‘ভবানীপুরে নক্ষত্রপতন: শুভেন্দুর কাছে হার, রাজনীতিতে বড় ধাক্কা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-র’
দেবকিশোর চক্রবর্তী
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক নাটকীয় ও ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী রইল রাজ্যবাসী। একদা নিজেরই ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ভবানীপুরে অপ্রত্যাশিতভাবে পরাজিত হলেন তৃণমূল কংগ্রেসের সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁকে ১৫,১০৫ ভোটে হারিয়ে দিয়েছেন তাঁরই একসময়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং বর্তমানে বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী। এই ফলাফল শুধু একটি কেন্দ্রের নয়, বরং গোটা রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণকেই নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
রাজ্যের ২৯৪টি আসনের মধ্যে ২৯৩টির ফলাফল ঘোষণার পর দেখা যাচ্ছে, ভারতীয় জনতা পার্টি ইতিমধ্যেই ২০৭টি আসনে জয়লাভ করেছে। অন্যদিকে, তৃণমূল কংগ্রেস-এর জন্য এটি এক বড় ধাক্কা, যা তাদের দীর্ঘদিনের শক্ত ঘাঁটিকেও নড়বড়ে করে দিয়েছে।
সকালে ভোট গণনা শুরু হওয়ার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টা জুড়ে টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছিল। কখনো তৃণমূল এগিয়ে যাচ্ছিল, আবার কখনো বিজেপি। কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ব্যবধান ক্রমশ স্পষ্ট হতে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত শুভেন্দু অধিকারীর জয় নিশ্চিত হয়। রাজনৈতিক মহলের মতে, এই ফলাফল ছিল অনেকাংশেই অপ্রত্যাশিত, বিশেষত ভবানীপুরের মতো কেন্দ্রে যেখানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রভাব দীর্ঘদিনের।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ এই বিপর্যয়ের পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ চিহ্নিত করেছেন। প্রথমত, রাজ্যজুড়ে তীব্র সরকারবিরোধী হাওয়া। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার ফলে প্রশাসনিক ক্লান্তি এবং জনঅসন্তোষ জমা হচ্ছিল বলে মত তাঁদের। দ্বিতীয়ত, দলীয় স্তরে দুর্নীতির অভিযোগ এবং নেতামন্ত্রীদের বিরুদ্ধে একাধিক বিতর্ক তৃণমূলের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
এর পাশাপাশি, দলীয় অন্তর্দ্বন্দ্বও বড় কারণ হিসেবে উঠে আসছে। তৃণমূলের ভেতরে অসন্তোষ এবং গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব যে বাড়ছিল, তা ভোটের ফলাফলে প্রতিফলিত হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। অন্যদিকে, বিজেপির সংগঠিত প্রচার, শক্তিশালী ক্যাডার এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সক্রিয় ভূমিকা তাদের পক্ষে বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়ায়।
বিশেষ করে শুভেন্দু অধিকারীর ভূমিকা এখানে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। একসময় তৃণমূলের গুরুত্বপূর্ণ মুখ হওয়ার পর বিজেপিতে যোগ দিয়ে তিনি যে রাজনৈতিক লড়াই গড়ে তুলেছিলেন, তার চূড়ান্ত পরিণতি দেখা গেল এই নির্বাচনে। তাঁর এই জয় ব্যক্তিগত রাজনৈতিক উত্থানের পাশাপাশি বিজেপির রাজ্যে শক্তিশালী অবস্থানকেও আরও মজবুত করল।
এই ফলাফল জাতীয় রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে এতদিন বিজেপির অন্যতম প্রধান বিরোধী মুখ হিসেবে দেখা হত। তাঁর এই পরাজয় বিরোধী রাজনীতির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু করবে বলেই ধারণা।
সব মিলিয়ে, ভবানীপুরের এই ফলাফল শুধু একটি নির্বাচনী হার নয়, এটি এক যুগের পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করছে। তৃণমূল কংগ্রেসের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নিজেদের পুনর্গঠন এবং জনআস্থা পুনরুদ্ধার করা। অন্যদিকে, বিজেপির জন্য এটি এক সুবর্ণ সুযোগ রাজ্যে তাদের আধিপত্য আরও বিস্তৃত করার।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তাই নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়ে গেল, যেখানে পুরনো সমীকরণ ভেঙে তৈরি হচ্ছে এক নতুন বাস্তবতা।