ক্যামেরার আড়ালে শাহরুখ খানের নিরাপত্তার স্তম্ভ: ইয়াসিন খান
মালিক আসগর হাশমি / নয়াদিল্লি
“আমি আমার বডিগার্ডকে স্পষ্ট করে বলে রেখেছি, ধাক্কাধাক্কি করবে না, দুর্ব্যবহার করবে না, আর কখনোই রূঢ় ভাষায় কথা বলবে না।” দেশ নয়, গোটা বিশ্বজুড়ে পরিচিত সুপারস্টার শাহরুখ খান যখন এক সাক্ষাৎকারে এই কথা বলেছিলেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই কৌতূহল তৈরি হয়েছিল, কে সেই ব্যক্তি, যাঁর ওপর কিং খানের বিশ্বাস এতটাই অটল? সালমান খানের বডিগার্ড শেরাকে সবাই চেনে, কিন্তু শাহরুখ খানের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা মানুষটি সাধারণত ক্যামেরার আড়ালেই থাকেন। সেই কারণেই বহুদিন ধরে সাধারণ মানুষের কাছে তিনি এক রহস্যের নাম, ইয়াসিন খান।
শাহরুখ খানের জনপ্রিয়তা কোনো দেশ, ভাষা বা সীমানায় আটকে নেই। ভারত হোক বা বিদেশ, বিমানবন্দর হোক কিংবা হোটেলের লবি, এক ঝলক দেখার জন্য তাঁর ভক্তরা প্রায়ই আবেগে ভেসে যান। অনেক সময় কড়া নিরাপত্তার মধ্যেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, আর ভিড় যেন তারকার দিকে ধেয়ে আসে। এমন অবস্থায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়, সুপারস্টার যেন নিরাপদ থাকেন, আবার তাঁর ভক্তদের অনুভূতিতেও যেন আঘাত না লাগে। এই সূক্ষ্ম ভারসাম্যই এক দশকেরও বেশি সময় ধরে দক্ষতার সঙ্গে রক্ষা করে চলেছেন ইয়াসিন খান।
একজন খ্যাতনামা চলচ্চিত্র পরিচালক একবার বিদেশে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছিলেন। সেখানে হলিউডের এক বড় তারকা উপস্থিত থাকলেও সবার নজর ছিল অন্যদিকে। সারাদিন ধরে মানুষ শাহরুখ খানের চারপাশে ভিড় করে ছিল, আর অন্য তারকারা তুলনামূলকভাবে একা পড়ে ছিলেন। এই দৃশ্যই বুঝিয়ে দেয়, নিরাপত্তার দিক থেকে শাহরুখ খানের উপস্থিতি কতটা বড় চ্যালেঞ্জ। আর সেই চ্যালেঞ্জের মাঝেই প্রতিটি মুহূর্তে সতর্ক থাকেন ইয়াসিন খান।
ইয়াসিন খান বলেন, “সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো শাহরুখ স্যারের ভক্তদের কোনো ক্ষতি না করে নিরাপদ দূরত্বে রাখা। তাঁর ভক্তরা আবেগে ভেসে যান, আর আমরা তাঁদের অনুভূতির সম্মান রেখেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করি।” মুম্বইয়ে থাকলে স্থানীয় পুলিশের সহায়তা পাওয়া যায়, কিন্তু শহরের সীমা পেরোলেই, দেশের ভেতরে হোক বা বিদেশে, নিরাপত্তার পুরো পরিকল্পনা নতুন করে সাজাতে হয়।
শাহরুখ খান নিজেও ইয়াসিন খানের প্রশংসা করতে কার্পণ্য করেন না। তিনি বলেন, “ইয়াসিনের শিকড় লখনউ ও হায়দরাবাদে, আর সেটা তাঁর আচরণেই ফুটে ওঠে। তাঁর মধ্যে ভদ্রতা আর মানবিকতার সুন্দর মেলবন্ধন আছে। আমার পরিবারও তাঁর সঙ্গেই ভ্রমণ করতে স্বচ্ছন্দ বোধ করে। অনেকদিন ধরে আমার সন্তানেরাও তাঁর তত্ত্বাবধানেই স্কুলে যেত।” এই বিশ্বাস শুধু পেশাগত নয়, বরং পারিবারিক সম্পর্কের মতো গভীর।
ইয়াসিন খান শাহরুখ খানের এতটাই ঘনিষ্ঠ যে বহুবার তাঁকে শাহরুখের সঙ্গে ফুটবল খেলতেও দেখা গেছে। এই সম্পর্ক শুধু একজন নিরাপত্তারক্ষী আর এক তারকার নয়, বরং পারস্পরিক বিশ্বাস ও সম্মানের উপর দাঁড়ানো। তবে ইয়াসিনের পরিচিতি শুধু শাহরুখ খানেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি মহেন্দ্র সিং ধোনি, বিরাট কোহলি, যুবরাজ সিং-এর মতো প্রাক্তন ক্রিকেট অধিনায়ক ও তারকাদের পাশাপাশি বলিউডের বহু প্রথম সারির তারকার নিরাপত্তার দায়িত্ব সামলেছেন। ভিভিআইপি বিয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় তাঁকে বিশেষজ্ঞ হিসেবে ধরা হয়।
একটি ঘটনার কথা স্মরণ করে ইয়াসিন জানান, ইতালিতে বিয়ের পর মুম্বই ফেরার সময় রণবীর সিং ও দীপিকা পাডুকোনের নিরাপত্তার দায়িত্ব তাঁর উপরই ছিল। নিরাপত্তা সংস্থা ও পিআর এজেন্সির সঙ্গে সমন্বয় করা হলেও শেষ মুহূর্তে সেই সমন্বয় ভেঙে পড়ে। ফলস্বরূপ, বিমানবন্দরে বিশাল ভিড় রণবীর ও দীপিকার দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাঁদের নিরাপদে বের করে আনতে গিয়ে ইয়াসিনের কাঁধে গুরুতর চোট লাগে, যার যন্ত্রণা তিনি আজও অনুভব করেন। এই ঘটনা প্রমাণ করে, এই পেশায় শুধু শারীরিক শক্তি নয়, সাহস ও আত্মত্যাগও সমানভাবে প্রয়োজন।
প্রায় ২৫ বছর ধরে হাই-প্রোফাইল সিকিউরিটি ও এক্সিকিউটিভ প্রোটেকশনের জগতে কাজ করে ইয়াসিন খান তাঁর অভিজ্ঞতাকে নতুন রূপ দিয়েছেন। শাহরুখ খানের ব্যক্তিগত বডিগার্ড হিসেবে এক দশক কাজ করার পর, ২০১৫ সালে তিনি নিজের নিরাপত্তা সংস্থা ‘ওয়াইকে প্রোসেক’ (YK PROSEC) প্রতিষ্ঠা করেন। মুম্বইকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই সংস্থা আজ সারা দেশে ৩৬০ ডিগ্রি ব্যক্তিগত নিরাপত্তা পরিষেবা দিয়ে চলেছে।
অল্প সময়ের মধ্যেই ওয়াইকে প্রোসেক বলিউডের নামী তারকা, ক্রীড়াজগতের কিংবদন্তি এবং দেশের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের আস্থা অর্জন করেছে। এই সংস্থার লক্ষ্য শুধু নিরাপত্তা দেওয়া নয়, বরং ক্লায়েন্ট ও তাঁদের পরিবারের মানসিক স্বস্তিও নিশ্চিত করা। শহরের ভেতর হোক বা সারা দেশে যাতায়াত, ইয়াসিন ও তাঁর দল প্রতিটি চ্যালেঞ্জের জন্য প্রস্তুত।
যুবরাজ সিংয়ের মতো ক্রিকেট কিংবদন্তির ব্যক্তিগত নিরাপত্তা হোক কিংবা বড় কোনো অনুষ্ঠানে শত শত ভিআইপি অতিথির সুরক্ষা, সব ক্ষেত্রেই ইয়াসিন খান নিজের দক্ষতার ছাপ রেখেছেন। তাঁর বিশ্বাস, নিরাপত্তা কোনো সাধারণ চাকরি নয়; এটি এমন এক দায়িত্ব, যেখানে প্রতিটি সেকেন্ড সতর্ক থাকতে হয়।
আজ যখন তারকাদের ঝলমলে আলোর আড়ালে থাকা আসল নায়কদের কথা উঠে আসে, তখন ইয়াসিন খানের নাম আপনাতেই সামনে চলে আসে। ক্যামেরার আড়ালে থেকে, ভিড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে, তিনি সেই বিশ্বাসের প্রাচীর, যার ভরসায় শাহরুখ খানের মতো সুপারস্টার নিশ্চিন্তে নিজের ভক্তদের সঙ্গে মিশতে পারেন। এই কারণেই ইয়াসিন খান শুধু একজন বডিগার্ড নন, নিরাপত্তা জগতের এক বিশ্বস্ত ও সম্মানিত নাম।