আরশাদ ওয়ারসি এখনও তার মায়ের শেষ ইচ্ছা পূরণ করতে না পারার যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে আছে

Story by  atv | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 14 h ago
আরশাদ ওয়ারসি
আরশাদ ওয়ারসি
 
আর্চলা খান

কিছু স্মৃতি সময়ের সাথে ম্লান হয় না, বরং হৃদয়ের গভীরে এক নীরব যন্ত্রণার মতো সারাজীবন বেঁচে থাকে। অভিনেতা আরশাদ ওয়ারসি, যিনি রুপালি পর্দায় তাঁর নিখুঁত কমেডি অভিনয়ের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ দর্শকের মুখে হাসি ফুটিয়েছেন, তাঁর হাসিমুখের আড়ালে রয়েছে এমনই এক গভীর যন্ত্রণা। এক অপরাধবোধ, যা আজও প্রায়ই তাঁকে রাতে জাগিয়ে রাখে।

যখনই কোনো সাক্ষাৎকার বা আলাপচারিতায় তার মায়ের প্রসঙ্গ আসে, তার মুখের হাসি মুহূর্তেই উধাও হয়ে যায়। তার উজ্জ্বল চোখে বিষাদের ছায়া নেমে আসে, কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসে। সেই মুহূর্তে সে একজন সফল অভিনেতা নয়, বরং এক অসহায় শিশু, যে এখনও তার মায়ের কাছে অপরাধবোধে ভোগে।

 
 

যখন দারিদ্র্য ও অসুস্থতা জীবনকে গ্রাস করেছিল

আরশাদের শৈশব সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে পূর্ণ ছিল না। খুব অল্প বয়সেই জীবন তাকে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি করেছিল। পরিবারের আর্থিক অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে, দৈনন্দিন চাহিদা মেটানোই ছিল এক সংগ্রাম। এই বঞ্চনার মধ্যেই তার মা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। উন্নত চিকিৎসা বা প্রয়োজনীয় ওষুধের জন্য পরিবারের কাছে টাকা ছিল না। তার অসুস্থতা আরও বেড়ে যায় এবং অবশেষে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। 

সেই শেষ রাতে, আরও এক ফোঁটা জলের জন্য মরিয়া আকুতি

হাসপাতালের নিস্তব্ধ ঘরটিতে তার মা জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে লড়ছিলেন। স্যালাইন দিয়ে চিকিৎসা চলছিল। ডাক্তাররা কড়া নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, কোনো অবস্থাতেই রোগীকে এক ফোঁটাও জল দেওয়া যাবে না। রাত গভীর হয়ে আসছিল। ছোট্ট আরশাদ তার মায়ের পাশে বসে তাঁর হাত ধরেছিল। তখন তার মা শুকনো ঠোঁটে খুব নরম স্বরে বললেন, "বাবা, আমাকে একটু জল দাও।" 

সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তারের সতর্কবাণীটা মনে পড়ে গেল। বুকের যন্ত্রণা চেপে রেখে সে মাকে জল দেয়নি। কিন্তু তার মা জলের জন্য অনুনয়-বিনয় করতে থাকলেন। তৃষ্ণার্ত ঠোঁটে সে এক ফোঁটা জলের জন্য মিনতি করল। অন্যদিকে ছোট আরশাদ শুধু ডাক্তারের পরামর্শ মেনে তার মাকে বাঁচাতে চেয়েছিল। সেই বিশ্বাসেই সে মায়ের অনুরোধ রাখেনি।

আরশাদ ওয়ারসির ছোটবেলার ছবি

সে জানত না যে, মায়ের ভালোর জন্য দেওয়া তার আদেশটিই তার জীবনের শেষ মুহূর্তের সাক্ষী হবে। অবশেষে, জলের জন্য মরিয়া আর্তনাদের মাঝে সবকিছু স্তব্ধ হয়ে গেল। তার সন্তানের চোখের সামনেই মা পরলোকগমন করলেন।

এক চুমুক জলের জন্য আজীবনের অনুশোচনা 

সেই রাতের পর আরশাদের জীবন চিরতরে বদলে যায়। আজও সেই ঘটনার কথা মনে পড়লে তার গলা ধরে আসে। সম্প্রতি একটি পডকাস্টে সেই স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। 

"আমার মা বারবার পানি চাইছিলেন। কিন্তু আমি শুধু ডাক্তারের পরামর্শই মেনেছিলাম। আমার এখনও মনে হয়, সেদিন রাতে ডাক্তারের কথা না শুনে যদি তাঁকে একটু পানি দিতাম, তাহলে হয়তো তিনি আজও আমার সঙ্গে থাকতেন," তিনি ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বললেন। 

আরশাদ ওয়ারসি
 
এই অনুশোচনা আজও তাকে তাড়া করে ফেরে। একটি শিশুর জন্য এর চেয়ে বড় যন্ত্রণা আর কী হতে পারে যে, তার চোখের সামনেই তার মা তৃষ্ণায় মারা গেল, আর সে অসহায়ভাবে তা দেখল? 

এটি একাকীত্ব, সংগ্রাম ও সাফল্যের এক দীর্ঘ যাত্রা

মায়ের মৃত্যুর শোক কেটে যাওয়ার কিছুদিন পরেই আরশাদ তার বাবাকেও হারায়। কৈশোরের শুরুতে সে সম্পূর্ণ একাই জীবনের সাথে লড়াই করেছিল। তাকে স্কুল ছাড়তে হয়েছিল। জীবিকার তাগিদে সে ছোটখাটো কাজ করতে বাধ্য হয়। তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে জিনিসপত্র বিক্রি করত এবং নানা রকম ছোটখাটো কাজ করত। দারিদ্র্য, ক্ষুধা আর একাকীত্বের সাথে প্রতিটি দিনই ছিল এক নতুন সংগ্রাম।

কিন্তু তিনি কখনো হতাশ হননি। তিনি তাঁর বেদনাকে শক্তিতে রূপান্তরিত করেন। তিনি নৃত্যের জগতে অক্লান্ত পরিশ্রম করেন। এরপর অভিনয়ে তাঁর অনন্য প্রতিভা দিয়ে দেশজুড়ে অগণিত দর্শকের মন জয় করেন।

আজ আরশাদ ওয়ারসি সাফল্যের শিখরে। তাঁর অভিনয়ের ভক্তের সংখ্যা অগণিত। কিন্তু সেই উজ্জ্বল সাফল্যের আড়ালে, হৃদয়ের গভীর কোণে যেন এক তৃষ্ণার্ত মা এখনও এক ঢোক জলের খোঁজে আছেন... আর একটি শিশু সেই রাতের কথা মনে করে নীরবে কাঁদছে।