হিন্দু–মুসলিম মেরুকরণের শিকড়

Story by   Atir Khan | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 1 d ago
সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ (ফাইল ছবি)
সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ (ফাইল ছবি)
 
     আতির খান
 
আধুনিক ভারতে হিন্দু–মুসলিম মেরুকরণের ইতিহাস বুঝতে গেলে বিংশ শতাব্দীর শুরুর খিলাফত আন্দোলনের দিকে ফিরে তাকাতে হয়। এটি শুধু ব্রিটিশ নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ছিল না; বরং গণরাজনীতিতে মুসলিম ধর্মীয় পরিচয়ের প্রথম বৃহৎ মাত্রার সংগঠিত উপস্থিতি ছিল।

এই আন্দোলনের প্রভাব রাজনৈতিক চেতনাকে এমনভাবে রূপান্তরিত করেছিল, যার প্রতিধ্বনি আন্দোলনটি ভেঙে যাওয়ার পরও দীর্ঘদিন ধরে শোনা গেছে। ব্রিটিশ শাসন সুদৃঢ় হওয়ার আগে বহু শতাব্দী ধরে ভারতে মুসলিম রাজনৈতিক কর্তৃত্ব জনসংখ্যাগত বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছিল।

দিল্লি সুলতানাত এবং পরবর্তীতে মুঘল সাম্রাজ্য একটি হিন্দু-অধ্যুষিত সমাজ শাসন করত এবং কেবলমাত্র ধর্মতাত্ত্বিক রাষ্ট্রব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা সম্ভব ছিল না। রাজনৈতিক টিকে থাকার জন্য সমন্বয় ও আপস ছিল অপরিহার্য।

সমগ্র উপমহাদেশে শরিয়া আইন কখনও একরূপে প্রয়োগ করা হয়নি; স্থানীয় রীতি-নীতি বহাল ছিল, হিন্দু অভিজাতরা প্রভাব বজায় রেখেছিল এবং শাসনব্যবস্থা ধর্মীয় মতাদর্শ চাপিয়ে দেওয়ার বদলে আলোচনার মাধ্যমে বিকশিত হয়েছিল।

অবশ্যই কিছু বাড়াবাড়ি ছিল, তবে ব্যক্তিগত বিষয়গুলোতে বিভিন্ন সম্প্রদায় প্রায়শই নিজেদের প্রচলিত আইন অনুসারেই পরিচালিত হতো। ধর্মীয় পরিচয়গুলো আলাদা ছিল, কিন্তু তখনও সেগুলো শক্তভাবে বিভক্ত রাজনৈতিক গোষ্ঠীতে সংগঠিত হয়নি। সমন্বয়বাদ (সিঙ্ক্রেটিজম) আদর্শিক প্রকল্পের চেয়ে বরং বাস্তবতার প্রয়োজনেই গড়ে উঠেছিল।

এই ভারসাম্য ভেঙে দেয় মধ্যযুগীয় মুসলিম শাসকেরা নয়, বরং ঔপনিবেশিক রূপান্তর। মুঘল কর্তৃত্বের পতন এবং ব্রিটিশ শক্তির উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে মুসলিম রাজনৈতিক অভিজাত ও উলামারা প্রাতিষ্ঠানিক আধিপত্য হারান।

যে সম্প্রদায় একসময় সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগ করত, তারা এখন এক বিদেশি সাম্রাজ্যের অধীনে প্রান্তিক অবস্থানে চলে যায়। একই সময়ে, নতুন প্রশাসনিক ও শিক্ষাব্যবস্থা তাদের পুরস্কৃত করত যারা দ্রুত ঔপনিবেশিক আধুনিকতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারত। এই রূপান্তর মুসলিম সমাজে অনিশ্চয়তা তৈরি করে—আর অনিশ্চয়তা প্রায়শই প্রতীক খোঁজে।

খিলাফত প্রশ্নটি তেমনই একটি প্রতীকে পরিণত হয়েছিল।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর অটোমান সাম্রাজ্যের ভাঙন এবং খেলাফতের ওপর সম্ভাব্য হুমকি বহু ভারতীয় মুসলিমের মনে গভীর সাড়া জাগায়।

দিল্লিতে দেশভাগের পর একটি শরণার্থী শিবিরের দৃশ্য

ভৌগোলিকভাবে দূরে থাকা সত্ত্বেও অটোমান সুলতানকে মুসলিম বিশ্বের একাংশ উম্মাহর প্রতীকী অভিভাবক এবং আরবের পবিত্র ইসলামী স্থানগুলোর রক্ষক হিসেবে দেখত। খেলাফত রক্ষার প্রশ্নটি ভারতে ধর্মীয় আবেগকে ঔপনিবেশিক-বিরোধী রাজনীতির সঙ্গে একত্রিত করেছিল।

এটি একটি শক্তিশালী সমাবেশের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। এই আন্দোলন আগের কিছু ঘটনার থেকেও শক্তি সঞ্চয় করেছিল। স্যার সৈয়দ আহমদ খানের আলিগড় আন্দোলন ইতোমধ্যেই মুসলিম স্বাতন্ত্র্যের ওপর জোর দিয়েছিল, যা পরে ঔপনিবেশিক ভারতে দ্বি-জাতি তত্ত্বে রূপ নেয়।

১৯১২–১৩ সালের বালকান যুদ্ধ সর্বইসলামি সহমর্মিতা জাগিয়ে তোলে। কানপুরের দাঙ্গার মতো স্থানীয় সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা এবং ঔপনিবেশিক শুমারি ও শ্রেণিবিভাগ নীতিও পরিচয়ের সীমানাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।

১৯১৯ সালে যখন খেলাফত আন্দোলন গতি পায়, তখন ধর্মীয় সংহতির ভিত্তিতে ব্যাপক জনসমর্থন গড়ে ওঠার জন্য মাটি প্রস্তুত ছিল।

আধুনিক ভারতের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিভিন্ন অঞ্চলের বৃহৎ মুসলিম জনগোষ্ঠী একটি অভিন্ন ধর্মীয়-রাজনৈতিক ইস্যুকে কেন্দ্র করে সংগঠিত হয়।

হিন্দু–মুসলিম ভ্রাতৃত্বের একটি দৃশ্য

এই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন বিশিষ্ট উলামা এবং আলি ভ্রাতৃদ্বয়ের মতো ব্যক্তিত্বরা। ইতিহাসবিদ মুশিরুল হাসান মন্তব্য করেছেন যে, আংশিকভাবে সর্বইসলামি ঐক্যের এক রোমান্টিক কল্পনার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা খেলাফত আন্দোলন একটি স্বতন্ত্র মুসলিম রাজনৈতিক চেতনার বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠেছিল।

মহাত্মা গান্ধী এই আন্দোলনকে সমর্থন করেছিলেন, আশা করেছিলেন যে হিন্দু–মুসলিম ঐক্য ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বৃহত্তর সংগ্রামকে আরও শক্তিশালী করবে। এক সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য ধর্মীয় সংগঠন ও ঔপনিবেশিক-বিরোধী জাতীয়তাবাদ এক অনন্য ও অসাধারণ পরিস্থিতিতে পাশাপাশি এগিয়েছিল।

কিন্তু এই জোট দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। গান্ধী অসহযোগ আন্দোলন এবং খেলাফত আন্দোলনের প্রতি তাঁর সমর্থন প্রত্যাহার করেন। ১৯২৪ সালে মুস্তাফা কামাল আতাতুর্ক তুরস্কে আনুষ্ঠানিকভাবে খেলাফত বিলুপ্ত করেন। ফলে খেলাফত আন্দোলন দ্রুত ভেঙে পড়ে। তবে আন্দোলন যে রাজনৈতিক শক্তির উন্মেষ ঘটিয়েছিল, তা হঠাৎ করে মিলিয়ে যায়নি।

এই আন্দোলনের পতন যেন বাঁধ ভেঙে যাওয়ার মতো ছিল—একবার যখন গণভিত্তিক ধর্মীয় সংগঠন রাজনীতির ভাষায় প্রবেশ করল, তখন তাকে সহজে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। বিশ্বাসভিত্তিক রাজনৈতিক পরিচয় খুব কমই নীরবে পিছিয়ে যায়।

পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী ও সাম্প্রদায়িক প্রতিনিধিত্বের মতো ঔপনিবেশিক নীতিগুলো বিভাজনের রেখাকে আরও কঠোর করে তোলে।

ভারতে হিন্দু–মুসলিম ঐক্যের একটি দৃশ্য

ব্রিটিশরা ধর্মীয় পরিচয় সৃষ্টি করেনি, কিন্তু প্রশাসনিক কাঠামো ক্রমশ হিন্দু ও মুসলিমদের একজাতীয় অথচ পৃথক রাজনৈতিক গোষ্ঠী হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করে।

ইতিহাসবিদ ডোমিনিক-সিলা খানের মতে, ঔপনিবেশিক শ্রেণিবিন্যাস ব্যবস্থা ভারতে ধর্মকে যেভাবে ভাবা ও ব্যাখ্যা করা হতো, তা বদলে দেয়। প্রশাসকেরা প্রায়ই সরলীকৃত ধারণার ভিত্তিতে কাজ করতেন—একক “হিন্দুধর্ম” ও একক “ইসলাম”—যার ফলে ভেতরে বৈচিত্র্যময় ঐতিহ্যগুলোকে রাজনৈতিক বিমূর্ত রূপে সংকুচিত করা হয়েছিল।
 
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হিন্দু ও মুসলিম নেতারা একটি অভিন্ন রাষ্ট্রব্যবস্থার নাগরিক হিসেবে নয়, বরং পৃথক সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরূপে ক্ষমতা নিয়ে আলোচনা করতে শুরু করেন। উত্তর ভারতে, বিশেষ করে ইউনাইটেড প্রভিন্সেসে, মুসলিম অভিজাতদের একটি অংশ সাংবিধানিক সুরক্ষা ও বিশেষ অধিকারের দাবি তোলে।

আলিগড়ের বুদ্ধিবৃত্তিক ধারা, আল্লামা ইকবালের কবিতা এবং পরবর্তীতে মুহাম্মদ আলি জিন্নাহর নেতৃত্ব সংখ্যালঘু উদ্বেগকে একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক দাবিতে রূপান্তরিত করে, যা একধরনের শ্রেষ্ঠত্ববোধ দ্বারা প্রভাবিত ছিল।

এটি সুপরিচিত যে সব মুসলিম দেশভাগকে সমর্থন করেননি—দেওবন্দের কিছু উলামা এবং মাওলানা আবুল কালাম আজাদের মতো নেতারা যৌথ জাতীয়তাবাদের পক্ষে জোরালো যুক্তি তুলে ধরেছিলেন। তবুও পৃথক রাজনৈতিক পরিচয়ের যুক্তি এতটাই শক্তিশালী গতি পেয়েছিল যে তা আর থামানো যায়নি।

তবে মেরুকরণ সাধারণত একমুখী হয় না। মুসলিম রাজনৈতিক সংহতি হিন্দু সমাজের একটি অংশের মধ্যেও সমান্তরাল প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।

ব্রিটিশরা হিন্দু ও মুসলিম উভয়ের জন্য পৃথক ব্যক্তিগত আইন প্রণয়ন করেছিল।
মুসলিমদের তথাকথিত সাম্প্রদায়িক দরকষাকষির প্রতিক্রিয়ায় হিন্দু সংস্কারবাদী ও পুনর্জাগরণবাদী আন্দোলন, এবং পরবর্তীতে হিন্দু পরিচয়ভিত্তিক রাজনৈতিক সংগঠনগুলো আত্মপ্রকাশ করে।

১৮৮৫ থেকে ১৯৪৭—মাত্র ছয় দশকের মধ্যেই—শতাব্দীজুড়ে গড়ে ওঠা এক নাজুক সহাবস্থান ভয়াবহভাবে ভেঙে পড়ে, যার পরিণতি ছিল দেশভাগ এবং তার পরপরই নজিরবিহীন সহিংসতা।

স্বাধীন ভারত এই বিভাজন অতিক্রম করার লক্ষ্যে সাংবিধানিক ধর্মনিরপেক্ষতা গ্রহণ করে। গণপরিষদে মুসলিম সদস্যরাও এর প্রতিদান দেন এবং স্বেচ্ছায় মুসলিমদের জন্য পৃথক সংরক্ষণের দাবি ত্যাগ করেন।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ধর্মীয় মেরুকরণ আবারও তীব্র হয়েছে। ঐতিহাসিক উদ্বেগ সহজে মুছে যায় না। যখন সম্প্রদায়গুলো অভিযোগ ও স্মৃতির আশ্রয়ে নিজেদের গুটিয়ে নেয়, তখন অবিশ্বাসের সময়কাল আবার ফিরে আসে। নিরাপত্তাহীনতা যখন রাজনৈতিক সংগঠনের ভিত্তি হয়ে ওঠে, তখন প্রতিক্রিয়া ও পাল্টা-প্রতিক্রিয়ার চক্র শুরু হয়।

খেলাফত আন্দোলনের গুরুত্ব এককভাবে দোষারোপে নয়, বরং এর দৃষ্টান্তমূলক তাৎপর্য বোঝার মধ্যে নিহিত।

এটি দেখিয়েছিল যে প্রধানত ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা গণরাজনীতি—যদিও তা ঔপনিবেশিক বিরোধী আকাঙ্ক্ষা থেকে উৎসারিত—জনজীবনের কাঠামোকে স্থায়ীভাবে বদলে দিতে পারে।

একবার বিশ্বাস বা ধর্ম রাজনৈতিক সংগঠনের কেন্দ্রীয় অক্ষ হয়ে উঠলে আপস করা কঠিন হয়ে যায় এবং সন্দেহ জন্ম নেওয়া সহজ হয়।

নিশ্চিতভাবে বলা যায়, রোমান্টিক নস্টালজিয়া বা প্রতিক্রিয়াশীল ক্ষোভ নয়, বরং রাজনৈতিক পরিপক্বতাই নির্ধারণ করে বহুত্ববাদী সমাজ টিকে থাকবে কি না।

সভ্যতাগুলো স্বভাবতই সমন্বয়ধর্মী। এগুলোকে একক পরিচয়ের—ধর্মীয় বা অন্য কোনো—মাধ্যমে পুনর্গঠন করার চেষ্টা করলে তার পরিণতি সম্পর্কে ইতিহাস বারবার সতর্ক করেছে।

লেখক ‘আওয়াজ-দ্য ভয়েস’ পোর্টালের মুখ্য সম্পাদক।