রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের দেখা পাওয়ার আশায় প্রতি বছর দেশের নানা প্রান্ত থেকে হাজার হাজার পর্যটক ভিড় জমান সুন্দরবনে। কিন্তু বাঘমামার শাবককে নিয়ে খুনসুটি, জলে গড়াগড়ি— এমন দৃশ্য যে একদিন সত্যিই চোখের সামনে ধরা দেবে, তা কেউ ভাবতেই পারেননি। ঠিক সেই অবিশ্বাস্য মুহূর্তই দেখা গেল গত সোমবার ঝড়খালির দেউল ভাড়ানির খাঁড়িতে। তিন পর্যটকের মোবাইল ক্যামেরায় ধরা পড়ে মা-বাঘ ও তার শাবকের জলকেলি— কখনও শাবকের দুষ্টুমি, কখনও মায়ের পিঠে চড়ে লাফালাফি, আবার কখনও জল ছিটিয়ে খেলা। দৃশ্যটি সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হতেই সুন্দরবনে পর্যটকদের ঢল নেমেছে। লঞ্চঘাট, বুকিং কাউন্টার— সর্বত্র এখন হাঁসফাঁস পরিস্থিতি।
বনমন্ত্রী বীরবাহা হাঁসদা আলোচনায় উঠে আসা এই উন্মাদনার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, “ভিড় তো আগেও দেখেছি, কিন্তু এ বার যে উত্তেজনা— তা একেবারেই অন্য স্তরের! সুন্দরবনের বাঘ সংখ্যা সত্যিই বেড়েছে। এর কৃতিত্ব আমাদের পরিশ্রমী বনকর্মীদের।” তাঁর কথায়, ঝড়–বৃষ্টি–রোদ মাথায় করে প্রতিদিন যে ভাবে বনরক্ষীরা পাহারা দেন, তা বাইরে থেকে অনেকে কল্পনাও করতে পারেন না।
কয়েক বছর আগে পর্যন্ত সুন্দরবন থেকে ফিরে অনেকেই বলতেন, “বাঘ দেখা হয়নি, কেবল কুমির-হরিণ দেখেই ফিরলাম!” কিন্তু লকডাউনের পর পরিস্থিতি আমূল বদলে গিয়েছে। অরণ্য সংরক্ষণে জোর, খাদ্যপ্রজাতির বৃদ্ধি, নিয়মিত নজরদারি— সব মিলিয়ে শুধু বাঘের সংখ্যা বাড়েনি, বেড়েছে তাদের দর্শনযোগ্যতা ও গতিবিধিও।
বনদফতরের সর্বশেষ হিসাবে, বর্তমানে সুন্দরবনে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা ১০১। ডিসেম্বর থেকেই শুরু হচ্ছে নতুন ‘টাইগার সেনসাস’— যেখানে গোটা সুন্দরবন অঞ্চলে বসানো হবে ১,৪৮৪টি ট্র্যাপ ক্যামেরা। প্রায় ৪,১০০ বর্গকিমি জুড়ে হবে এই পর্যবেক্ষণ। এক বনকর্তা জানিয়েছেন, “এ বার প্রযুক্তিগত দিক থেকে আমরা অনেক এগিয়েছি। অ্যাপ-ভিত্তিক নজরদারিতে বাঘের পাশাপাশি হরিণ, বুনো শুয়োরের মত খাদ্যপ্রজাতির নড়াচড়ার তথ্যও পাওয়া যাবে। শিকার কমে গেলে বাঘ লোকালয়ে ঢোকে— তাই এই তথ্যগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।” অন্য এক কর্মকর্তা মনে করিয়ে দেন, বাঘগণনা এখন আর ‘সংখ্যা গণনা’ নয়— পুরো ইকোসিস্টেমের স্বাস্থ্যপরীক্ষা।
এদিকে, ন্যাশনাল বোর্ড ফর ওয়াইল্ডলাইফের নতুন অনুমোদনের পর সুন্দরবন টাইগার রিজার্ভের (STR) আয়তন বেড়ে হয়েছে ৩,৬২৯.৫৭ বর্গকিমি। এতদিন যা ভারতের সপ্তম বৃহত্তম ছিল, তা এখন দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম টাইগার রিজার্ভ— অন্ধ্রপ্রদেশের নগার্জুনসাগর–শ্রীশৈলম রিজার্ভের পরেই। এই সম্প্রসারণে যুক্ত হয়েছে দক্ষিণ ২৪ পরগনার মাতলা, রায়দিঘি ও রামগঙ্গা বনরেঞ্জ। বনমন্ত্রী জানান, “মুখ্যমন্ত্রী এই সিদ্ধান্তে অত্যন্ত খুশি। বড় এলাকা একত্রে সংরক্ষণে আনলে বাঘ ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী হবে।”
সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞদের মতে, বহু বছর ধরে এই সম্প্রসারণের দাবি ছিল। অবশেষে ২০২৫ সালে তা কার্যকর হওয়ায় জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক সংরক্ষণ প্রকল্পগুলিতে সাহায্য পাওয়া সহজ হবে। বাঘ সংরক্ষণ, প্রকল্পভিত্তিক কেন্দ্রীয় বরাদ্দ এবং পর্যটনের উন্নয়ন— সব দিকেই ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। যদিও কিছু বনকর্তার মত, শুধু এলাকা বাড়লেই হবে না, STR–এ কর্মীবাহিনীর সংকটও দূর করা জরুরি। বর্তমান অনুমোদিত জনবলের মাত্র ৪০% কর্মরত— ফলে বাড়তি এলাকায় নজরদারি রাখতে চাপ আরও বাড়বে।
অন্যদিকে, নতুন সংযুক্ত এলাকার কারণে মাছ ধরার ক্ষেত্রে সমস্যার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন কিছু মৎস্যজীবী। তাঁদের দাবি, জীবিকা সংকট দেখা দিতে পারে। বনমন্ত্রী অবশ্য পরিষ্কার জানিয়েছেন, “এগুলো বাফার জোন। তাই তাদের স্বাভাবিক জীবিকায় কোনো বাধা হবে না।”
বাঘের বৃদ্ধি— পরিসংখ্যান বলছে বদলের গল্প
অল ইন্ডিয়া টাইগার মনিটরিং-এর তথ্য অনুযায়ী সুন্দরবনে বাঘসংখ্যার ধারাবাহিক বৃদ্ধি নজর কাড়ছে—
২০১০: ৭৪
২০১৪: ৭৬
২০১৮: ৮৮
২০২২: ১০১
এ ছাড়া বাঘের ঘনত্বও উল্লেখযোগ্য— প্রতি ১০০ বর্গকিমিতে ৪.২৭টি বাঘ। গড় চলাফেরা— বাঘিনীর ৪.১ কিমি, পুরুষ বাঘের ৬.৪ কিমি। সেক্স রেশিও অনুযায়ী, প্রতি ১টি পুরুষ বাঘের বিপরীতে আছে প্রায় ২টি বাঘিনী।
সব মিলিয়ে বাঘ দেখা এবার আর ভাগ্যের উপর নির্ভর নয়— সংরক্ষণের উন্নতি ও প্রযুক্তিগত নজরদারির ফলে সুন্দরবন এখন সত্যিই ‘টাইগার ট্যুরিজম’-এর নতুন তীর্থক্ষেত্র। শাবকের সঙ্গে মা-বাঘের সেই জলখেলার দৃশ্য যেন এই পরিবর্তনেরই প্রতীক— বাঘের রাজ্যে প্রাণ ফিরছে নতুনভাবে।