২০২৫: এক কণ্ঠের নীরবতা, অসমের গভীরতম শোক

Story by  Daulat Rahman | Posted by  Aparna Das • 1 Months ago
জুবিন গাৰ্গ
জুবিন গাৰ্গ
 
দৌলত রহমান / গুয়াহাটি

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫, অসমের ইতিহাসে এক গভীর অন্ধকার ও বেদনার দিন। হঠাৎ ও রহস্যজনক পরিস্থিতিতে সিঙ্গাপুরে মাত্র ৫২ বছর বয়সে প্রয়াত হলেন জুবিন গাৰ্গ, এক প্রজন্মের কণ্ঠস্বর, যার গান হয়ে উঠেছিল মানুষের জীবনের সুর।
 
এই মৃত্যু শুধু অসম নয়, গোটা ভারতীয় সংগীত জগতকে কাঁপিয়ে দেয়। জুবিন কেবল একজন গায়ক ছিলেন না; তিনি ছিলেন এক সাংস্কৃতিক শক্তি, এক কথক, এমন মানুষের পরিচয় যাদের কণ্ঠস্বর মূলধারার বয়ানে বহুদিন অবহেলিত ছিল।
 
শিল্পী জুবিন গার্গ
 
তিন দশকের দীর্ঘ সংগীতজীবনে জুবিন ভাষা, অঞ্চল ও সংস্কৃতির সীমা ছাড়িয়ে গান গেয়েছেন, অসমিয়া, হিন্দি, বাংলা থেকে শুরু করে অসংখ্য ভাষায়। তাঁর সৃষ্ট গান অসংখ্য জীবনের হৃদস্পন্দন হয়ে উঠেছিল। বলিউডে Gangster ছবির “ইয়া আলি”-র মতো সুপারহিট তাঁকে সর্বভারতীয় পরিচিতি দিলেও, তাঁর শিকড় সবসময় গভীরভাবে প্রোথিত ছিল অসমের মাটিতে।
 
জুবিনের মৃত্যু মানে শুধু একটি কণ্ঠস্বরের হারিয়ে যাওয়া নয়; এটি ছিল ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মাঝে এক সেতুর ভেঙে পড়া। লোকসুরের আত্মা ও সমকালীন জীবনের স্পন্দন, দু’টোকেই বহন করত তাঁর কণ্ঠ। সামাজিক মাধ্যম ও মানুষের স্মৃতিচারণে বারবার উঠে এসেছে এই অনুভূতি, অনেকের কাছে তাঁর চলে যাওয়া মানে একটি যুগের সমাপ্তি, এমন এক শিল্পীর বিদায় যার গান ছিল প্রতিটি উৎসব, প্রতিটি দুঃখ, প্রতিটি স্মৃতির অংশ।
 
১৯ সেপ্টেম্বর দুপুরে সিঙ্গাপুরে তাঁর মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই অসমে মানুষের ঢল নামে। তীব্র রোদ, বৃষ্টি ও বজ্রঝড় উপেক্ষা করে দিন-রাত অপেক্ষা করেছিলেন মানুষ, প্রথমে তাঁর নিথর দেহ ফেরার জন্য, পরে ২৩ সেপ্টেম্বর শেষকৃত্যের জন্য। সেই শেষযাত্রা ইতিহাস গড়ে, লিমকা বুক অব রেকর্ডস অনুযায়ী এটি বিশ্বে চতুর্থ বৃহত্তম জনসমাগমে পরিণত হয়। এতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাঁর গভীর ও অটুট বন্ধন। ধর্ম, ভাষা, জাতি ও জাতিগত পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সবাই একসঙ্গে শোকস্তব্ধ হয়েছিল।
 
জুবিন গার্গের অন্তিম যাত্রায় লক্ষ্যাধিক অনুরাগীর ভিড়ের এক দৃশ্য
 
সাম্প্রতিক কালে এমন সম্মিলিত শোক অসম আর দেখেনি। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বলেছিলেন, “আগামী পঞ্চাশ বছরেও আরেকজন জুবিন জন্মাবে না।” তাঁর প্রয়াণকে ঘিরে যে বেদনার ঢেউ উঠেছিল, তার পুনরাবৃত্তি হওয়া প্রায় অসম্ভব।
 
জুবিনের জনপ্রিয়তার উৎস ছিল শুধু তাঁর অসাধারণ প্রতিভা নয়, তাঁর মানবিকতা। তিনি সহজেই সব বয়স ও সব শ্রেণির মানুষের সঙ্গে মিশে যেতেন, ধনী-গরিব, তরুণ-বৃদ্ধ নির্বিশেষে। তারকাসুলভ অহংকার তাঁর মধ্যে ছিল না। রিকশায় চড়া, সরু গলিতে সাইকেল চালানো, রাস্তার ধারের চায়ের দোকানে চা খাওয়া, এসব ছিল তাঁর দৈনন্দিন জীবনের অংশ। সুযোগ পেলেই ক্রিকেট ও ফুটবল খেলতেন। বিদ্রোহ, জাতিগত সংঘাত ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনে জর্জরিত এক রাজ্যে তাঁর গান হয়ে উঠেছিল সান্ত্বনার ভাষা, ভালোবাসা, মানবতা ও দয়ার বার্তা।
 
অগণিত মানুষকে তিনি সাহায্য করেছেন, অনেককে হয়তো কখনও চিনতেনও না। বিপন্ন মানুষের প্রতি ছিল তাঁর গভীর সহমর্মিতা। প্রাণীদের প্রতি ভালোবাসা ও বন উজাড়ের বিরুদ্ধে তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল তাঁর পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।
 
বন্যার্তদের জন্য পুঁজি সংগ্রহের সময় শিল্পী জুবিন গার্গের একটি দৃশ্য
 
জুবিন ছিলেন নির্ভীক। তাঁর স্পষ্টভাষিতা অনেক সময় বিতর্কের জন্ম দিলেও তিনি কখনও নিজের নীতিতে আপস করেননি। বিহুর মতো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে হিন্দি গান নিষিদ্ধ করার উলফার ফতোয়া তিনি অগ্রাহ্য করেছিলেন। পরবর্তীতে উলফাও তাঁর সাংস্কৃতিক অবদানের স্বীকৃতি দিয়ে জানায়, অসমের কণ্ঠস্বর রাজ্যের সীমানা ছাড়িয়ে নিয়ে যেতে জুবিনের ভূমিকা অনস্বীকার্য। উলফার সশস্ত্র আন্দোলনের সময় নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গেও তাঁর তিক্ত অভিজ্ঞতা ছিল। একবার তিনি বলেছিলেন, “আমাকে সেনা ও পুলিশ চড় মেরেছিল, ওরা ভেবেছিল আমি উলফার সমর্থক।”
 
গায়ক-সুরকার হওয়ার বাইরেও, অসমে যে কোনও সংকটকালে তিনি হয়ে উঠতেন এক নেতা। ২০১৯ সালে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (CAA)-এর বিরুদ্ধে আন্দোলনেও তিনি ছিলেন সামনের সারিতে। ১৯৯২ সালে মাত্র উনিশ বছর বয়সে অনামিকা ক্যাসেট দিয়ে শুরু হয় তাঁর সংগীতযাত্রা, যা মুহূর্তেই আলোড়ন তোলে। তিন দশকে তিনি ৩৮টিরও বেশি ভাষা ও উপভাষায় প্রায় ৩৮ হাজারের বেশি গান রেকর্ড করেন। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এই শিল্পী ঢোল, গিটার, কিবোর্ডসহ প্রায় বারোটি বাদ্যযন্ত্র অনায়াসে বাজাতে পারতেন।
 
অসমিয়া চলচ্চিত্র শিল্পকেও তিনি নতুন দিশা দেন, Mission China, Kanchenjunga-র মতো বড় বাজেটের ছবি প্রযোজনা করে। তাঁর শেষ ছবি Roi Roi Binale (মৃত্যুর পর মুক্তি পায়) ইতিহাস গড়ে, প্রথম মাসেই আয় করে ৩৩.৩০ কোটি টাকা, হয়ে ওঠে সর্বকালের সর্বোচ্চ আয়কারী অসমিয়া ছবি। ভক্তদের কাছে এটি ছিল প্রিয় শিল্পীর প্রতি এক আবেগঘন শ্রদ্ধার্ঘ্য।
 
জুবিনের সমাধি ক্ষেত্রের একটি দৃশ্য
 
বাংলা সংগীতেও তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। শুধু তুমি (২০০৪) ছবিতে সঙ্গীত পরিচালনা ও কণ্ঠদান করে তিনি শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত পরিচালকের পুরস্কার পান। “মন মানে না”, “পিয়া রে পিয়া রে”-র মতো গান তাঁকে বাংলা ছবির দর্শকের কাছেও জনপ্রিয় করে তোলে।
 
২০০০-এর দশকের শুরুতে তিনি মুম্বইয়ে পাড়ি দিয়ে বলিউডে “ইয়া আলি”, “দিলরুবা”-র মতো হিট উপহার দেন। কিন্তু খ্যাতির মাঝেও ইন্ডাস্ট্রির বিশৃঙ্খলায় তিনি বিরক্ত হয়ে পড়েন। একবার বলেছিলেন, “আমি বিশৃঙ্খলা পছন্দ করি না। অসমেই আমি রাজাসম্মান নিয়ে মরতে চাই।”
 
তাঁর কথাই সত্যি হল। শেষযাত্রায় যে লক্ষ লক্ষ মানুষ রাস্তার দু’ধারে দাঁড়িয়েছিল, তা তাঁর মহিমারই প্রমাণ। তিনি একবার স্ত্রীকে বলেছিলেন, তাঁর মৃত্যুতে বহুদিন শোক পালন করা হবে। বাস্তবে যা ঘটল, তা অসমের ইতিহাসে নজিরবিহীন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, “সংগীতে তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য তিনি স্মরণীয় থাকবেন। সব স্তরের মানুষের কাছে তাঁর গান ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়।”
 
তবুও, তাঁর চলে যাওয়া এমন এক শূন্যতা সৃষ্টি করেছে, যা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। যুগের অবসান কেবল অনুপস্থিতি দিয়ে চিহ্নিত হয় না; হয় প্রভাবের স্থায়িত্ব দিয়ে, এক শিল্পী কতটা গভীরভাবে সংস্কৃতিকে রূপ দিয়েছেন, তার মাধ্যমে। সেই অর্থে, জুবিন গাৰ্গের কণ্ঠ আজ নীরব হলেও, যে যুগ তিনি নির্মাণ করেছিলেন, তার প্রতিধ্বনি চিরকাল বেঁচে থাকবে।