দেবকিশোর চক্রবর্তী
একসময় বীরভূমের রাজনীতিতে যার দাপট ছিল প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী, সেই অনুব্রত মণ্ডল আজ অনেকটাই ভিন্ন প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে। জেল থেকে মুক্তির পর তিনি রাজনীতির মূল স্রোতে ফিরলেও, আগের সেই প্রভাব-প্রতিপত্তি যেন আর নেই। তবুও এক জায়গায় কোনো পরিবর্তন নেই—দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর প্রতি তাঁর অটল আস্থা।তৃণমূল কংগ্রেস-এর এই একসময়ের দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেতা দীর্ঘদিন ধরে বীরভূম এবং রাঢ় বাংলার রাজনীতিতে কার্যত একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন। তাঁর বিতর্কিত মন্তব্য, সংগঠন দক্ষতা এবং কঠোর রাজনৈতিক অবস্থান তাঁকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছিল। ২০২১ সালের রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত সক্রিয় এবং প্রভাবশালী।
কিন্তু এরপরই রাজনৈতিক জীবনে বড় ধাক্কা। গরু পাচার কাণ্ড-সহ একাধিক অভিযোগে গ্রেফতার হয়ে তাঁকে যেতে হয় দিল্লির তিহার জেল-এ। দীর্ঘ দুই বছরেরও বেশি সময় কারাবাসে কাটানোর পর জামিনে মুক্ত হয়ে তিনি ফেরেন বাংলার রাজনৈতিক অঙ্গনে।ফিরে এসে দেখা যায়, চেনা জমিটাই অনেক বদলে গেছে। একসময়ের শক্ত ঘাঁটিতে তাঁর প্রভাব অনেকটাই ক্ষীণ। দলের ভেতরে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে, এবং কাজল শেখ-এর মতো নেতাদের গুরুত্ব বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। ফলে, অনুব্রত মণ্ডল কার্যত দলে কিছুটা কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছেন—এমনটাই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
তবে এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেও তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান একেবারে নড়েনি। চলতি বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফায় বোলপুর শান্তিনিকেতনের সুরিপাড়ায় ভোট দিতে এসে তিনি স্পষ্ট বার্তা দেন। মেয়ে সুকন্যাকে সঙ্গে নিয়ে ভোট দেওয়ার পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তাঁর সংক্ষিপ্ত মন্তব্য—“দিদিই ফিরছেন, এখনও দিদি নির্বিকল্প।”
এই বক্তব্য শুধু নির্বাচনী ভবিষ্যদ্বাণী নয়, বরং দলনেত্রীর প্রতি তাঁর অটল বিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ। রাজনৈতিক প্রভাব কমে গেলেও, দল এবং নেতৃত্বের প্রতি তাঁর আনুগত্যে কোনো ভাটা পড়েনি—এটাই এই মুহূর্তে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের মূল বার্তা।
অনুব্রত মণ্ডলের এই অবস্থান একদিকে যেমন তাঁর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক দর্শনকে তুলে ধরে, তেমনই দলের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও আনুগত্যের দিকটিকেও সামনে আনে। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—এই আস্থার বার্তা কি তাঁকে আবার দলে প্রভাবশালী অবস্থানে ফিরিয়ে আনতে পারবে? নাকি তিনি থেকে যাবেন একসময়ের শক্তিশালী কিন্তু বর্তমানের প্রান্তিক এক নেতা হিসেবেই?
রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলায় দ্রুত। কিন্তু অনুব্রত মণ্ডলের ক্ষেত্রে আপাতত একটাই বিষয় স্পষ্ট—সময় তাঁর অবস্থান বদলালেও, ‘দিদি’-র প্রতি তাঁর বিশ্বাস এখনো অটুট।