডিয়া সংস্থার জন্যও তিনি নিয়মিত একটি কলাম লিখে আসছেন।
 
২০১৩ সাল থেকে জয়পুরভিত্তিক সামাজিক সংগঠন RAYS-এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন আরশিয়া। সংগঠনটি এইচআইভি-পজিটিভ এবং পরিত্যক্ত শিশুদের পুনর্বাসনের জন্য কাজ করে। সেখানে আরশিয়া শিশুদের কাউন্সেলর এবং থিয়েটার শিক্ষিকা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
 
নিজের দক্ষতা আরও বিকশিত করতে আরশিয়া রাজস্থান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর পড়াশোনা সম্পন্ন করেন এবং পরে চেন্নাইয়ের ভারত সেবক সমাজ থেকে চলচ্চিত্র ও থিয়েটার অভিনয়ের ডিপ্লোমা অর্জন করেন। দেশের ১৮টিরও বেশি রাজ্যে তিনি তাঁর নাট্যদক্ষতা প্রদর্শন করেছেন। গোয়া, অসম, ঝাড়খণ্ড, উত্তরাখণ্ড এবং উত্তরপ্রদেশে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন জাতীয় থিয়েটার উৎসবে তিনি সম্মানিত হয়েছেন। সম্প্রতি তাঁকে অল ইন্ডিয়া কালচার ফাউন্ডেশনের জাতীয় সচিব হিসেবে নিযুক্ত করা হয়েছে।
 
আরশিয়া পারভীন একটি পুরস্কার গ্রহণের মুহূর্তে
 
 
২০২৫ সালের ৩১ জানুয়ারি তাঁর গুরু রাজু তামহনকর প্রয়াত হন। গুরুর মৃত্যুর পরও আরশিয়া তাঁর কাজ ও লক্ষ্যকে থেমে যেতে দেননি। তিনি হেমচন্দ্র রাজু তামহনকর স্মৃতি নাট্য সমারোহের আয়োজন করেন, যেখানে ‘ব্যথা অঙ্গরাজ কর্ণ কি’ একক নাটকটি সফলভাবে মঞ্চস্থ হয়। বর্তমানে তিনি তামহনকর থিয়েটার অ্যাকাডেমির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
 
আরশিয়া পারভীনের চূড়ান্ত লক্ষ্য হল সামাজিক চাপের কারণে স্কুলছুট হতে বাধ্য হওয়া দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের শিক্ষার জন্য কাজ করা। পাশাপাশি তিনি থিয়েটারকে আর্থিকভাবে আরও শক্তিশালী করতে এবং উদীয়মান শিল্পীদের জন্য আরও ভালো একটি মঞ্চ তৈরি করতে চান।
 
জয়পুরের সরু গলি থেকে জাতীয় নাট্যমঞ্চে আরশিয়া পারভীনের এই যাত্রা এমন প্রতিটি নারীর জন্য এক অনুপ্রেরণার গল্প, যাঁদের নিজেদের স্বপ্ন পূরণের সাহস রয়েছে।