শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে কড়া পদক্ষেপ, বাংলায় দু’দিনে প্রায় ১,৫০০ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের লাউডস্পিকার সরানোর নির্দেশ
কলকাতা:
শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে পশ্চিমবঙ্গজুড়ে কড়া পদক্ষেপ শুরু করেছে পুলিশ। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, মাত্র দু’দিনে রাজ্যের প্রায় ১,৫০০টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের লাউডস্পিকার সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রায় ১,২৭৯টি মসজিদ এবং ১৯৯টি মন্দির।
পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই পদক্ষেপ কোনও নির্দিষ্ট ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নয়। শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের বিধি মেনে সব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেই একই নিয়ম প্রয়োগ করা হচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেশ কিছু এলাকায় স্থানীয় পুলিশ মসজিদ ও মন্দির কর্তৃপক্ষকে লাউডস্পিকার বা জনসমক্ষে শব্দ সম্প্রচারের ব্যবস্থা খুলে নেওয়ার জন্য মৌখিকভাবে নির্দেশ দিয়েছে। কয়েকটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের দাবি, তাঁদের হাতে কোনও লিখিত নির্দেশ দেওয়া হয়নি; স্থানীয় পুলিশকর্মীরা সরাসরি এসে লাউডস্পিকার বন্ধ বা খুলে নিতে বলেছেন।
কী রয়েছে শব্দদূষণ বিধিতে?
ভারতে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য Noise Pollution (Regulation and Control) Rules, 2000 কার্যকর রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, ধর্মীয় বা অন্য কোনও প্রতিষ্ঠানে লাউডস্পিকার ব্যবহারের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শর্ত মানতে হয়। দিনের বেলায় লাউডস্পিকার ব্যবহারের জন্যও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি প্রয়োজন হতে পারে এবং নির্ধারিত শব্দসীমা অতিক্রম করা যাবে না।
এলাকা ও জোনভেদে অনুমোদিত শব্দসীমাও আলাদা। আবাসিক এলাকায় সাধারণত দিনের সময়ে সর্বোচ্চ ৫৫ ডেসিবেল এবং রাতে ৪৫ ডেসিবেল পর্যন্ত শব্দসীমা নির্ধারিত রয়েছে। বাণিজ্যিক ও শিল্পাঞ্চলের ক্ষেত্রে সীমা তুলনামূলক বেশি।
পুলিশের বক্তব্য, ধর্মীয় অনুষ্ঠান বা প্রার্থনার সঙ্গে যুক্ত হলেও লাউডস্পিকার ব্যবহারের ক্ষেত্রে শব্দদূষণ সংক্রান্ত আইন অমান্য করার সুযোগ নেই।
সব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেই ব্যবস্থা
পুলিশের একাংশের দাবি, মসজিদ, মন্দির-সহ বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে শব্দদূষণ নিয়ে অভিযোগ পাওয়ার পরেই এই অভিযান শুরু হয়েছে। কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলছেন, কোনও একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে এই অভিযান চালানো হচ্ছে না।
এই পদক্ষেপকে রাজ্যে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের অন্যতম বড় উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে সকাল ও রাতের সময়ে অতিরিক্ত শব্দ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন এলাকায় অভিযোগ রয়েছে।
তবে পুলিশের এই পদক্ষেপ নিয়ে কিছু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রশ্নও উঠেছে। কয়েকটি কমিটির প্রতিনিধির বক্তব্য, লাউডস্পিকার সরানোর বিষয়ে তাঁদের কাছে কোনও লিখিত নোটিস দেওয়া হয়নি। ফলে কোন নির্দিষ্ট নিয়ম ভাঙার অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তা নিয়ে তাঁদের মধ্যে অস্পষ্টতা রয়েছে।
প্রশাসনের নজরে শব্দদূষণ
পুলিশের তরফে অবশ্য বার্তা দেওয়া হয়েছে, ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, শব্দের মাত্রা এবং প্রচলিত আইন মেনেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলিকে নির্ধারিত শব্দসীমা মেনে চলা এবং প্রয়োজনীয় অনুমতি ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
শব্দদূষণ নিয়ে পরিবেশবিদদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, ধর্মীয় অনুষ্ঠান, রাজনৈতিক কর্মসূচি, সামাজিক অনুষ্ঠান এবং বিভিন্ন উৎসবে অতিরিক্ত শব্দের কারণে সাধারণ মানুষের সমস্যা তৈরি হয়। বিশেষ করে হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক এলাকার কাছাকাছি উচ্চ শব্দ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
এখন দেখার, পুলিশের এই অভিযানের পর রাজ্যের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলিতে লাউডস্পিকার ব্যবহারের ক্ষেত্রে কী ধরনের নতুন নিয়মকানুন কার্যকর হয় এবং মৌখিক নির্দেশের পরিবর্তে প্রশাসনের পক্ষ থেকে লিখিত নির্দেশিকা জারি করা হয় কি না।