নিজে প্রতিষ্ঠিত হয়ে থামেননি, অনুজদের স্বপ্নের পথও দেখিয়েছেন বিউটি খাতুন

Story by  Sampee Chakroborty Purkayastha | Posted by  Aparna Das • 1 h ago
ডঃ বিউটি খাতুন
ডঃ বিউটি খাতুন
 
শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ 

সবাই নিজের জন্য বাঁচে। নিজের স্বপ্ন পূরণের জন্য লড়াই করে, নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে। কিন্তু এমন মানুষ খুব বেশি নেই, যাঁরা নিজের সাফল্যের পরেও পিছনে ফিরে তাকান এবং আপনজনদের স্বপ্ন পূরণের পথটাও নিজের দায়িত্ব বলে মনে করেন। মুর্শিদাবাদের মেয়ে বিউটি খাতুনের জীবনকাহিনিতে সেই অন্যরকম মানবিকতারই ছবি খুঁজে পাওয়া যায়। সীমিত আর্থিক সামর্থ্যের পরিবার থেকে উঠে এসে চিকিৎসক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার পর তিনি শুধু নিজের জীবনের পথ তৈরি করেননি, ছোট ভাইবোনদেরও শিক্ষার আলোয় এগিয়ে যাওয়ার সাহস ও প্রেরণা জুগিয়েছেন।

কৃষক পরিবারের সন্তান বিউটির বেড়ে ওঠা এমন এক পরিবেশে, যেখানে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখা সহজ হলেও তা বাস্তবায়ন করা ছিল কঠিন। পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য সীমিত। তবু পড়াশোনাকে আঁকড়ে ধরে এগিয়েছেন তিনি। সেই পথ পেরিয়ে চিকিৎসাবিদ্যায় প্রবেশ এবং পরবর্তীতে বর্ধমান মেডিকেল কলেজ-এ এম ডি জেনারেল মেডিসিন-এর পড়াশোনা তাঁর অধ্যবসায়েরই পরিচয় বহন করে। সরকারি নথিতে তাঁর চিকিৎসা-শিক্ষার এই পথের তথ্যও রয়েছে।
 
ডঃ বিউটি খাতুন
 
কিন্তু বিউটির গল্পের আসল সৌন্দর্য যেন এখানেই শেষ নয়। নিজের জীবনে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পর তিনি নিজের সাফল্যকে কেবল ব্যক্তিগত অর্জন হিসেবে দেখেননি। বরং পরিবারের ছোটদের কাছেও উচ্চশিক্ষার স্বপ্নকে বাস্তব করে তোলার চেষ্টা করেছেন। মাত্র ৩২টি বসন্ত পার করেছেন তিনি। আর এই বয়সেই তাঁর জীবন তাঁর পরিবারের কাছে হয়ে উঠেছে এক ধরনের জীবন্ত উদাহরণ, প্রতিকূলতা থাকলেও থেমে না যাওয়ার, এবং সুযোগ পেলে সেই সুযোগ অন্যের হাতেও তুলে দেওয়ার।
 
এই মানবিক ভূমিকার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত তাঁর ছোট বোন সানা আজমি।  সানা নিজেই তাঁর দিদি বিউটির ভূমিকার কথা বলেছেন। দিল্লিতে পড়াশোনার সুযোগ তৈরি করার ক্ষেত্রেও বিউটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল বলে সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তীতে সানা ইউপিএসসি সিভিল সার্ভিস-এ সাফল্য অর্জন করেন। অর্থাৎ এক বোন নিজের শিক্ষাজীবনে যে পথ তৈরি করেছিলেন, সেই পথই যেন পরের বোনের সামনে আরও প্রশস্ত করে দিয়েছিলেন।
 
একজন চিকিৎসক হিসেবে বিউটির প্রতিষ্ঠা তাই শুধু একটি ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়। এটি একটি পরিবারের ভিতর থেকে তৈরি হওয়া অনুপ্রেরণার গল্প। একজন এগিয়ে গেলে তাঁর সাফল্য কীভাবে পরের জনের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিতে পারে, কীভাবে একটি মানুষের লড়াই অন্যদের পথ দেখাতে পারে, বিউটির জীবন সেই কথাই মনে করিয়ে দেয়।
 
সাফল্যের সঙ্গে মানুষের দায়বদ্ধতার সম্পর্কটি অনেক সময় আমরা ভুলে যাই। নিজের জীবনকে বদলে ফেলার লড়াইয়ে মানুষ ব্যস্ত থাকে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়েই। কিন্তু বিউটির গল্পে রয়েছে অন্য একটি দিক, নিজে উঠে দাঁড়ানোর পর অন্যদেরও তুলে ধরার চেষ্টা। ছোট ভাইবোনেরা তাঁর মধ্যে শুধু পরিবারের বড় দিদিকে নয়, একজন পথপ্রদর্শককেও দেখতে পেয়েছেন।
 
আজ তাঁর পরিবারের একাধিক সন্তান উচ্চশিক্ষার পথে। কেউ চিকিৎসাবিদ্যার সঙ্গে যুক্ত, কেউ চিকিৎসাশিক্ষায় এগোচ্ছেন, আবার কেউ দেশের অন্যতম কঠিন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় সাফল্য অর্জন করেছেন। এই ধারাবাহিকতার নেপথ্যে রয়েছে শিক্ষার প্রতি পরিবারের আস্থা এবং পরস্পরের পাশে থাকার মানসিকতা। আর সেই যাত্রায় বিউটির ভূমিকা বিশেষভাবে সামনে আসে তাঁর অনুজদের বক্তব্য ও প্রকাশিত তথ্যের সূত্রে।
 
ডঃ বিউটি খাতুন
 
বিউটি খাতুনের জীবন তাই শুধু ‘দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে এসে চিকিৎসক’ হয়ে ওঠার প্রচলিত সাফল্যের গল্পে আটকে থাকে না। তাঁর গল্পের আরও বড় শিক্ষা রয়েছে, নিজে সফল হওয়ার পর সেই সাফল্যের আলো অন্যের পথেও পৌঁছে দেওয়া।
 
কারণ নিজের জন্য বাঁচা সহজ। নিজের স্বপ্নের জন্য লড়াই করাও মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। কিন্তু নিজের কষ্ট, অভিজ্ঞতা ও অর্জনকে ব্যবহার করে অন্যের স্বপ্নকে শক্তি দেওয়া, সেই মানুষই আলাদা। বিউটি খাতুনের পথচলায় সেই আলাদা হয়ে ওঠার ছবিটিই সবচেয়ে উজ্জ্বল।
 
একটি পরিবারের আর্থিক সীমাবদ্ধতা যেখানে একসময় স্বপ্নের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারত, সেখানে আজ সেই পরিবারের সন্তানরা একের পর এক উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে চলেছেন। একজন দিদি নিজের হাতে শুধু নিজের ভবিষ্যৎ গড়েননি, অনুজদের হাতেও তুলে দিয়েছেন এগিয়ে যাওয়ার সাহস। আর সেই কারণেই বিউটি খাতুনের সাফল্যের গল্প শেষ পর্যন্ত তাঁর একার গল্প হয়ে থাকে না; তা হয়ে ওঠে একজন মানুষের নিজের সাফল্যকে অন্যের স্বপ্নের শক্তিতে পরিণত করার গল্প।