কলকাতা
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে স্যার সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম। তিনি শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা নন, ছিলেন শিক্ষাবিদ, সমাজসংস্কারক ও সাংবাদিক, যাঁর নেতৃত্বে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের প্রাথমিক ভিত্তি গঠিত হয়েছিল। তাঁর অসামান্য অবদানের জন্যই তিনি "রাষ্ট্রগুরু" উপাধিতে ভূষিত হন।
সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ১৮৪৮ সালের ১০ নভেম্বর কলকাতার এক কুলীন ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা দুর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন একজন বিশিষ্ট চিকিৎসক। ছোটবেলা থেকেই তিনি মেধাবী ছাত্র হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি ইংল্যান্ডে যান ভারতীয় সিভিল সার্ভিস (ICS) পরীক্ষায় অংশ নিতে। তিনি পরীক্ষায় উত্তীর্ণও হন, কিন্তু একটি প্রশাসনিক ত্রুটির কারণে তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। এই অন্যায় তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়, তাঁর মধ্যে জন্ম নেয় জাতীয়তাবাদের অগ্নিশিখা।
চাকরি হারানোর পর তিনি শিক্ষাকে সমাজ গঠনের হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করেন। তিনি রিপন কলেজ (বর্তমান সুরেন্দ্রনাথ কলেজ) প্রতিষ্ঠা করেন, যা কলকাতার উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে আজও বিদ্যমান। তাঁর শিক্ষা-আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল ভারতীয় যুবসমাজকে আত্মসচেতন ও জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ করা।
১৮৭৬ সালে তিনি আনন্দমোহন বসুর সঙ্গে ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন (Indian Association) প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ছিল ভারতের প্রথম সর্বভারতীয় রাজনৈতিক সংগঠন, যার লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সংগঠিত প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং ভারতীয়দের রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা।
১৮৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে (Indian National Congress) যোগ দিয়ে তিনি দ্রুতই একজন প্রভাবশালী মধ্যপন্থী নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ১৮৯৫ সালে পুনা এবং ১৯০২ সালে আহমেদাবাদে অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের অধিবেশনে তিনি সভাপতি নির্বাচিত হন।
১৯০৫ সালে ব্রিটিশ শাসক লর্ড কার্জন বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করলে সমগ্র বাঙালি জাতি ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। এই সময় সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। তিনি সভা-সমিতি, প্রতিবাদ মিছিল, পিটিশন এবং জনমত সংগঠনের মাধ্যমে বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তোলেন। তাঁর নেতৃত্বে এই গণআন্দোলন এতটাই শক্তিশালী হয়ে ওঠে যে, শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ সরকার ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়।
সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ইংরেজি ভাষার বিখ্যাত সংবাদপত্র ‘দ্য বেঙ্গলি’ (The Bengalee)-এর সম্পাদক ও মালিক ছিলেন। প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে তিনি এই পত্রিকার মাধ্যমে উদারনৈতিক মতাদর্শ ও জাতীয়তাবাদী চেতনা প্রচার করেছেন। তিনি প্রথম ভারতীয় সাংবাদিক যিনি আদালত অবমাননার অভিযোগে কারাবরণ করেন, যা তাঁর দৃঢ় মতাদর্শ ও নির্ভীক চরিত্রের প্রমাণ বহন করে।
তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘A Nation in Making’ (এ নেশন ইন মেকিং) ১৯২৫ সালে প্রকাশিত হয়। এটি শুধু একটি ব্যক্তিগত জীবনের দলিল নয়, বরং ভারতের জাতীয়তাবাদের বিকাশের এক অমূল্য ঐতিহাসিক দলিল।৬ আগস্ট, ১৯২৫ সালে ব্যারাকপুরে এই মহান নেতার জীবনাবসান ঘটে। তবে তাঁর আদর্শ, দেশপ্রেম ও ত্যাগ আজও ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ইতিহাসে এক অনন্ত প্রেরণার উৎস।
সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন ভারতের রাজনৈতিক জাগরণের অন্যতম পথপ্রদর্শক। তাঁর শিক্ষাদান, সাংবাদিকতা, ও আন্দোলনের মাধ্যমে তিনি ভারতবাসীর মধ্যে আত্মপরিচয় ও স্বাধীনতার বীজ বপন করেন। ইতিহাসে তিনি চিরকাল স্মরণীয় থাকবেন ভারতের "রাষ্ট্রগুরু" হিসেবে, যিনি জাতিকে স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন স্বাধীনতার, মর্যাদার এবং ঐক্যের।