প্রত্যন্ত ডোমকল থেকে রাজ্যের মেধাতালিকায় শাহরিন: সিঙ্গল মায়ের সংগ্রাম, স্কুলের স্নেহ আর নিজের জেদের অনন্য সাফল্য

Story by  Sampee Chakroborty Purkayastha | Posted by  Aparna Das • 5 h ago
শাহরিন সুলতানা
শাহরিন সুলতানা
 
শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ 

মুর্শিদাবাদের ডোমকলের প্রত্যন্ত গ্রাম কল্যাণপুর থেকে উঠে এসে ২০২৬ সালের মাধ্যমিকে রাজ্যের মেধাতালিকায় নবম স্থান অধিকার করে নজির গড়ল শাহরিন সুলতানা। পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের প্রকাশিত ফলাফলে ৭০০-র মধ্যে ৬৮৯ নম্বর পেয়ে শাহরিন শুধু নিজের পরিবার নয়, গোটা ডোমকল তথা মুর্শিদাবাদ জেলার মুখ উজ্জ্বল করেছে। আর এই সাফল্যের পিছনে রয়েছে এক সিঙ্গল মায়ের অদম্য লড়াই, শিক্ষকদের মানবিক সহায়তা এবং এক কিশোরীর অবিচল অধ্যবসায়।
 
এবারের মাধ্যমিক পরীক্ষায় রাজ্যের সামগ্রিক পাশের হার ৮৬.৮৩ শতাংশ। ৯.৫ লক্ষেরও বেশি পরীক্ষার্থীর ভিড়ে প্রথম দশে জায়গা করে নেওয়া ১৩১ জন কৃতীর মধ্যে শাহরিনের এই সাফল্য বিশেষভাবে অনুপ্রেরণাদায়ক, কারণ তার পথ ছিল প্রতিকূলতায় ভরা। ছোট্ট গ্রাম থেকে বড় স্বপ্ন দেখা শাহরিনের শিক্ষাজীবনের শুরু কল্যাণপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। পরে পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি হয় ডোমকল বসন্তপুর মডেল স্কুলে। সেখান থেকেই ধাপে ধাপে গড়ে ওঠে তার মেধার ভিত।
শাহরিনের জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি তার মা ইস্মেতারা খাতুন। পেশায় শিক্ষিকা হলেও, মেয়েকে মানুষ করতে তাঁকে একাই সামলাতে হয়েছে জীবনের বহু কঠিন বাস্তবতা। সংসারের দায়িত্ব, সামাজিক লড়াই এবং মেয়ের ভবিষ্যৎ, সবকিছুর ভার একা কাঁধে নিয়েও তিনি কখনও শাহরিনের পড়াশোনায় ছেদ পড়তে দেননি। মেয়ের সাফল্যে আবেগাপ্লুত মা জানিয়েছেন, ছোটবেলা থেকেই শাহরিন ছিল অত্যন্ত মনোযোগী, নিয়মিত এবং লক্ষ্যনিষ্ঠ।
 
শুধু পরিবার নয়, শাহরিনের স্কুলও তার সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি। বসন্তপুর মডেল স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকারা সবসময় তাকে এগিয়ে যেতে উৎসাহ দিয়েছেন। এমনও দিন গিয়েছে, যখন মা স্কুলের কাজে ব্যস্ত থাকায় মেয়ের টিফিন গুছিয়ে দিতে পারেননি; সেই সময় স্কুলের প্রধান শিক্ষক নিজের টিফিন ভাগ করে খাইয়েছেন শাহরিনকে। এই মানবিক সম্পর্কই শিক্ষার প্রকৃত ভিত্তি, আর সেই পরিবেশেই বেড়ে উঠেছে শাহরিনের আত্মবিশ্বাস।
 
পড়াশোনার পাশাপাশি শাহরিন শুধুই বইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। কবিতা আবৃত্তি, বিশেষ করে কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার প্রতি তার গভীর অনুরাগ রয়েছে। এছাড়া ক্রিকেট ও ফুটবলের প্রতিও ছিল সমান আগ্রহ। তবে সাফল্যের মূলমন্ত্র ছিল কঠোর রুটিন, গভীর অনুশীলন এবং প্রতিটি বিষয়ে নিখুঁত প্রস্তুতি। ১০ জন গৃহশিক্ষকের সহায়তায় নিজের প্রস্তুতিকে আরও শানিয়েছে সে।
 
সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথোপকনের সময় শাহরিন সুলতানা
 
নিজের নাম টেলিভিশনের পর্দায় রাজ্যের মেধাতালিকায় দেখে আবেগে ভেঙে পড়ে শাহরিনের পরিবার। শাহরিনের কথায়, ভালো ফলের আশা ছিল, কিন্তু রাজ্যের প্রথম দশে নিজের নাম দেখতে পাওয়া ছিল স্বপ্নপূরণের মতো।
 
মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে এবার শাহরিনের লক্ষ্য আরও বড়, UPSC পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে IAS বা IPS অফিসার হওয়া। প্রশাসনিক দায়িত্বে থেকে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোই তার ভবিষ্যৎ স্বপ্ন।
 
ডোমকলের মাটিতে দাঁড়িয়ে শাহরিন সুলতানা প্রমাণ করে দিল, সাফল্য কেবল শহরের সুযোগ-সুবিধার উপর নির্ভর করে না; ইচ্ছাশক্তি, পরিশ্রম, পরিবারের সমর্থন এবং সঠিক দিশা থাকলে প্রত্যন্ত গ্রামের মাটিতেও তৈরি হতে পারে আগামী দিনের প্রশাসক। শাহরিন আজ শুধু এক কৃতী ছাত্রী নয়, বাংলার অসংখ্য স্বপ্নবাজ ছাত্রছাত্রীর কাছে এক জীবন্ত প্রেরণা।