অপর্ণা দাস / গুয়াহাটি
পয়লা বৈশাখের সকাল মানেই এক অন্যরকম আবহ, চারদিকে উৎসবের ছোঁয়া, লাল-সাদা পোশাকে সেজে ওঠা মানুষ, উঠোন জুড়ে আলপনার নকশা আর রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা তেতো-টক-মিষ্টি গন্ধ। এই দিনটি শুধু নতুন বছরের সূচনা নয়, বরং বাঙালির সংস্কৃতি, ভাষা ও ঐতিহ্যের এক গভীর প্রকাশ, যেখানে প্রতিটি আচার, প্রতিটি খাবার আর প্রতিটি উচ্চারণে মিশে থাকে শিকড়ের টান ও নতুনের আশাবাদ।
বাংলা ভাষার বিস্তৃতি যেমন বিশাল, তেমনি তার উপভাষার বৈচিত্র্যও বিস্ময়কর। এই বৈচিত্র্য সবচেয়ে সুন্দরভাবে ধরা পড়ে পয়লা বৈশাখের উদযাপনে। ভারত ও বাংলাদেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বাঙালিরা নিজেদের স্বতন্ত্র ভাষা, খাবার ও রীতিনীতি দিয়ে নববর্ষকে বরণ করে নেয়।
চৈত্র সংক্রান্তির প্রেক্ষাপটে অনুষ্টিত চড়ক পুজোর দৃশ্য (ফাইল)
এই প্রেক্ষাপটেই চৈত্র সংক্রান্তির আবহে বাংলার নানা প্রান্তে পালিত হয় চড়ক পুজো, এক প্রাচীন লোকউৎসব, যেখানে মহাদেবের উদ্দেশ্যে ভক্তরা কঠোর ব্রত, আচার ও দোল-উৎসবের মাধ্যমে নিজেদের ভক্তি প্রকাশ করেন, এবং যা নতুন বছরের আগে অশুভ দূর করে শুভ শক্তিকে আহ্বান করার প্রতীক হিসেবেও ধরা হয়। কোথাও উল্লাসে ভরা জনসমাগম, কোথাও নিভৃত পারিবারিক উষ্ণতা, কিন্তু প্রতিটি উদযাপনের ভিতরেই থাকে এক গভীর মিল, নতুনকে স্বাগত জানানোর এক আন্তরিক আকাঙ্ক্ষা। এবার সেই বৈচিত্র্যের রঙে রঙিন হয়ে দেখে নেওয়া যাক, ভিন্ন ভিন্ন বাংলা উপভাষার মানুষ কীভাবে নিজস্ব সংস্কৃতি, আচার ও খাদ্যপরম্পরায় পয়লা বৈশাখকে আপন করে নেয়।
সিলেটি সংস্কৃতিতে, বিশেষ করে সিলেট ও অসমের বরাক উপত্যকার অঞ্চলে, পয়লা বৈশাখ একেবারেই অন্তর্মুখী ও আবেগঘন উৎসব। ভোরে স্নান করে, নতুন বা পরিষ্কার পোশাক পরে দিনের সূচনা করা হয়। পরিবারের সবাই একত্রিত হয়ে এই দিনটি কাটায়। বৈশাখের আগের দিন, অর্থাৎ সংক্রান্তিতে, বিশেষভাবে তেতো ডাল, টক ডাল ও আটকরই (তেলবিহীন আট রকমের শস্য বা বীজ দিয়ে তৈরি এক বিশেষ ভাজা পদ)-এর মতো ঐতিহ্যবাহী নিরামিষ পদ রান্না করা হয়, যা শরীর ও মনকে শুদ্ধ করে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর প্রস্তুতি হিসেবে বিবেচিত। আর পয়লা বৈশাখের দিন সকালে অনেক পরিবারে গণেশ পুজো করা হয়, শুভ সূচনা ও সমৃদ্ধির আশায়। এরপর খাবারের টেবিলে এই নিরামিষ পদগুলিই বিশেষ গুরুত্ব পায়, সঙ্গে থাকে পিঠা, শাক-সবজি ও স্থানীয় নানা রান্না, যা পুরো উৎসবকে করে তোলে আরও ঘনিষ্ঠ, ঐতিহ্যবাহী ও আত্মিকভাবে পরিপূর্ণ।
আটকরই ও পাঁচন
অন্যদিকে ঢাকার ঢাকাইয়া সংস্কৃতিতে পয়লা বৈশাখ যেন এক প্রাণবন্ত জনউৎসব। মঙ্গল শোভাযাত্রার রঙিন আয়োজন, রমনা বটমূলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সব মিলিয়ে শহর জেগে ওঠে উৎসবের ছন্দে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য-ঐতিহ্য লক্ষ্য করা যায় বৈশাখের আগের দিন, অর্থাৎ সংক্রান্তিতে। এই দিনে অনেক পরিবার বিশেষভাবে তেতো ডাল, টক ডাল, খই, দই, দুধ ও ছাতু খাওয়ার রীতি পালন করে, যা পুরনো বছরের ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলে শরীরকে শুদ্ধ করে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। পান্তা-ইলিশের জনপ্রিয়তার পাশাপাশি, পয়লা বৈশাখের দিনেও অনেক পরিবার নিরামিষ দিয়ে দিনের সূচনা করে।
পান্তা ইলিশ (ফাইল)
চট্টগ্রাম (চিটাগং)-এর চাটগাঁইয়া সংস্কৃতিতে পয়লা বৈশাখের উদযাপন কিছুটা ভিন্ন স্বাদের, যেখানে ভাষার মতোই উৎসবের ধরনও স্বতন্ত্র ও প্রাণবন্ত। বৈশাখের আগের দিন, অর্থাৎ চৈত্রসংক্রান্তিতে,এখানে “পাঁচন” তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ রীতি রয়েছে, বিভিন্ন শাক-সবজি, তেতো উপাদান ও ডালের সংমিশ্রণে তৈরি এই পদটি শরীর শুদ্ধ করা ও নতুন বছরের প্রস্তুতির প্রতীক হিসেবে ধরা হয়। একই সঙ্গে আট রকমের শস্য দিয়ে তৈরি এক মুখরোচক ভাজা জাতীয় খাবারও প্রস্তুত করা হয়, যা ঐতিহ্যের অংশ। সংক্রান্তির সকালে হলুদ ও নিম বেটে স্নান করার রীতি এবং ঘরের দুয়ারে নিমপাতা ঝুলিয়ে রাখার প্রথা অশুভ শক্তি দূর করে শুভ শক্তিকে আহ্বান করার প্রতীক হিসেবে মানা হয়। পয়লা বৈশাখের দিন সমৃদ্ধ খাবারের আয়োজন থাকলেও, অনেক পরিবারে দিনের শুরু নিরামিষ দিয়ে করা হয়, যা পবিত্রতার চিহ্ন। এরপর খাবারের তালিকায় শীর্ষে থাকে পান্তা ইলিশ, বিভিন্ন ধরনের ভর্তা, যেমন শুঁটকি, বেগুন, আলু ও ধনিয়া পাতার ভর্তা। এছাড়াও খুদের ভাত লইট্টা শুঁটকি ও ধনিয়া পাতার ভর্তার সঙ্গে অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি পদ, যা এই অঞ্চলের নিজস্ব স্বাদকে তুলে ধরে। সব মিলিয়ে চাটগাঁইয়া পয়লা বৈশাখে ঐতিহ্য, স্বাদ ও সামাজিক বন্ধনের এক অনন্য সমন্বয় দেখা যায়।

নোয়াখালিতে নববর্ষ উপলক্ষে আয়োজিত 'বৈশাখী মেলা' (ফাইল)
নোয়াখালি অঞ্চলের নোয়াখালিয়া সংস্কৃতিতে পয়লা বৈশাখ গ্রামীণ আবহে উদযাপিত হয়। এখানে মেলা, লোকগান ও সামাজিক মিলনের মধ্য দিয়ে উৎসব প্রাণ পায়। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো “পাঁচন” তৈরি করার প্রথা। পাঁচন হলো বিভিন্ন শাক-সবজি, তেতো উপাদান (যেমন নিমপাতা), ডাল ও মশলা দিয়ে তৈরি এক ধরনের মিশ্র রান্না, যা শরীর শুদ্ধ করা ও নতুন বছরের শুরুতে ভারসাম্য আনার প্রতীক হিসেবে ধরা হয়। দিনের শুরুতে এই পাঁচনসহ নিরামিষ খাবার গ্রহণের রীতি বহু পরিবারে প্রচলিত।
পাটিসাপটা (ফাইল)
ময়মনসিংহ অঞ্চলের ময়মনসিংহিয়া সংস্কৃতিতে পয়লা বৈশাখ যেন লোকঐতিহ্যের এক সজীব মঞ্চ। নদীমাতৃক এই অঞ্চলে উৎসবের সঙ্গে মিশে থাকে প্রকৃতির সান্নিধ্য। বাউল গান, লোককথা, গ্রামীণ নাটক, সব মিলিয়ে দিনটি হয়ে ওঠে এক সাংস্কৃতিক মিলনমেলা। পিঠা, মোয়া, ভাত-ডাল ও বিভিন্ন নিরামিষ পদ দিয়ে দিনের সূচনা করা হয়, যা শুধু খাবার নয়, বরং ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে বিবেচিত।
নববর্ষ উপলক্ষে ব্যবসায়ীদের হালখাতা কেনার দৃশ্য (ফাইল)
ভারতের কলকাতা-কেন্দ্রিক রাঢ়ী বাংলা সংস্কৃতিতে পয়লা বৈশাখ একদিকে ঐতিহ্যবাহী, অন্যদিকে আধুনিকতার ছোঁয়ায় সমৃদ্ধ। সকালে লুচি, ডাল, আলুর তরকারি, মিষ্টি, এই নিরামিষ আহার দিয়ে অনেক পরিবার দিন শুরু করে। অনেক বাড়ি ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে এই দিন লক্ষ্মী-গণেশ পুজো করা হয়, নতুন বছরের শুভ সূচনা ও সমৃদ্ধির কামনায়। চৈত্র সংক্রান্তির প্রাক্কালে পালিত নীল ষষ্ঠী-তেও এক বিশেষ ধর্মীয় আবহ তৈরি হয়, মায়েরা সন্তানের মঙ্গল কামনায় উপবাস থেকে মহাদেব নীলকণ্ঠ ও দেবী নীলাবতীর পুজো করেন এবং শিবের মাথায় জল অর্পণ করেন। এরপর হালখাতা অনুষ্ঠানে ব্যবসায়ীরা নতুন খাতা খুলে পুজো করেন, ক্রেতাদের মিষ্টি খাওয়ান। পাশাপাশি শহরের নানা প্রান্তে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, গান, নাচ ও কবিতা আবৃত্তির পাশাপাশি বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক শোভাযাত্রাও অনুষ্ঠিত হয়, যা এই দিনটিকে করে তোলে এক পূর্ণাঙ্গ ও প্রাণবন্ত উৎসব।
অসমের 'বহাগ বিহুতে' নির্মিত বিভন্ন পিঠে -পুলির ছবি (ফাইল)
উত্তরবঙ্গ ও অসমের জলপাইগুড়ি এবং গুয়াহাটি অঞ্চলে রাজবংশী ও কামরূপী প্রভাবিত বাংলা উপভাষার মানুষ পয়লা বৈশাখকে উদযাপন করে সরলতায়। এখানে লোকনৃত্য, স্থানীয় আচার ও দেবদেবীর পুজো উৎসবের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দিনের শুরুতে ভাত, শাক-সবজি ও নিরামিষ খাবার গ্রহণ করা হয়, যা শুভতার প্রতীক হিসেবে ধরা হয়। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, এই অঞ্চলে অসমীয়া সংস্কৃতির প্রভাবও গভীর, এখানে পয়লা বৈশাখকে অনেকেই ‘পহেলা বহাগ’ (বহাগ বিহু) নামে চেনে এবং এর আনন্দও মিশে যায় এই উদযাপনে। ফলে গুয়াহাটি ও আশপাশের অঞ্চলে কামরূপী বাঙালি সংস্কৃতি ও অসমীয়া বিহু সংস্কৃতির এক সুন্দর মেলবন্ধন দেখা যায়, যেখানে মানুষ দুই সংস্কৃতিকেই সমানভাবে উদযাপন করে। প্রকৃতির সান্নিধ্যে এই মিলিত উৎসব এক অনন্য প্রশান্তি ও সম্প্রীতির আবহ তৈরি করে।
পয়লা বৈশাখ শুধু একটি নববর্ষের সূচনা নয়, এটি বাঙালির বহুমাত্রিক পরিচয়ের এক অনন্য প্রতিচ্ছবি। সিলেটের শান্ত ঘরোয়া আবেগ, ঢাকার জাঁকজমকপূর্ণ শোভাযাত্রা, চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী খাবার ও আচার, কিংবা কলকাতার সংস্কৃতি ও আধুনিকতার মেলবন্ধন, সবকিছু মিলিয়ে এই উৎসব হয়ে ওঠে এক বিস্তৃত সাংস্কৃতিক মানচিত্র। তবে সমাপ্তির আগে আরেকটি কথা উল্লেখ করা জরুরি, বাংলা ভাষার উপভাষার পরিসর শুধু এতটুকুতেই সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে রয়েছে আরও বহু উপভাষা, যেমন রংপুরিয়া, বরিশালিয়া, মানভাষা, রাজবংশী, মালদহিয়া ইত্যাদি। প্রতিটি উপভাষার সঙ্গে জড়িয়ে আছে নিজস্ব আচার, খাদ্যসংস্কৃতি ও উৎসব পালনের ভিন্ন রীতি, যা এই বৈচিত্র্যকে করে তোলে আরও সমৃদ্ধ ও আকর্ষণীয়।
নববর্ষ উপলক্ষে রেস্তোরাঁয় প্রাপ্ত বিশেষ ' নববর্ষ থালি ' (ফাইল)
তবে সময়ের পরিবর্তনে, ব্যস্ত জীবনের চাপে এখন অনেকেই আর আগের মতো সব আচার-অনুষ্ঠান মেনে পয়লা বৈশাখ উদযাপন করতে পারেন না। এর পরিবর্তে শহুরে জীবনে এক নতুন প্রবণতা বেড়েছে, রেস্টুরেন্টে গিয়ে বিশেষ “বৈশাখী থালি” উপভোগ করা, যেখানে নানা ঐতিহ্যবাহী খাবার একসঙ্গে পরিবেশন করা হয়। এই আধুনিক রেস্টুরেন্ট সংস্কৃতি যেমন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে, তেমনি কোথাও যেন হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার সেই সহজ, আন্তরিক, পারিবারিক ঐতিহ্য। তবুও সত্যি এই যে, মাটির ঘ্রাণে ভরা সেই গ্রামীণ রীতি, আচার আর মিলনের আনন্দই পয়লা বৈশাখের আসল সৌন্দর্য, যা কোনো আধুনিকতার মধ্যেই পুরোপুরি প্রতিস্থাপিত হওয়া সম্ভব নয়।