বিমানবন্দরের নিরাপত্তা বনাম ধর্মীয় অধিকার, বাঁকড়া মসজিদ মামলায় হাইকোর্টে জোর সওয়াল-জবাব
কলকাতা:
দমদম বিমানবন্দরের রানওয়ে সম্প্রসারণ ও নিরাপত্তার প্রশ্নে বিমানবন্দর চত্বরে অবস্থিত বাঁকড়া মসজিদ নিয়ে মামলায় বুধবার কলকাতা হাইকোর্টে জোরালো সওয়াল-জবাব হল। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি, নামাজ আদায়ের জন্য নির্দিষ্ট কোনও মসজিদেই যেতে হবে—ইসলামে এমন কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। জাতীয় নিরাপত্তা ও বৃহত্তর জনস্বার্থের প্রশ্নে কোনও ধর্মস্থানই সরকারি জমি অধিগ্রহণ বা উন্নয়ন প্রকল্পের পথে বাধা হতে পারে না বলে আদালতে জানানো হয়।
বিচারপতি কৃষ্ণ রাওয়ের বেঞ্চে শুনানিতে এয়ারপোর্ট অথরিটি অব ইন্ডিয়ার (AAI) আইনজীবী সৌমেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় জানান, মসজিদটি যে জমিতে রয়েছে, সেটি সরকারি জমি। তাঁর দাবি, ১৯৬১ সালের ৭ ফেব্রুয়ারির বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী রানওয়ে সম্প্রসারণের জন্য কেন্দ্রীয় সরকার বহু আগেই জনস্বার্থে ওই জমি অধিগ্রহণ করেছিল। স্থানীয় বাসিন্দাদের পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থাও করা হয়েছে বলে আদালতে জানানো হয়।
AAI-এর তরফে আরও যুক্তি দেওয়া হয়, প্রত্যেকের ধর্মীয় আচার পালনের অধিকার রয়েছে। কিন্তু সেই অধিকার প্রয়োগের জন্য নির্দিষ্ট একটি স্থানেই যেতে হবে—এমন দাবি করা যায় না। জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে মৌলিক অধিকারের দোহাই দিয়ে নিরাপত্তাজনিত ব্যবস্থা আটকে রাখা উচিত নয় বলেও আদালতে সওয়াল করা হয়। উন্নয়ন ও পরিকাঠামো প্রকল্পের প্রয়োজনে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মন্দির, গির্জা-সহ ধর্মীয় স্থাপনা সরানো বা অধিগ্রহণের নজির রয়েছে বলেও দাবি করা হয়।
শুনানিতে কেন্দ্রের অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেলও বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর দাবি, নিরাপত্তার এই ঘাটতি দূর করা না হলে ভারতে ‘৯/১১’-এর মতো বড় বিমান বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। সাম্প্রতিক একটি ঘটনা এক ভারতীয় পাইলটের তৎপরতায় এড়ানো সম্ভব হয়েছে বলেও আদালতে উল্লেখ করা হয়।
তবে মামলাকারীদের বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাঁদের আইনজীবী কিশোর দত্ত আদালতে জানান, প্রায় ১৩৬ বছর ধরে ওই মসজিদে নামাজ ও ধর্মীয় কার্যক্রম চলে আসছে। এতদিন বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষই নিরাপত্তা পরীক্ষা করে প্রায় ৫০-৬০ জন পুণ্যার্থীকে বাসে করে মসজিদে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করত বলেও দাবি করেন তিনি।
মামলাকারীদের আরও বক্তব্য, হঠাৎ করে মসজিদে প্রবেশের অধিকার বন্ধ করে দেওয়া বেআইনি। তাঁদের দাবি, জমিটি এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে অধিগ্রহণ করা হয়নি। ফলে মসজিদে যাতায়াতের অধিকার কেড়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তাঁরা।
দুই পক্ষের বক্তব্য শোনার পর মামলার পরবর্তী শুনানি আগামী ৯ অক্টোবর ধার্য করেছে কলকাতা হাইকোর্ট। ফলে বাঁকড়া মসজিদকে ঘিরে ধর্মীয় অধিকার, জমির অধিগ্রহণ এবং বিমানবন্দরের নিরাপত্তা—এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নেই আদালতের পরবর্তী শুনানি তাৎপর্যপূর্ণ হতে চলেছে।