সুদীপ শর্মা চৌধুরী
সীমান্ত কেবল একটি রেখা নয়। একটি দেশের সার্বভৌমত্ব, মানুষের পরিচয়, নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ কূটনীতির অদৃশ্য ভিত্তি লুকিয়ে থাকে সেই রেখার মধ্যেই। তাই যখনই দুটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যে 'ভূমি বিনিময়' বা সীমান্ত পুনর্নির্ধারণ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়, তখন তা নিছক প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের গণ্ডি ছাড়িয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রে উঠে আসে।
এক দশক আগে ভারত–বাংলাদেশ স্থলসীমান্ত চুক্তি ইতিহাসের এক জটিল অধ্যায়ের অবসান ঘটিয়েছিল। সেই স্মৃতি এখনও টাটকা। এরই মধ্যে ভারত ও মায়ানমারের মধ্যে সীমান্তের একটি অমীমাংসিত অংশ নিয়ে সম্ভাব্য ভূমি বিনিময়ের খবর নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। যদিও ভারত সরকার এখনও কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেনি, তবুও কূটনৈতিক মহলে এই বিষয়টি এখন গভীর আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু।
সীমান্তের যে গল্প আজও অসমাপ্ত
ভারত ও মায়ানমারের ১,৬৪৩ কিলোমিটার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্ত উত্তর-পূর্ব ভারতের চারটি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য, অরুণাচল প্রদেশ, নাগাল্যান্ড, মণিপুর ও মিজোরামকে স্পর্শ করেছে। দুর্গম পাহাড়, ঘন অরণ্য এবং ব্রিটিশ আমলের অস্পষ্ট সীমারেখার কারণে এখনও কিছু অংশে সীমান্ত নির্ধারণ সম্পূর্ণ হয়নি।
বিশেষ করে মণিপুরের চন্দেল জেলার সীমান্তবর্তী অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই প্রশাসনিক ও কৌশলগত জটিলতার কেন্দ্র। এই অমীমাংসিত অংশের স্থায়ী সমাধানেই সীমিত পরিসরে ভূমি বিনিময়ের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে বলে বিভিন্ন সূত্রের দাবি।
কেন এখন?
এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে রয়েছে মায়ানমারের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর মায়ানমার কার্যত গৃহযুদ্ধের আবহে। জাতিগত সশস্ত্র সংগঠন, সামরিক জান্তা এবং গণতন্ত্রপন্থী শক্তির সংঘর্ষ সীমান্ত অঞ্চলের নিরাপত্তাকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে। বেড়েছে অবৈধ অনুপ্রবেশ, মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান, বিদ্রোহী সংগঠনের সীমান্ত অতিক্রম এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি। ফলে নয়াদিল্লির কাছে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এখন শুধু প্রশাসনিক বিষয় নয়, জাতীয় নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার।
ভূমি বিনিময় নয়, কৌশলগত সীমান্ত পুনর্বিন্যাস?
'ভূমি বিনিময়' শব্দটি শুনলেই অনেকের মনে ভারত–বাংলাদেশ ছিটমহল চুক্তির কথা আসে। কিন্তু বাস্তবে দুই পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তির মূল উদ্দেশ্য ছিল মানবিক সংকটের অবসান। অন্যদিকে মায়ানমারের ক্ষেত্রে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু সীমান্তকে আন্তর্জাতিকভাবে স্পষ্ট ও কার্যকরভাবে চিহ্নিত করা, যাতে ভবিষ্যতে সীমান্ত রক্ষা, নজরদারি এবং অবকাঠামো নির্মাণ আরও সহজ হয়। অর্থাৎ এটি আবেগের নয়, কৌশলগত বাস্তবতার প্রশ্ন।
উত্তর-পূর্ব ভারতের ভবিষ্যৎ কতটা বদলাবে?
যদি সীমান্ত নির্ধারণ সম্পূর্ণ হয়, তাহলে কয়েকটি বড় পরিবর্তন ঘটতে পারে:
- সীমান্তে বেড়া নির্মাণ দ্রুত সম্পন্ন হবে।
- অনুপ্রবেশ ও চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে।
- নিরাপত্তা বাহিনীর নজরদারি আরও কার্যকর হবে।
- সীমান্তবর্তী অঞ্চলে প্রশাসনিক অনিশ্চয়তা কমবে।
- 'অ্যাক্ট ইস্ট' নীতির অধীনে যোগাযোগ ও বাণিজ্যিক প্রকল্পের গতি বাড়বে।
তবে এর উল্টোদিকও রয়েছে। সীমান্তবর্তী উপজাতি ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগে পরিবর্তন আসতে পারে। তাই কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে স্থানীয় মানুষের মতামত ও স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
প্রতীকী ছবি
'ফ্রি মুভমেন্ট রেজিম'-এর অবসান: নতুন নিরাপত্তা নীতির ইঙ্গিত
দীর্ঘদিন ধরে ভারত ও মায়ানমারের সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠী নির্দিষ্ট দূরত্ব পর্যন্ত ভিসা ছাড়াই চলাচলের সুযোগ পেতেন। কিন্তু বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে সেই ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনছে ভারত। এটি স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় দিল্লি এখন আরও কঠোর ও প্রযুক্তিনির্ভর নীতি গ্রহণ করতে চাইছে। সম্ভাব্য সীমান্ত পুনর্নির্ধারণ সেই বৃহত্তর নিরাপত্তা কাঠামোরই অংশ।
চীনের ছায়া এবং ভারতের কৌশল
মায়ানমার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভারতের প্রবেশদ্বার। কালাদান মাল্টি-মোডাল প্রকল্প, ভারত–মায়ানমার–থাইল্যান্ড মহাসড়ক কিংবা 'অ্যাক্ট ইস্ট' নীতির সাফল্য, সবই নির্ভর করছে একটি স্থিতিশীল সীমান্তের উপর।একই সময়ে চীনও মায়ানমারে তাদের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত উপস্থিতি বাড়িয়ে চলেছে। ফলে সীমান্তের প্রতিটি সিদ্ধান্ত শুধু দুই দেশের সম্পর্ক নয়, সমগ্র ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের ভূরাজনীতির সঙ্গেও জড়িত।
প্রশ্ন এখনও রয়ে গেছে...
ভারত সরকার এখনও কোনও চূড়ান্ত ভূমি বিনিময় চুক্তির কথা ঘোষণা করেনি। আলোচনার বিষয় সীমান্তের অমীমাংসিত অংশের সমাধান। তাই বিষয়টিকে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত হিসেবে নয়, বরং চলমান কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই দেখা উচিত।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার, ভারত উত্তর-পূর্ব সীমান্তকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখছে, যেখানে নিরাপত্তা, উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক সংযোগ এবং ভূরাজনীতি একই সূত্রে গাঁথা। মানচিত্রে একটি রেখা টানতে হয়তো কয়েক মুহূর্ত সময় লাগে। কিন্তু সেই রেখার প্রভাব প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষের জীবন, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা এবং ইতিহাসকে প্রভাবিত করে।
ভারত–মায়ানমারের সম্ভাব্য সীমান্ত পুনর্নির্ধারণ সেই কারণেই একটি সাধারণ কূটনৈতিক আলোচনা নয়; এটি ভবিষ্যতের উত্তর-পূর্ব ভারত, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতির নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে।