রাজ্যে শীর্ষস্থান গ্রহণ করা দুই কৃতি ছাত্র মুর্শিদাবাদের ভবতা আজিজিয়া হাই মাদ্রাসার মহম্মদ মুস্তাক নাজ়িম এবং মালদহের এনএমএস হাই মাদ্রাসার শাহান আখতার
শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ
পশ্চিমবঙ্গ মাদ্রাসা শিক্ষা পর্ষদ ঘোষিত ২০২৬ সালের হাই মাদ্রাসা, আলিম ও ফাজিল পরীক্ষার ফলাফল এ বছরের শিক্ষাক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা তুলে ধরেছে, সংখ্যালঘু শিক্ষার পরিসরে মেয়েদের ধারাবাহিক অগ্রগতি যেমন আরও একবার প্রমাণিত হল, তেমনই হাই মাদ্রাসায় যুগ্মভাবে প্রথম স্থান অধিকার করে দুই ছাত্র রাজ্যের মুখ উজ্জ্বল করল।
প্রায় ৮৩ দিনের অপেক্ষার অবসানে প্রকাশিত এই ফলাফলে দেখা গিয়েছে, হাই মাদ্রাসা বিভাগে পাশের হার ৯০.৮৬ শতাংশ, যা অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য। মোট ৪২ হাজার ৭৪৪ জন পরীক্ষার্থী এই বিভাগে অংশ নেয়। সামগ্রিক পরিসংখ্যানে ছাত্রীরা আবারও ছেলেদের তুলনায় এগিয়ে। তিনটি বিভাগ মিলিয়ে ছাত্রদের পাশের হার ৪১.৬৬ শতাংশ হলেও ছাত্রীদের পাশের হার ৫৮.৩৪ শতাংশ, যা স্পষ্ট করে দিচ্ছে, শিক্ষার ময়দানে মেয়েরা শুধু অংশগ্রহণেই নয়, সাফল্যের নিরিখেও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করছে।
হাই মাদ্রাসার মেধাতালিকায় প্রথম দশে স্থান পেয়েছে ১৩ জন। তার মধ্যে ছাত্রীদের উপস্থিতি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। শুধু পাশের হারেই নয়, মেধাতালিকাতেও মেয়েদের সাফল্য এই বার্তা দেয় যে সামাজিক ও শিক্ষাগত বাধা অতিক্রম করে তারা নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করছে। ছাত্রীদের মধ্যে সর্বোচ্চ সাফল্য এসেছে মালদহ জেলার দুই কৃতি, রিফা আনজুম এবং আফরিদা খাতুনের হাত ধরে। দু’জনেই ৭৭৭ নম্বর পেয়ে রাজ্যে চতুর্থ স্থান অর্জন করেছে। এই সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত নয়, বরং বাংলার সংখ্যালঘু কন্যাশিক্ষার এগিয়ে চলার প্রতীক।
অন্যদিকে, হাই মাদ্রাসার শীর্ষস্থানে এ বছর তৈরি হয়েছে এক অনন্য নজির। যুগ্মভাবে প্রথম স্থান অধিকার করেছে দুই ছাত্র, মুর্শিদাবাদের ভবতা আজিজিয়া হাই মাদ্রাসার মহম্মদ মুস্তাক নাজ়িম এবং মালদহের এনএমএস হাই মাদ্রাসার শাহান আখতার। দু’জনেই পেয়েছে ৭৮১ নম্বর। দুই ভিন্ন জেলার দুই ছাত্রের এই যৌথ সাফল্য রাজ্যের মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার বিস্তৃত মানোন্নয়নের পরিচয় বহন করে। তাঁদের এই অর্জন প্রমাণ করে দিয়েছে, মেধা ও অধ্যবসায় থাকলে প্রান্তিক বা সংখ্যালঘু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেও রাজ্যসেরা হওয়া সম্ভব।
দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে মালদহেরই ফতেখানি বিএমএস হাই মাদ্রাসার মহম্মদ শাকিল হোসেন, প্রাপ্ত নম্বর ৭৮০। তৃতীয় স্থানে কোচবিহারের মুন্সিরহাট সাহেকিয়া হাই মাদ্রাসার মিরাজ রহেমান, নম্বর ৭৭৮। এই ফলাফল স্পষ্ট করে যে রাজ্যের বিভিন্ন জেলার মাদ্রাসাগুলিতে শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি পেয়েছে এবং প্রতিযোগিতা এখন অনেক বেশি বিস্তৃত।
এ বছরের ফলাফলের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য হল, মেয়েদের এগিয়ে থাকা আর শুধুমাত্র পরিসংখ্যান নয়, এটি সামাজিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত। সংখ্যালঘু সমাজে নারীশিক্ষা নিয়ে যে ইতিবাচক পরিবর্তন তৈরি হয়েছে, এই ফলাফল তার বাস্তব প্রতিফলন। পরিবার, শিক্ষক এবং প্রতিষ্ঠান, তিন স্তরের সম্মিলিত প্রয়াসে মেয়েরা আজ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজেদের জায়গা করে নিচ্ছে।
একই সঙ্গে প্রথম হওয়া মুস্তাক নাজ়িম ও শাহান আখতারের কৃতিত্ব তরুণ প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণা। তাঁদের সাফল্য দেখিয়ে দিল, কঠোর পরিশ্রম, সঠিক পরিকল্পনা এবং শিক্ষকদের দিকনির্দেশনা থাকলে বড় সাফল্য অর্জন সম্ভব। রাজ্যের দুই প্রান্ত থেকে উঠে আসা এই দুই ছাত্র যেন বাংলার শিক্ষাক্ষেত্রে ঐক্য, প্রতিযোগিতা ও উৎকর্ষের প্রতীক।
সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের হাই মাদ্রাসার ফলাফল শুধু একটি পরীক্ষার ফল নয়, এটি বাংলার সংখ্যালঘু শিক্ষার অগ্রগতি, মেয়েদের ক্ষমতায়ন এবং নতুন প্রজন্মের সাফল্যের এক উজ্জ্বল দলিল। মেয়েদের ধারাবাহিক সাফল্য এবং যুগ্ম প্রথম দুই ছাত্রের অসাধারণ কৃতিত্ব আগামী দিনের শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন আশা, নতুন অনুপ্রেরণা এবং নতুন লক্ষ্য স্থির করে দিল।