শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ
মাধ্যমিক ২০২৬-এর ফলপ্রকাশে মেধাতালিকার সাফল্য যতটা আলো কেড়েছে, তার আড়ালে থাকা সামগ্রিক ফলাফলের পরিসংখ্যান ততটাই চিন্তায় ফেলেছে শিক্ষামহলকে। প্রথম স্থানাধিকারী অভিরূপ ভদ্র ৬৯৮ নম্বর পেয়ে ৯৯.৭১ শতাংশ নম্বর অর্জন করেছে। শীর্ষস্থানীয়দের এই উজ্জ্বল ফল নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়, কিন্তু বৃহত্তর পরীক্ষার্থীদের পারফরম্যান্স বলছে অন্য কথা।
মধ্যশিক্ষা পর্ষদের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর মোট ৭ লক্ষ ৮২ হাজার ৯৭০ জন পরীক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছে। কিন্তু তাদের মধ্যে ৫৫ শতাংশেরও বেশি ছাত্রছাত্রী ৫০ শতাংশের কম নম্বর পেয়েছে। অর্থাৎ, অর্ধেকের বেশি পরীক্ষার্থী পাশ করলেও তাদের ফল শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
পর্ষদের পরিসংখ্যান বলছে, ৯০ শতাংশের উপরে নম্বর পেয়েছে মাত্র ১৩,৮৯৫ জন, যা মোট পরীক্ষার্থীর ১.৪৬ শতাংশ। ৮০-৮৯ শতাংশ নম্বর পেয়েছে ২.৮১ শতাংশ পরীক্ষার্থী। অন্যদিকে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক পড়ুয়া, ৩৪.৪৯ শতাংশ, ২৫ থেকে ৩৪ নম্বরের মধ্যে থেকে উত্তীর্ণ হয়েছে। এই চিত্র স্পষ্ট করছে, উচ্চ নম্বরপ্রাপ্তদের সংখ্যা সীমিত, আর বৃহত্তর অংশের পড়ুয়া ন্যূনতম মানেই আটকে রয়েছে।
বিষয়ভিত্তিক ফলাফলেও উদ্বেগের কারণ রয়েছে। গণিত, ইংরেজি ও ভৌতবিজ্ঞানে ৯০ শতাংশের বেশি নম্বরপ্রাপ্তের হার অত্যন্ত কম। বহু পরীক্ষকের অভিজ্ঞতায় দেখা গিয়েছে, বিশেষ করে গণিতে বহু খাতায় শূন্য বা এক অঙ্কের নম্বর দিতে হয়েছে। ইতিহাস, ভূগোল ও ইংরেজির মতো বিষয়ে ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নে দুর্বলতা ধরা পড়েছে স্পষ্টভাবে।
শিক্ষকদের একাংশ মনে করছেন, নতুন প্রজন্মের মধ্যে নিবিড় পাঠের অভ্যাস কমে যাওয়া এই পরিস্থিতির অন্যতম কারণ। অনেক পড়ুয়া এখন গভীরভাবে বিষয় বোঝার বদলে শুধুমাত্র পাশ করার লক্ষ্যে এগোচ্ছে। সহজে চাকরিমুখী বা বৃত্তিমূলক শিক্ষার দিকে ঝোঁকও সাধারণ শিক্ষার ভিত দুর্বল করছে বলে মত শিক্ষাবিদদের।
এছাড়া শিক্ষানীতির কিছু কাঠামোগত সমস্যার কথাও সামনে এসেছে। প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাশ-ফেল প্রথা তুলে দেওয়ায় পড়াশোনার প্রতি অনেকের দায়বদ্ধতা কমেছে বলে অভিযোগ। বহু স্কুলে দীর্ঘদিন বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ না হওয়া, স্কুলে অনিয়মিত উপস্থিতি, শৃঙ্খলার অভাব এবং শুধুমাত্র প্রকল্পনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থাকেও দায়ী করছেন শিক্ষকদের একাংশ।
শিক্ষাবিদদের মতে, এই ফলাফল শুধু নম্বরের হিসাব নয়, এটি রাজ্যের স্কুলশিক্ষার ভিত কতটা মজবুত, তারও প্রতিফলন। কয়েকজন মেধাবীর সাফল্য রাজ্যের সামগ্রিক শিক্ষার মানকে ঢেকে রাখতে পারে না। বরং এই ফলাফল দেখিয়ে দিল, প্রাথমিক স্তর থেকেই পাঠাভ্যাস, গণিতচর্চা, ভাষাগত দক্ষতা এবং নিয়মিত বিদ্যালয়মুখী শিক্ষার উপর নতুন করে জোর দেওয়া প্রয়োজন।
মেধাতালিকার সাফল্য অবশ্যই গর্বের, কিন্তু শিক্ষার প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন বৃহত্তর ছাত্রসমাজও শক্ত ভিতের উপর দাঁড়াবে। নইলে প্রতি বছর কিছু উজ্জ্বল নাম সামনে এলেও, সামগ্রিক শিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্য অধরাই থেকে যা