কুমিল্লার মাটি থেকে কলকাতা-মুম্বই—সুরের জাদুতে আজও অমর শচীন দেববর্মন

Story by  Debkishor Chakraborty | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 15 h ago
কুমিল্লার মাটি থেকে কলকাতা-মুম্বই—সুরের জাদুতে আজও অমর শচীন দেববর্মন
কুমিল্লার মাটি থেকে কলকাতা-মুম্বই—সুরের জাদুতে আজও অমর শচীন দেববর্মন
 

দেবকিশোর চক্রবর্তী
 
কখনও নদীর ঢেউ, কখনও বাংলার মাটির গন্ধ, কখনও বাউলের একতারা—আবার কখনও রাগ-রাগিণীর গভীর আবেশ। এই সবকিছুকে এক সুতোয় গেঁথে ভারতীয় চলচ্চিত্রের সঙ্গীতকে যে মানুষ অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিলেন, তিনি শচীন দেববর্মন। শ্রোতাদের কাছে ‘শচীনকর্তা’, আর মুম্বইয়ের সঙ্গীতজগতে সস্নেহে ‘বর্মনদাদা’—তাঁর সুরের মায়া আজও প্রজন্মের পর প্রজন্মকে আবিষ্ট করে।
 
১ অক্টোবর ১৯০৬ সালে কুমিল্লায় জন্মেছিলেন শচীন দেববর্মন। তৎকালীন পূর্ববঙ্গের এই শহর আজ বাংলাদেশের অন্তর্গত। তিনি ছিলেন ত্রিপুরার রাজপরিবারের সন্তান। রাজকীয় পরিবেশে জন্ম হলেও তাঁর হৃদয় আটকে ছিল সাধারণ মানুষের গান, বাংলার লোকসুর এবং ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে।
 
ছোটবেলা থেকেই সঙ্গীতের প্রতি তাঁর গভীর আকর্ষণ ছিল। প্রথাগত শিক্ষার পাশাপাশি তিনি কে সি দে, ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়, বাদল খাঁ এবং উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ-সহ একাধিক বিশিষ্ট গুরুর কাছে সঙ্গীতশিক্ষা নেন। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সাধনার সঙ্গে তিনি আত্মস্থ করেছিলেন পূর্ববঙ্গের লোকগান ও বাংলার মাটির সুর। এই দুই ধারার মেলবন্ধনই পরবর্তীকালে হয়ে ওঠে তাঁর সঙ্গীতের নিজস্ব পরিচয়।
 
কলকাতায় এসে শুরু হয় তাঁর শিল্পীজীবনের নতুন অধ্যায়। কলকাতা বেতারে গায়ক হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার পাশাপাশি তিনি বাংলা গান রেকর্ড করতে শুরু করেন। তাঁর কণ্ঠ ছিল প্রচলিত অর্থে মসৃণ নয়; বরং ছিল এক ধরনের মাটির টান, গভীরতা এবং অদ্ভুত আবেগ। সেই কণ্ঠেই তিনি নিজে গান গেয়েছেন, আবার অসংখ্য শিল্পীর কণ্ঠে সৃষ্টি করেছেন কালজয়ী সব গান।
 
১৯৩০-এর দশকে চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালনার জগতে প্রবেশ করেন শচীন দেববর্মন। ১৯৪৪ সালে বোম্বাইয়ে স্থায়ী হওয়ার পর তাঁর সামনে খুলে যায় হিন্দি চলচ্চিত্রের বিশাল জগৎ। ‘বাজি’, ‘ট্যাক্সি ড্রাইভার’, ‘কালাপানি’, ‘গাইড’, ‘জুয়েল থিফ’, ‘আরাধনা’, ‘অভিমান’ ও ‘মিলি’-সহ একের পর এক ছবিতে তাঁর সুর ভারতীয় চলচ্চিত্রসঙ্গীতকে নতুন মাত্রা দেয়।
 
দেব আনন্দের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সৃজনশীল সম্পর্ক বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ‘গাইড’-এর মতো ছবিতে তাঁর সুর চলচ্চিত্রের আবেগ, চরিত্র এবং গল্পের সঙ্গে এমনভাবে মিশে গিয়েছিল যে গান আর ছবির আলাদা অস্তিত্ব যেন থাকেনি। লতা মঙ্গেশকর, কিশোর কুমার, মহম্মদ রফি, আশা ভোঁসলে, গীতা দত্ত ও মান্না দে-সহ বহু কিংবদন্তি শিল্পীর কণ্ঠে তাঁর সুর পেয়েছে অমরত্ব।
 
শচীন দেববর্মনের সঙ্গীতের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর শিকড়ের সঙ্গে সম্পর্ক। বাংলার লোকসুর, ভাটিয়ালি, বাউল, নদী-নৌকার গান এবং ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত—সবকিছুকেই তিনি নিজের সৃষ্টির উপাদান করেছেন। লোকসঙ্গীতের প্রতি গভীর অনুরাগ এবং শাস্ত্রীয় শিক্ষার দৃঢ় ভিত্তি তাঁর সুরকে দিয়েছিল স্বাতন্ত্র্য, সরলতা ও গভীরতা।১৯৬৯ সালে ‘আরাধনা’ ছবির সঙ্গীতের জন্য তিনি জাতীয় পুরস্কার লাভ করেন। একই সময়ে পদ্মশ্রীসহ একাধিক সম্মানে ভূষিত হন। সঙ্গীত নাটক আকাদেমির পুরস্কারও পান তিনি।
 
৩১ অক্টোবর ১৯৭৫ সালে বোম্বাইয়ে তাঁর জীবনাবসান হয়। কিন্তু একজন শিল্পীর মৃত্যু যে তাঁর সৃষ্টির মৃত্যু নয়, শচীন দেববর্মন তার অন্যতম উজ্জ্বল প্রমাণ।ত্রিপুরার রাজপরিবারের উত্তরাধিকার, কুমিল্লার মাটির গন্ধ, কলকাতার সাংস্কৃতিক আবহ আর বোম্বাইয়ের চলচ্চিত্রজগত—সব মিলিয়ে শচীন দেববর্মনের জীবন যেন ভারতীয় সঙ্গীতের এক দীর্ঘ যাত্রাপথ। সময় বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, গান শোনার মাধ্যম বদলেছে; কিন্তু তাঁর সুরের সেই মায়া আজও অমলিন।
 
কিছু শিল্পী শুধু গান তৈরি করেন না—তাঁরা একটি যুগের অনুভূতিকে সুর দিয়ে রেখে যান। শচীন দেববর্মন তেমনই এক সুরের জাদুকর, যাঁর সৃষ্টি আজও বাংলার মাটি থেকে ভারতের সাংস্কৃতিক আকাশ পর্যন্ত অনুরণিত হয়।