৬২টি এটিএম কার্ডের রহস্য! সিসিটিভির চোখে ধরা পড়তেই কলকাতায় দিল্লি পুলিশের ‘অপারেশন’
দেবকিশোর চক্রবর্তী
শহর তখন নিজের ছন্দে। রাস্তায় যানবাহনের ভিড়, মানুষের ব্যস্ততা—সবই ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু সেই স্বাভাবিকতার আড়ালেই চলছিল এমন কিছু গতিবিধি, যার সূত্র মিলেছিল দিল্লিতে দায়ের হওয়া একটি সাইবার প্রতারণার মামলায়। দিল্লির তদন্তকারীদের হাতে আসা কয়েকটি সূত্র ক্রমশ পথ দেখাতে শুরু করেছিল কলকাতার দিকে। আর সেই সূত্র ধরেই শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর শহরে এসে পৌঁছল দিল্লি পুলিশের একটি দল।
তারপর শুরু হল নীরব নজরদারি। এলাকার একাধিক সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখা হল। ক্যামেরায় ধরা পড়া মুখ, চলাফেরা এবং সন্দেহজনক গতিবিধি মিলিয়ে তদন্তকারীরা ধীরে ধীরে এগোতে থাকলেন। যেন একের পর এক টুকরো জোড়া লাগিয়ে তৈরি হচ্ছিল একটি অদৃশ্য ছবির খসড়া। শেষ পর্যন্ত সেই সূত্রই পৌঁছে দিল তিনজন সন্দেহভাজনের কাছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, সাইবার সাউথ ওয়েস্ট, নয়াদিল্লির ই-এফআইআর নম্বর ৪৫৯/২০২৬-এর তদন্তেই কলকাতায় আসে দিল্লি পুলিশের চার সদস্যের দল। দিল্লি সাইবার পুলিশের এসআই নীরজ কাকরালিয়ার-এর নেতৃত্বে দলটি পূর্ব যাদবপুর থানার পুলিশের সহযোগিতা নেয়। এরপর শুরু হয় অভিযান।
অভিযানে আটক করা হয় তিনজনকে—ভারত বিশাল (২৮), ইন্দ্রজিৎ কুমার (৩০), ওরফে রোশন এবং বিরাজ কুমার। পুলিশ জানিয়েছে, তিনজনেরই বাড়ি বিহারের জেহানাবাদে।কিন্তু তাঁদের কাছে যা পাওয়া গেল, তাতেই যেন তদন্তের রহস্য আরও ঘনীভূত হল।তল্লাশিতে উদ্ধার হয়েছে ৮টি সোয়াপ মেশিন, ৬২টি এটিএম কার্ড, ১৪টি মোবাইল ফোন এবং ১০টি সিম কার্ড।
একসঙ্গে এতগুলি এটিএম কার্ড কেন? এতগুলি মোবাইল ফোন এবং সিম কার্ডের প্রয়োজনই বা কী ছিল? আর সোয়াপ মেশিনগুলির ভূমিকা কী? এই প্রশ্নগুলিই এখন তদন্তকারীদের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।পুলিশের প্রাথমিক দাবি, প্রতারণার মাধ্যমে সংগ্রহ করা টাকা বিভিন্ন এটিএম থেকে তুলে নিত এই চক্রের সদস্যরা। তদন্তে এখনও পর্যন্ত কানারা ব্যাঙ্ক, বন্ধন ব্যাঙ্ক এবং অ্যাক্সিস ব্যাঙ্কের এটিএম থেকে টাকা তোলার হদিশ মিলেছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে।
অর্থাৎ সাইবার প্রতারণার মাধ্যমে টাকা সংগ্রহের পর সেই অর্থ দ্রুত নগদে পরিণত করার একটি ব্যবস্থা কি তৈরি ছিল? তদন্তকারীরা এখন সেই পথটাই অনুসরণ করছেন। টাকা কোথা থেকে এল, কোন অ্যাকাউন্টে গেল, কে তা তুলল এবং শেষ পর্যন্ত সেই অর্থ কোথায় পৌঁছল—প্রতিটি ধাপই খতিয়ে দেখা হচ্ছে।আর এখানেই ৬২টি এটিএম কার্ড হয়ে উঠেছে তদন্তের অন্যতম বড় সূত্র।
কার্ডগুলি কি বিভিন্ন মানুষের নামে? নাকি অন্য কোনও উপায়ে এগুলি সংগ্রহ করা হয়েছিল? প্রতিটি কার্ড কি আলাদা আলাদা লেনদেনে ব্যবহার করা হত? নাকি একাধিক অ্যাকাউন্টকে কাজে লাগিয়ে প্রতারণার টাকা ছড়িয়ে দেওয়া হত? আপাতত এই প্রশ্নগুলির উত্তর পুলিশের তদন্তেই খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে।
একই সঙ্গে ১৪টি মোবাইল ফোন এবং ১০টি সিম কার্ডও তদন্তকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। সাইবার অপরাধের ক্ষেত্রে যোগাযোগের সূত্র অনেক সময় লুকিয়ে থাকে ফোনের কল, মেসেজ কিংবা অন্যান্য ডিজিটাল তথ্যের মধ্যে। তাই ধৃতদের মোবাইল ও সিম ঘেঁটে আরও কার কার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল, সেই তথ্য সামনে আসতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
সোয়াপ মেশিনগুলিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কেন এতগুলি মেশিন রাখা হয়েছিল, কোথায় ব্যবহার করা হত, কার কাছ থেকে সেগুলি এসেছিল এবং প্রতারণার টাকার সঙ্গে সেগুলির কী সম্পর্ক—সবই এখন তদন্তের আওতায়।তদন্তকারীরা মনে করছেন, ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদেই হয়তো মিলতে পারে আরও বড় কোনও সূত্র। এই তিনজন কি শুধুই টাকা তোলার কাজ করতেন? নাকি তাঁদের পিছনে ছিল আরও একটি বড় নেটওয়ার্ক? প্রতারণার মূল পরিকল্পনাকারীরা কোথায়? টাকা সংগ্রহের পর তা কার কাছে পৌঁছত? সেই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতেই এখন জেরা চলছে।
একটি দিল্লির সাইবার প্রতারণার মামলা। তার সূত্রে কলকাতায় পুলিশের আগমন। তারপর সিসিটিভির ফুটেজে সন্দেহজনক গতিবিধি শনাক্ত করা। আর শেষ পর্যন্ত তিনজনকে আটক এবং তাঁদের কাছ থেকে একসঙ্গে ৬২টি এটিএম কার্ড, ৮টি সোয়াপ মেশিন, ১৪টি মোবাইল ফোন ও ১০টি সিম কার্ড উদ্ধার।
ঘটনার প্রতিটি পর্ব যেন একটি করে তালা খুলছে। কিন্তু পুরো দরজাটি এখনও খোলেনি।ধৃত তিনজনকে ট্রানজিট রিমান্ডের জন্য আলিপুর আদালতে পেশ করা হবে। এরপর তাঁদের দিল্লিতে নিয়ে গিয়ে পরবর্তী তদন্ত চালানো হবে বলে লালবাজার পুলিশ সূত্রে খবর।এখন তদন্তকারীদের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই ৬২টি এটিএম কার্ডের পিছনে আসলে কতগুলি অ্যাকাউন্ট, কতগুলি লেনদেন এবং কতজন মানুষের যোগসূত্র লুকিয়ে রয়েছে?
উত্তর মিললেই হয়তো পরিষ্কার হবে, কলকাতার এই অভিযানের আড়ালে ধরা পড়েছে শুধু একটি ছোট চক্র, নাকি সাইবার প্রতারণার আরও বড় কোনও জাল। আপাতত সেই উত্তরই খুঁজছে পুলিশ। আর ৬২টি এটিএম কার্ড যেন নীরবে অপেক্ষা করছে সেই রহস্যের পর্দা ওঠার।