ভোটার তালিকায় নাম নেই? অন্নপূর্ণার থালা থেকেও ছাঁটাই! সাড়ে পাঁচ লক্ষ মহিলার নাম বাদে তোলপাড় রাজ্য
দেবকিশোর চক্রবর্তী
রাজ্যের বহু কোটির “অন্নপূর্ণা যোজনা” ঘিরে বড়সড় প্রশাসনিক অভিযান শুরু হয়েছে। ভোটার তালিকার সঙ্গে উপভোক্তাদের তথ্য মিলিয়ে দেখা হচ্ছে, আর তাতেই সামনে আসছে বিস্ময়কর তথ্য। ইতিমধ্যেই প্রাথমিক যাচাইয়ে সাড়ে পাঁচ লক্ষেরও বেশি মহিলা উপভোক্তার নাম চিহ্নিত হয়েছে, যাঁদের নাম ভোটার তালিকায় নেই। ফলে তাঁদের নাম নতুন উপভোক্তা তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া কার্যত শুরু করে দিয়েছে প্রশাসন।
মঙ্গলবার পর্যন্ত রাজ্য সরকারের হাতে পৌঁছনো রিপোর্ট অনুযায়ী, বিভিন্ন জেলা থেকে বিপুল সংখ্যক “অযোগ্য” উপভোক্তার তথ্য উঠে এসেছে। প্রশাসনিক সূত্রের দাবি, প্রকৃত উপভোক্তাদের হাতে সরকারি সুবিধা পৌঁছে দিতেই এই পদক্ষেপ। এর আগেই নবান্ন স্পষ্ট বার্তা দিয়েছিল, ভোটার তালিকায় যাঁদের অস্তিত্ব নেই, তাঁদের নামে সরকারি খাদ্যসুরক্ষা প্রকল্প চালু রাখা হবে না।
রাজ্য সরকারের এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে জোর চর্চা শুরু হয়েছে। বিরোধীদের অভিযোগ, “ভোটার তালিকার সঙ্গে প্রকল্পের যোগসূত্র তৈরি করে সাধারণ গরিব মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।” অন্যদিকে সরকারের যুক্তি, দীর্ঘদিন ধরেই ভুয়ো নাম, মৃত ব্যক্তির পরিচয় কিংবা স্থানান্তরিত উপভোক্তাদের নামে সুবিধা তোলার অভিযোগ উঠছিল। সেই কারণেই ডিজিটাল যাচাই ও তথ্য মিলিয়ে দেখার এই উদ্যোগ।
খাদ্য দফতরের একাংশের বক্তব্য, বহু ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে উপভোক্তার নাম রেশন ব্যবস্থায় সক্রিয় থাকলেও ভোটার তালিকায় সেই নাম নেই। আবার কোথাও একই ব্যক্তি একাধিক জেলায় সুবিধা পাচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। প্রশাসনের দাবি, এই অসঙ্গতি দূর করতেই আধার, ভোটার কার্ড ও পরিবারভিত্তিক তথ্য একত্রিত করে নতুন ডেটাবেস তৈরি করা হচ্ছে।
তবে এই প্রক্রিয়াকে ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগও বাড়ছে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকার বহু মহিলার অভিযোগ, বিভিন্ন কারণে তাঁদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে বা সংশোধনের অপেক্ষায় রয়েছে। কিন্তু সেই প্রশাসনিক ত্রুটির খেসারত হিসেবে খাদ্যসুরক্ষা প্রকল্পের সুবিধা বন্ধ হয়ে গেলে পরিবার চালানো কঠিন হয়ে পড়বে।
সমাজকর্মীদের একাংশের মতে, ভোটার তালিকায় নাম না থাকা মানেই কেউ অযোগ্য, এমন সরল সমীকরণ সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। বহু পরিযায়ী শ্রমিক পরিবার, বিবাহের পর স্থান পরিবর্তন করা মহিলা কিংবা নতুন আবেদনকারীদের তথ্য আপডেট না-হওয়ার কারণেও এই সমস্যা তৈরি হতে পারে। তাই নাম বাদ দেওয়ার আগে পর্যাপ্ত যাচাই ও আপিলের সুযোগ রাখার দাবি উঠছে।
এদিকে প্রশাসন জানিয়েছে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রতিটি ক্ষেত্রে পুনরায় যাচাই করা হবে। প্রয়োজনে ব্লক স্তরে শুনানির ব্যবস্থাও করা হতে পারে। তবে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট, “প্রকৃত উপভোক্তাদের অধিকার সুরক্ষিত রাখতে হলে ভুয়ো নাম ছাঁটাই করতেই হবে।”
অন্নপূর্ণা যোজনাকে কেন্দ্র করে এই নজিরবিহীন তথ্য যাচাই অভিযান এখন রাজ্যের অন্যতম বড় প্রশাসনিক কর্মসূচিতে পরিণত হয়েছে। শেষ পর্যন্ত কতজনের নাম বাদ যায়, আর কতজন ফের তালিকায় ফিরতে পারেন, এখন সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহল থেকে সাধারণ মানুষের।