শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ
মুর্শিদাবাদের বেলডাঙা থানার অন্তর্গত প্রত্যন্ত জানকিনগর গ্রাম থেকে উঠে এসে যে সাফল্যের গল্প আজ চারদিকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে, তার নায়ক আলমগীর হোসেন। সাধারণ এক পরিবারের সন্তান আলমগীর এ বছর পশ্চিমবঙ্গ সিভিল সার্ভিস (ডব্লিউবিসিএস) পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে ২০ নম্বর স্থান অধিকার করে বেলডাঙা থানার প্রথম ডব্লিউবিসিএস অফিসার হিসেবে ইতিহাস গড়েছেন।
আলমগীরের বাবা নিফাজ শেখ এবং মা সালেহা বেগম। আর্থিক দিক থেকে পরিবারটি কখনওই সচ্ছল ছিল না। দিন আনা দিন খাওয়া সংসারে সন্তানের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়াই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। তবু ছেলের স্বপ্নের পথে কখনও বাধা হয়ে দাঁড়াননি বাবা-মা। তাঁদের বিশ্বাস আর আশীর্বাদই আলমগীরের এগিয়ে চলার প্রধান শক্তি হয়ে উঠেছিল।
আজকের প্রতিযোগিতামূলক যুগে যেখানে নামী কোচিং সেন্টার, অনলাইন ক্লাস আর স্মার্টফোনকে সাফল্যের অপরিহার্য উপকরণ বলে মনে করা হয়, সেখানে আলমগীরের গল্প এক ব্যতিক্রমী উদাহরণ। তিনি কোনও কোচিংয়ে পড়াশোনা করেননি। এমনকি দীর্ঘ সময় তাঁর নিজের একটি মোবাইল ফোনও ছিল না। পরিবারের আর্থিক অনটনের কারণে মোবাইল কেনা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। তবু এই সীমাবদ্ধতাই তাঁকে থামিয়ে দিতে পারেনি।
আলমগীর পড়াশোনার জন্য ভরসা রেখেছিলেন বই আর নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তির উপর। বন্ধু, পরিচিত ও গ্রামের মানুষদের কাছ থেকে বই জোগাড় করে তিনি প্রস্তুতি নেন। অনেকের কাছ থেকে তিনি যে সাহায্য পেয়েছেন, তা ছিল আর্থিক নয়, বরং পড়াশোনার দিকনির্দেশ, পরামর্শ আর মানসিক উৎসাহ। সেই সহযোগিতাকে সঙ্গী করেই একা একা, নিরলস পরিশ্রম আর কঠোর অধ্যবসায়ের মাধ্যমে তিনি নিজেকে গড়ে তুলেছেন।
WBCS পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর পরিবারের সঙ্গে আলমগীর হোসেন
দিনের পর দিন একটানা পড়াশোনা, সময়ের সঠিক ব্যবহার এবং লক্ষ্য স্থির রেখে এগিয়ে চলাই ছিল তাঁর রুটিন। বারবার ব্যর্থতার আশঙ্কা এলেও মনোবল হারাননি তিনি। আলমগীর বিশ্বাস করতেন, পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক, পরিশ্রম কখনও বৃথা যায় না। সেই বিশ্বাসই আজ বাস্তবে রূপ নিয়েছে।
ডব্লিউবিসিএস পরীক্ষায় তাঁর এই সাফল্যে গোটা জানকিনগর গ্রাম, বেলডাঙা এলাকা এবং মুর্শিদাবাদ জেলার মানুষ গর্বিত। প্রতিবেশী থেকে শুরু করে আত্মীয়স্বজন, সকলেই আলমগীরকে নিজেদের ছেলে বলে মনে করছেন। তাঁর সাফল্য প্রমাণ করে দিয়েছে, বড় স্বপ্ন দেখার জন্য বড় শহর বা বড় আর্থিক সামর্থ্য জরুরি নয়; দরকার শুধু অদম্য ইচ্ছাশক্তি, সততা আর কঠোর পরিশ্রম।
WBCS পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর পরিবারের সঙ্গে আলমগীর হোসেন
আলমগীর হোসেনের এই সাফল্যের কাহিনী আজ অসংখ্য তরুণ-তরুণীর কাছে অনুপ্রেরণা। প্রত্যন্ত গ্রামের সাধারণ ঘর থেকেও যে প্রশাসনের উচ্চস্তরে পৌঁছানো সম্ভব, তাঁর জীবনই তার উজ্জ্বল উদাহরণ।