দেবকিশোর চক্রবর্তী
মাতৃভূমি পশ্চিমবঙ্গের কাঁদিতে শেষ কবে ভোট দিয়েছিলেন, তা আর স্মৃতির পাতায় খুঁজে পেলেন না ৭৪ বছরের প্রবীণ সাংবাদিক অমল গুপ্ত। সময়ের স্রোতে কেটে গেছে চার দশকেরও বেশি। জীবনের বড় অংশ কেটেছে অসম-এ, পেশার টানে, জীবিকার প্রয়োজনে। কিন্তু শিকড়ের টান যে এত গভীর, তা যেন আবার প্রমাণ করলেন তিনি, দীর্ঘ ৪০ বছর পর নিজের বিধানসভা কেন্দ্রে ফিরে ভোট দিয়ে।
অমলবাবুর জীবনের গল্পটা অনেকটাই প্রবাসী বাঙালির চেনা কাহিনি। কাজের সূত্রে বহু বছর আগে তিনি পাড়ি দেন অসমে। সেখানেই সাংবাদিকতা জীবনের বিকাশ, সেখানেই গড়ে ওঠে তাঁর পরিচিতি। তিনি নিজেই জানালেন, “সেই হিতেশ্বর শইকীয়া-র আমল থেকেই আমি অসমের ভোটার।” অর্থাৎ প্রায় চার দশক ধরে অসমই ছিল তাঁর রাজনৈতিক ঠিকানা।
তবুও মনের গভীরে রয়ে গিয়েছিল জন্মভূমির প্রতি এক অদৃশ্য টান। সেই টানেই এবার ফিরে আসা। নিজের পুরনো বিধানসভা কেন্দ্রে এসে ভোট দেওয়ার অভিজ্ঞতা তাঁর কাছে শুধু একটি নাগরিক কর্তব্য নয়, বরং এক আবেগঘন প্রত্যাবর্তন। কাঁদির মাটিতে পা রেখেই যেন ফিরে পেলেন অতীতের স্মৃতি, ছেলেবেলার দিন, পরিচিত মানুষ আর সেই চেনা পরিবেশ।
তবে এই ফিরে আসার অভিজ্ঞতায় স্পষ্ট হয়েছে আরেকটি দিকও, ফেলে আসা বাংলা আর আগের মতো নেই। দীর্ঘ চার দশকে বদলে গেছে অনেক কিছু। বদলেছে সমাজ, রাজনীতি, পরিকাঠামো, মানুষের জীবনযাত্রা। কিন্তু এই পরিবর্তন নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি প্রবীণ এই সাংবাদিক। সচেতনভাবেই এড়িয়ে গিয়েছেন বাংলার পরিবর্তন নিয়ে বিশ্লেষণ।
ভোটকেন্দ্রে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায়ও তাঁর চোখে-মুখে ছিল এক ধরনের নস্টালজিয়া। চার দশক আগের সেই দিনগুলোর সঙ্গে আজকের সময়ের তুলনা টানতে গিয়েও তিনি খানিক আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। তাঁর কথায়, “সময় বদলেছে, অনেক কিছুই পাল্টে গেছে, কিন্তু ভোট দেওয়ার এই অনুভূতি একই রয়ে গেছে।”
প্রবীণ এই সাংবাদিকের কাছে গণতন্ত্র মানে শুধু খবরের বিষয় নয়, বরং ব্যক্তিগত অংশগ্রহণের এক গুরুত্বপূর্ণ দিক। পেশাগত জীবনে বহু নির্বাচন কভার করলেও, নিজের জন্মভূমিতে ভোট দেওয়ার অভিজ্ঞতা তাঁর কাছে আলাদা মাত্রা এনে দিয়েছে। চার দশক পর নিজের মাতৃভূমিতে ফিরে নিজের মূল্যবান গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করার আবেগেই তিনি যেন ভেসে গিয়েছেন।
এই ঘটনায় উঠে আসে এক বৃহত্তর বাস্তবতাও, দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা প্রবাসী বাঙালিদের সঙ্গে তাদের শিকড়ের সম্পর্ক। কর্মসূত্রে দূরে থাকলেও, সুযোগ পেলে অনেকেই ফিরে আসেন নিজের মাটিতে, নিজের অধিকারের প্রয়োগ করতে।
অমল গুপ্তর এই প্রত্যাবর্তন তাই শুধু ব্যক্তিগত গল্প নয়, বরং এক আবেগময় সংযোগের প্রতিচ্ছবি। চার দশক পর নিজের কেন্দ্রে ভোট দিয়ে তিনি যেন নতুন করে মনে করিয়ে দিলেন, সময় যতই পেরিয়ে যাক, মাতৃভূমির টান কখনো ফিকে হয় না।