কলকাতার মাল্টিপ্লেক্সে জুবিন গার্গকে শ্রদ্ধা জানাতে তার কাট আউট বসানো হল দর্শক আসনের সামনে
শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ
কলকাতার সিনেমা হলে এমন দৃশ্য অনেক দিন দেখা যায়নি। অ্যাপে টিকিট বুক করতে গিয়ে প্রথমে মনে হয়েছিল, ‘রৈ রৈ বিনালে’ হয়তো খুব একটা দর্শক টানবে না। অসমীয়া ছবি, তা-ও কলকাতায়— ভাবাই যায় না! কিন্তু নিউমার্কেটের পুরনো সিঙ্গল স্ক্রিন থেকে শুরু করে আইনক্স, পিভিআর সিনেমা সর্বত্র শো টাইমে থিক থিক দর্শক সমাগমের দৃশ্য দেখে ভ্রান্তি ভাঙল। হল হাউসফুল, দর্শক আসনে একটিও ফাঁকা জায়গা নেই।
অসমের কিংবদন্তি শিল্পী জুবিন গর্গের শেষ ছবি ‘রৈ রৈ বিনালে’ দেখতে ভিড় জমিয়েছে কলকাতার নানা প্রান্তের মানুষ। কারও দেশের বাড়ি গুয়াহাটি, কারও শিলচর; কেউ পড়ছেন শহরের বিশ্ববিদ্যালয়ে, কেউ আবার কর্মসূত্রে এখানে থাকেন। প্রায় সবাই এসেছেন নিজের প্রিয় শিল্পীর শেষ কাজটি দেখার জন্য। অসমীয়া ভাষার ছবি হলেও, দর্শকদের আবেগে কোনো ভেদ নেই— চারদিকজুড়ে শুধু জুবিনময় পরিবেশ।
ছবিতে জুবিনের চরিত্রের নাম রাহুল। ছোট্ট রাহুলকে তার মা ভর্তি করান গানের স্কুলে, যেখানে শিক্ষক ভিক্টর বন্দ্যোপাধ্যায়। জুবিনের গানে মুগ্ধ ভিক্টর বলেন, “এই ছেলেটা প্রতিদিন স্কুলে আসবে।” কিন্তু সুখ বেশিদিন টেঁকে না— স্কুলে বিস্ফোরণ, চোখের দৃষ্টি হারায় ছোট্ট রাহুল। এরপর গল্প এগোয় এক দৃষ্টিহীন যুবক সঙ্গীতশিল্পীর জীবনকে ঘিরে।বড় হয়ে রাহুলের পাশে আসে মউ (অভিনয়ে মৌসুমি আলিফা), এক ট্যালেন্ট হান্ট সংস্থার কর্ণধার। কিন্তু মউ আবার জনপ্রিয় গায়ক জয় কাশ্যপের বাগদত্তা। এই ত্রিভুজে বাঁধা গল্পে উঠে আসে ভালোবাসা, ঈর্ষা, প্রতিযোগিতা ও সাফল্যের লড়াই। তবু ছবিটি শেষ পর্যন্ত বিয়োগান্তক নয়, মিলনান্তক।দৃষ্টিহীন সঙ্গীতশিল্পীর চরিত্রে জুবিনের অভিনয় প্রশংসাযোগ্য। সাদা লেন্স পরে মাত্র ৫ শতাংশ দৃষ্টি নিয়ে তিনি পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছেন এক নিঃস্ব, অথচ প্রাণবন্ত শিল্পীর যন্ত্রণা। মৌসুমি আলিফা নিজের চরিত্রে অসাধারণ। ভিক্টর বন্দ্যোপাধ্যায়ও সংযত অভিনয়ে চরিত্রকে বাস্তব করে তুলেছেন।
পুরো সিনেমাটাই মিউজিক্যাল। প্রতিটি গানের সুর ও কথায় ঝরে পড়েছে জুবিন গর্গের পরিচিত আবেগ। দর্শকদের মতে, ছবির সেরা গান ‘মোর মন’, যা ইতিমধ্যেই সমাজমাধ্যমে জনপ্রিয় হয়েছে। ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকও দুর্দান্ত, যা সিনেমাকে এগিয়ে নিয়ে যায় এক অনন্য আবহে।
ছবি শেষে পর্দায় ভেসে ওঠে একটি বাক্য— ‘শেষ বলে কিছু নেই’। তারপরই বাজে টাইটেল সং ‘রৈ রৈ বিনালে’র অন্য ভার্সন, সঙ্গে শুটিংয়ের বিভিন্ন দৃশ্য। তখনই দেখা যায়, বহু দর্শক চোখ মুছছেন। কেউ কেউ কাঁপা গলায় বলছেন, “দাদা, তোমাক খুব ভাল পাউ... জয় জুবিনদা।”
মানুষ কাঁদছে। অঝোরে কাঁদছে, ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে, হাউ হাউ করে কাঁদছে। সমস্ত হলঘর জুড়ে শুধু কান্নার শব্দ। মানুষ কাঁদছে কারণ তারা জানে জুবিনদা আর নতুন গান গাইবেন না। এটাই তাঁর শেষ কাজ।
সিনেমা হলের কর্মী রাজু জানান, “কলকাতায় শেষ কবে অসমীয়া সিনেমা লেগেছিল মনে নেই। কিন্তু এই ছবির প্রতিদিনই হাউসফুল। জুবিনের ফ্যানরা আসছেন ভিড় করে।”
সত্যিই, জুবিন গর্গের শেষ সিনেমা যেন কলকাতার পর্দাতেও অসমের আবেগ ছড়িয়ে দিয়েছে। পর্দায় তাঁর গান, অভিনয় ও উপস্থিতি যেন শেষবারের মতো মনে করিয়ে দিল— শিল্পীর মৃত্যু হয় না, তিনি থেকে যান তাঁর সুরে, তাঁর সিনেমায়, তাঁর ভক্তদের চোখের জলে।