শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ
উত্তরবঙ্গের অরণ্য থেকে মিলল আশাব্যঞ্জক খবর। জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যান ও বক্সা টাইগার রিজার্ভে একাধিক ক্লাউডেড লেপার্ড বা ‘মেঘ চিতাবাঘ’-এর উপস্থিতির প্রমাণ মিলেছে বন দপ্তরের বসানো ট্র্যাপ ক্যামেরায়। সম্প্রতি ধরা পড়া এই ছবিগুলি প্রকাশ করে জলদাপাড়া ওয়াইল্ডলাইফ ডিভিশনের ডিভিশনাল ফরেস্ট অফিসার (ডিএফও) প্রবীণ কাসোয়ান জানান, ভারতের হাতে গোনা কয়েকটি বনাঞ্চলেই এই বিরল প্রজাতির বাস রয়েছে, যার মধ্যে উত্তরবঙ্গ অন্যতম।
সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি লিখেছেন, গভীর অরণ্যে বসবাসকারী এই লাজুক প্রাণীকে সরাসরি দেখা অত্যন্ত কঠিন। তাই ট্র্যাপ ক্যামেরায় তাদের উপস্থিতি ধরা পড়া শুধু বনকর্মীদের জন্য নয়, বন্যপ্রাণ সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এতে প্রমাণিত হচ্ছে, উত্তরবঙ্গের বনভূমির বাস্তুতন্ত্র এখনও সুস্থ এবং এই বিরল মাংসাশী প্রাণীর বাসের উপযোগী পরিবেশ বজায় রয়েছে।
ক্লাউডেড লেপার্ডের বৈজ্ঞানিক নাম Neofelis nebulosa। এটি বিশ্বের অন্যতম বিরল বন্য বিড়ালজাতীয় প্রাণী এবং আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘ (IUCN)-এর লাল তালিকায় ‘Vulnerable’ বা ঝুঁকিপূর্ণ প্রজাতি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার চিরসবুজ ও উপক্রান্তীয় অরণ্যই এদের প্রধান আবাসস্থল। ভারতে মূলত উত্তরবঙ্গ, অসম, অরুণাচল প্রদেশ, মেঘালয়, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড, ত্রিপুরা ও সিকিমের কিছু বনাঞ্চলে এদের দেখা মেলে।
একঝলক দেখলে সাধারণ চিতাবাঘ বলে ভুল হতে পারে। তবে ক্লাউডেড লেপার্ডের গায়ের বড় বড় মেঘের মতো ছোপই তাকে আলাদা পরিচয় দেয়। তুলনামূলকভাবে ছোট আকারের হলেও এদের ক্যানাইন দাঁত শরীরের অনুপাতে বিড়ালজাতীয় প্রাণীদের মধ্যে সবচেয়ে বড়। অসাধারণ দক্ষতায় গাছে ওঠানামা, ডাল বেয়ে উল্টো হয়ে চলাফেরা এবং উঁচু গাছ থেকে লাফ দেওয়ার ক্ষমতার জন্য এই প্রাণী বিশেষভাবে পরিচিত। এরা মূলত নিশাচর এবং অত্যন্ত লাজুক স্বভাবের হওয়ায় মানুষের চোখে খুব কমই ধরা পড়ে।
বন্যপ্রাণ বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্র্যাপ ক্যামেরায় বারবার ক্লাউডেড লেপার্ডের ছবি ধরা পড়া উত্তরবঙ্গের অরণ্যের জীববৈচিত্র্যের জন্য ইতিবাচক ইঙ্গিত। এই ধরনের শীর্ষ শিকারির উপস্থিতি একটি বনাঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় থাকার অন্যতম সূচক। একই সঙ্গে এটি সংরক্ষণমূলক পদক্ষেপের কার্যকারিতারও প্রমাণ বহন করে।
তবে বন দপ্তরের আধিকারিকরা জানাচ্ছেন, বনভূমি সংকুচিত হওয়া, মানুষের অনুপ্রবেশ, চোরাশিকার এবং আবাসস্থলের বিচ্ছিন্নতা এখনও এই বিরল প্রাণীর অস্তিত্বের প্রধান চ্যালেঞ্জ। তাই নিয়মিত ক্যামেরা ট্র্যাপ পর্যবেক্ষণ, বনাঞ্চলের সংযোগ রক্ষা, নজরদারি বৃদ্ধি এবং স্থানীয় মানুষকে সচেতন করার উপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
উত্তরবঙ্গের এই সাফল্য শুধু বন দপ্তরের নয়, গোটা দেশের বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ আন্দোলনের জন্যও এক বড় প্রাপ্তি। বিশেষজ্ঞদের আশা, ধারাবাহিক সংরক্ষণ উদ্যোগ ও বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে আগামী দিনে এই দুর্লভ ‘মেঘ চিতাবাঘ’-এর সংখ্যা আরও বাড়বে এবং উত্তরবঙ্গ ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্লাউডেড লেপার্ড আবাসস্থল হিসেবে আরও সুপ্রতিষ্ঠিত হবে।