ভোটের টানে ফেরার পথে মৃত্যুযাত্রা — চলন্ত ট্রেনে চিকিৎসাহীন অবস্থায় প্রাণ হারালেন পরিযায়ী শ্রমিক
দেবকিশোর চক্রবর্তী
ভোটাধিকার প্রয়োগের তাগিদে ঘরে ফেরার পথে এক মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা সামনে এল রাজ্যে। চলন্ত ট্রেনের মধ্যে কার্যত বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু হল এক পরিযায়ী শ্রমিকের। ঘটনাটি ঘটেছে গীতাঞ্জলি এক্সপ্রেস-এ, যা হাওড়াগামী ডাউন ট্রেন হিসেবে মঙ্গলবার রাতে চলছিল।রেল পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মৃতের নাম সুমিত মাতব্বর (৩১)। তাঁর বাড়ি উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁর গোপালপুর এলাকায়। পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ভিন রাজ্যে কাজ করতেন তিনি। ভোট দিতে নিজের বাড়িতে ফেরার জন্যই এই যাত্রা। কিন্তু সেই ফেরা আর সম্পূর্ণ হল না।
ঘটনাটি ঘটে যখন ট্রেনটি খড়্গপুর স্টেশনে ঢোকার আগেই। সংরক্ষিত কামরায় থাকা সুমিত হঠাৎই গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, তিনি পেটে অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকেন এবং একসময় কামরার মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন। সেই সময় ট্রেনে পরিযায়ী শ্রমিকদের অতিরিক্ত ভিড় থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। কেউ সঠিকভাবে তাঁকে সাহায্য করতে পারেননি বলেই অভিযোগ।
যাত্রীদের দাবি, চলন্ত ট্রেনে কোনও প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা ছিল না। পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর হয়ে ওঠে যে সুমিত দীর্ঘক্ষণ ওই অবস্থাতেই পড়ে থাকেন। এরপর ট্রেনটি সাঁতরাগাছি স্টেশন-এ ঢোকার আগে সিগন্যাল না পাওয়ায় কিছু সময় দাঁড়িয়ে যায়। অভিযোগ, সেই দীর্ঘ অপেক্ষার মধ্যেই সুমিতের মৃত্যু হয়।পরে রেল পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। দেহটি ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। বুধবার হাওড়া-র পুলিশ মর্গে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। রিপোর্ট এলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এই ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁসছেন মৃতের পরিবারের সদস্যরা। তাঁদের অভিযোগ, রেলের চরম গাফিলতির কারণেই এমন মর্মান্তিক পরিণতি। “ট্রেনে যদি ন্যূনতম চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকত, তাহলে হয়তো আমার ছেলেটা বেঁচে যেত,”— এমনই দাবি সুমিতের পরিবারের এক সদস্যের।রেল কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে নানা মহলে। বিশেষ করে ভোটের মরসুমে যখন হাজার হাজার পরিযায়ী শ্রমিক ঘরে ফেরেন, তখন অতিরিক্ত ভিড় এবং জরুরি পরিষেবার অভাব নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ দূরত্বের ট্রেনে প্রাথমিক চিকিৎসা ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা থাকা অত্যন্ত জরুরি।
উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক সময়ে রাজ্যে একাধিক পরিযায়ী শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনা সামনে এসেছে, যা প্রশাসনের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভোটকে ঘিরে এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা যেন আর কারও জীবনের শেষ অধ্যায় না হয়ে ওঠে, সেই দাবি উঠছে সর্বত্র।এই ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে সাঁতরাগাছি রেলওয়ে পুলিশ। তবে প্রশ্ন রয়ে যাচ্ছে— ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে গিয়ে কেন একজন নাগরিককে প্রাণের ঝুঁকি নিতে হবে? আর কত প্রাণ গেলে এই ব্যবস্থার পরিবর্তন হবে?