শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ
শাড়ির দুনিয়ায় কিছু কিছু পোশাক সময়ের সঙ্গে পুরনো হয় না, বরং নতুন প্রজন্মের হাত ধরে বারবার ফিরে আসে। শিফন শাড়ি তেমনই এক নাম। হালকা, মসৃণ, শরীরে সহজে বসে যায়, আর তার সঙ্গে যদি থাকে নরম প্যাস্টেল রং, মুক্তোর গয়না ও পরিমিত সাজ, তবে তৈরি হয় এমন এক আভিজাত্য, যার আবেদন কয়েক দশক পরেও অটুট।
২০২৬ সালেও শিফন শাড়ির সেই আকর্ষণ কমেনি। কিন্তু এই পরিচিত শিফন শাড়ির ভারতীয় যাত্রার গল্প খুঁজতে গেলে আমাদের চোখ চলে যায় সুদূর ইউরোপে নয়, পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার রাজপরিবারে।
ফ্রান্সের কাপড়, কোচবিহারের রাজদরবারে নতুন পরিচয়
শিফন আদতে ভারতীয় বস্ত্র নয়। ইউরোপে ব্যবহৃত অত্যন্ত হালকা, সূক্ষ্ম ও স্বচ্ছ কাপড় হিসেবেই তার পরিচিতি তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ভারতীয় পোশাকের সঙ্গে তার মেলবন্ধন ঘটিয়ে তাকে একটি নতুন পরিচয় দেওয়ার গল্পে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন কোচবিহারের মহারানি ইন্দিরা দেবী।
ইন্দিরা দেবী ছিলেন বরোদার রাজকন্যা। পরবর্তীকালে তাঁর বিবাহ হয় কোচবিহারের মহারাজা জিতেন্দ্র নারায়ণের সঙ্গে। ফলে তিনি হয়ে ওঠেন কোচবিহারের মহারানি। ফ্রান্স সফরের সময় শিফনের হালকা, স্বচ্ছ ও মসৃণ বুনন তাঁকে আকৃষ্ট করে। ভারতীয় নারীর পরম্পরাগত শাড়ির সঙ্গে এই কাপড়ের মেলবন্ধন ঘটিয়ে তিনি তৈরি করেন এক নতুন পোশাক-রুচি। এই কারণেই ভারতীয় ফ্যাশনের ইতিহাসে ইন্দিরা দেবীকে শিফন শাড়ির প্রচলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথিকৃৎ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
শিফন শাড়িতে মহারানী গায়ত্রী দেবী
১৯২৭-এর সেই সাদা শিফন, যে ছবি বদলে দিয়েছিল ফ্যাশনের ইতিহাস
ইন্দিরা দেবীর শিফন-পর্বের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একটি ঐতিহাসিক প্রতিকৃতিও। ফ্যাশন-ইতিহাসের বিভিন্ন বিবরণে জানা যায়, তিনি ফ্রান্স থেকে নয়-গজের শিফন শাড়ি আনিয়েছিলেন। ১৯২৭ সালে সাদা শিফন শাড়ি, সূক্ষ্ম বর্ডার এবং মুক্তোর সাজে তাঁর প্রতিকৃতি সেই সময়ের রাজকীয় ফ্যাশনে নতুন মাত্রা যোগ করে।
ভারতীয় শাড়ির ঐতিহ্যবাহী কাঠামোর সঙ্গে ইউরোপীয় কাপড়ের এই মেলবন্ধন ছিল যথেষ্ট অভিনব। শাড়ি বদলায়নি, বদলে গিয়েছিল তার উপাদান ও উপস্থাপনা। আর সেখান থেকেই তৈরি হয়েছিল শিফন শাড়ির ভারতীয় রাজকীয় পরিচয়।
শিফনের ভারতীয় গল্পে পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার কেন গুরুত্বপূর্ণ
শিফনের ইতিহাস বলতে গিয়ে অনেক সময় শুধু জয়পুরের মহারানি গায়ত্রী দেবীর কথা সামনে আসে। কিন্তু তার আগের অধ্যায়টি মনে রাখলে গল্পটি সম্পূর্ণ অন্যরকম হয়ে যায়। কারণ সেই অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার।
কোচবিহার রাজপরিবারের জীবনযাত্রায় ভারতীয় ঐতিহ্য এবং ইউরোপীয় আধুনিকতার একটি স্বতন্ত্র মেলবন্ধন তৈরি হয়েছিল। সেই সাংস্কৃতিক পরিসরেই ইন্দিরা দেবীর পোশাক-ভাবনা নতুন মাত্রা পেয়েছিল।অর্থাৎ শিফনের ভারতীয় যাত্রা শুধুমাত্র একটি বিদেশি কাপড়ের আগমন ছিল না। এটি ছিল ইউরোপীয় বস্ত্র, ভারতীয় শাড়ি এবং কোচবিহারের রাজকীয় রুচির এক অনন্য সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন।
মায়ের হাত ধরে শুরু, কন্যার হাত ধরে বিশ্বজোড়া পরিচিতি
ইন্দিরা দেবীর কন্যা গায়ত্রী দেবী পরবর্তীকালে জয়পুরের মহারানি হন। কিন্তু তাঁর পরিচয় শুধু রাজপরিবারের সদস্য হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তিনি হয়ে ওঠেন আন্তর্জাতিক ফ্যাশনের অন্যতম পরিচিত ভারতীয় মুখ।গায়ত্রী দেবীর শিফন শাড়ির ধরন ছিল অত্যন্ত স্বতন্ত্র, হালকা প্যাস্টেল রং, নিখুঁতভাবে পরা শাড়ি, মুক্তোর গয়না এবং স্বাভাবিক সৌন্দর্য।
ভারী গয়না কিংবা অতিরিক্ত সাজের পরিবর্তে তিনি তৈরি করেছিলেন পরিমিত অথচ রাজকীয় সৌন্দর্যের এক নতুন সংজ্ঞা। ইন্দিরা দেবীর ফ্যাশন-পরীক্ষা ছিল সূচনা। গায়ত্রী দেবীর হাত ধরে সেই রুচি হয়ে উঠল একটি আন্তর্জাতিক স্টাইল।
রাজপ্রাসাদ থেকে সাধারণ মহিলার আলমারিতে
গায়ত্রী দেবীর জনপ্রিয়তার সঙ্গে শিফন শাড়িও রাজপরিবারের সীমানা পেরিয়ে বৃহত্তর সমাজে পরিচিত হয়ে ওঠে। সামাজিক অনুষ্ঠান, জনসমক্ষে উপস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে তাঁর শিফন শাড়ি তাঁকে আলাদা করে তুলেছিল।
প্যাস্টেল শিফন, মুক্তোর মালা এবং পরিমিত সাজ ধীরে ধীরে ভারতীয় মহিলাদের মধ্যেও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।একসময় অভিজাত পোশাক হিসেবে পরিচিত শিফন পরবর্তীকালে মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত ভারতীয় মহিলার পোশাকের অংশ হয়ে যায়।
শিফন শাড়িতে মহারানী গায়ত্রী দেবী
রাজকীয়তার পর শিফন পেল বলিউডের রোম্যান্টিক পরিচয়
শিফনের জনপ্রিয়তার পরবর্তী বড় অধ্যায় লিখেছে ভারতীয় চলচ্চিত্র। পাহাড়ের বরফ, বৃষ্টিভেজা প্রকৃতি, সবুজ উপত্যকা কিংবা সরষে-ফুলের মাঠ, নায়িকার শরীর ঘিরে উড়তে থাকা শিফন শাড়ি হয়ে ওঠে হিন্দি সিনেমার অন্যতম পরিচিত দৃশ্যভাষা।
সত্তর, আশি এবং নব্বইয়ের দশকে অসংখ্য জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের গান শিফনকে আরও সাধারণ মানুষের কল্পনায় নিয়ে আসে। রাজপরিবার শিফনকে দিয়েছিল আভিজাত্য, আর বলিউড তাকে দিয়েছিল রোম্যান্টিকতা। এই দুইয়ের মিলনেই শিফন হয়ে উঠেছিল ভারতীয় জনপ্রিয় সংস্কৃতির এক স্থায়ী অংশ।
সিল্ক থেকে সিন্থেটিক, শিফন কীভাবে পৌঁছল সাধারণ মানুষের কাছে
শুরুর দিকে খাঁটি সিল্ক শিফন ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল। ফলে তা মূলত অভিজাতদের পোশাক হিসেবেই ব্যবহৃত হত। পরবর্তীকালে নাইলন ও পলিয়েস্টার-ভিত্তিক শিফন বাজারে আসায় এই কাপড় সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে চলে আসে।
ফলে শিফন শাড়ি শুধু রাজপরিবার বা অভিজাত মহিলাদের পোশাক থাকেনি। বিয়ে, অভ্যর্থনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, উৎসব কিংবা বিশেষ কোনও অনুষ্ঠানের সাজেও জায়গা করে নেয় এই হালকা কাপড়ের শাড়ি।
আজও কেন ফিরে আসে শিফন
ফ্যাশন বদলায়। পোশাকের ধরন বদলায়। প্রজন্মের পছন্দ বদলায়। কিন্তু কিছু পোশাক সময়কে অতিক্রম করে টিকে থাকে। শিফন তেমনই। আধুনিক ফ্যাশনে যখন আবার ‘ভিনটেজ’, ‘ক্লাসিক’ এবং পরিমিত সাজের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে, তখন শিফনও নতুন করে ফিরে আসছে।
ডিজাইনাররা পুরনো দিনের প্যাস্টেল শেড, মুক্তোর গয়না ও হালকা শাড়ির সঙ্গে আধুনিক ব্লাউজ, নতুন নকশা এবং সমকালীন অলঙ্করণ মিলিয়ে তৈরি করছেন নতুন ধরনের শিফন সাজ।
২০২৬-এও প্রাসঙ্গিক সেই রাজকীয় উত্তরাধিকার
শিফনের সেই পুরনো রাজকীয় উত্তরাধিকার যে এখনও জীবন্ত, তার সাম্প্রতিক উদাহরণও রয়েছে। ২০২৬ সালে গায়ত্রী দেবীর নাতনি গৌরবী কুমারীর মেট গালা পোশাকে গায়ত্রী দেবীর পুরনো শিফন শাড়ির অংশ ব্যবহারের ঘটনাটি সেই উত্তরাধিকারকে নতুন করে আন্তর্জাতিক ফ্যাশনের আলোচনায় নিয়ে আসে।
অর্থাৎ, প্রায় এক শতাব্দী আগে কোচবিহারের রাজপরিবারে যে ফ্যাশন-পরীক্ষার সূত্রপাত হয়েছিল, তার প্রভাব এখনও নতুন প্রজন্মের পোশাক-ভাবনায় দেখা যায়।
প্রতীকী ছবি
একটি শাড়ি নয়, এক শতাব্দীর সাংস্কৃতিক যাত্রা
শিফনের গল্প আসলে শুধু একটি কাপড়ের গল্প নয়। এটি ফ্রান্স থেকে আসা একটি সূক্ষ্ম কাপড়ের ভারতীয় শাড়ির সঙ্গে মিশে যাওয়ার গল্প। এটি কোচবিহারের মহারানি ইন্দিরা দেবীর রুচি ও সাহসী ফ্যাশন-পরীক্ষার গল্প। এটি তাঁর কন্যা গায়ত্রী দেবীর হাত ধরে রাজকীয় সৌন্দর্যের আন্তর্জাতিক পরিচিতি পাওয়ার গল্প। আর পরে বলিউডের মাধ্যমে কোটি মানুষের কল্পনায় পৌঁছে যাওয়ার গল্প।
এই দীর্ঘ যাত্রায় পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকে।সময়ের সঙ্গে শিফনের রং বদলেছে, কাপড়ের উপাদান বদলেছে, পরার ধরন বদলেছে। কিন্তু তার মূল আকর্ষণ, হালকা, স্বচ্ছ, মার্জিত এবং আভিজাত্যপূর্ণ সৌন্দর্য, আজও একই রয়ে গেছে।
তাই শিফন শাড়িকে শুধু ফ্যাশনের একটি ধরন হিসেবে দেখলে তার গল্প অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এর মধ্যে রয়েছে রাজপরিবারের ইতিহাস, বাংলার কোচবিহারের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার, ভারতীয় নারীর পোশাক-রুচির পরিবর্তন এবং প্রায় এক শতাব্দী ধরে সময়কে অতিক্রম করে চলা এক অনন্য নান্দনিকতার গল্প।