মুসলিম সমাজে মেয়েদের শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে: প্রাক্তন মহারাষ্ট্র মন্ত্রী আনিস মজিদ আহমেদ

Story by  atv | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 9 d ago
শিক্ষা কর্মী ডঃ আনিস মাজীদ আহমেদ একটি গণসম্মেলনে বক্তৃতা দিচ্ছেন।
শিক্ষা কর্মী ডঃ আনিস মাজীদ আহমেদ একটি গণসম্মেলনে বক্তৃতা দিচ্ছেন।
 
রিতা ফারহাত মুকান্দ

নাগপুরের ডা. আনিস মজিদ আহমেদ একজন প্রাক্তন মন্ত্রী, শিক্ষাবিদ ও সমাজ সংস্কারক, যিনি মুসলিম শিক্ষার উন্নয়নকে নিজের জীবনের লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছেন। সম্প্রতি তিনি নাগপুরের লোনারায় সেন্ট্রাল প্রভিন্স ফিজিওথেরাপি কলেজ (CPPC) এবং সেন্ট্রাল ইন্ডিয়া কলেজ অব ফার্মেসি প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি নাগপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুডেন্টস ইউনিয়নের প্রথম মুসলিম সভাপতি নির্বাচিত হন। একইসঙ্গে তিনি মহারাষ্ট্রের প্রথম মুসলিম শিক্ষামন্ত্রী, যার উদ্যোগে মহারাষ্ট্র ভারতের অন্যতম কম্পিউটার-সাক্ষর রাজ্যে পরিণত হয়।

আওয়াজ-দ্য-ভয়েস-এর সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। সাক্ষাৎকারের অংশবিশেষ—

প্রশ্ন: আপনার প্রাথমিক জীবনের যাত্রা সম্পর্কে বলুন এবং কীভাবে আপনি উচ্চমানের শিক্ষার জন্য এত দৃঢ়ভাবে কাজ করতে অনুপ্রাণিত হলেন?

উত্তর:আমার কাছে সাক্ষরতা কখনোই কোনো বিমূর্ত আদর্শ বা রাজনৈতিক স্লোগান ছিল না। এটি সবসময়ই ছিল জীবনের সঙ্গে জড়িত একটি বাস্তব প্রশ্ন—যা আমি যে সুবিধা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছি, আমার চারপাশে যে বঞ্চনা দেখেছি এবং যে দায়িত্ব সচেতনভাবে নিজের কাঁধে নিয়েছি, সেগুলোর দ্বারা গঠিত। বছরের পর বছর ধরে আমার এই যাত্রা একটানা আত্মসমালোচনার মতো—কীভাবে শিক্ষা কেবল একজন ব্যক্তির সামাজিক অগ্রগতিই নয়, একটি জাতির দিকনির্দেশও নির্ধারণ করে।

একজন শিক্ষাবিদ, সমাজ সংস্কারক এবং প্রাক্তন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে আমি সাক্ষরতা, সংখ্যালঘুদের উন্নয়ন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়েছি—বিশেষ করে মহারাষ্ট্রে মুসলিম ও অন্যান্য প্রান্তিক সম্প্রদায়ের মধ্যে।

 
 
বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রনেতা হিসেবে আমার উত্থান এবং পরে মহারাষ্ট্র সরকারের মন্ত্রী হওয়া—কখনোই ব্যক্তিগত উন্নতির জন্য ছিল না। বরং এর উদ্দেশ্য ছিল বোঝা—কোথায় ব্যবস্থাটি তাদের জন্য ব্যর্থ হয়, যাদের শিক্ষায় প্রবেশাধিকার নেই, এবং কীভাবে সেই ত্রুটিগুলো সংশোধন করা যায়।

প্রশ্ন: রাজনীতিবিদ থেকে একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষাবিদ হয়ে ওঠার এই পরিবর্তন সম্পর্কে বলুন।

আমি একটি স্বচ্ছল পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছি; আমার মা বেঙ্গালুরু এবং বাবা নাগপুরের বাসিন্দা ছিলেন। আমি একটি মিশনারি ইংরেজি-মাধ্যম স্কুলে পড়াশোনা করি। পরবর্তীতে আইন বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিই এবং এমবিএ ডিগ্রি অর্জন করি। ছোটবেলা থেকেই আমি বুঝতে পেরেছিলাম—আমি কী ধরনের সুযোগ-সুবিধা পেয়েছি। নীতিন গडकরির মতো সহপাঠীদের সঙ্গে পড়াশোনা করতে গিয়ে আরও স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করি যে, জীবনের গন্তব্য নির্ধারণে প্রাথমিক সুযোগ, প্রাতিষ্ঠানিক প্রবেশাধিকার ও সামাজিক নেটওয়ার্ক কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ন্যাশনাল স্টুডেন্টস ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া (NSUI)-এর ছাত্রনেতা হিসেবে আমার ভাবনা ছিল খুবই সহজ কিন্তু দৃঢ়—পরিস্থিতির কারণে আমি যা পেয়েছি, তা যেন কেবল আমার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে। আমার কাছে নেতৃত্বের অর্থ ছিল সুযোগের ন্যায্য বণ্টন।

সংখ্যালঘু ও গ্রামীণ এলাকার শিক্ষার্থীরা আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে বঞ্চনার এক দুষ্টচক্রে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। দরিদ্র মানুষদের কম সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন পৌর স্কুলে পড়তে বাধ্য করা হয়। এর ফলে তারা সীমিত কর্মসংস্থানের সুযোগ পায় এবং অদক্ষ শ্রমিকে পরিণত হয়। শিক্ষার অভাবই ছিল বৈষম্যের নীরব স্থপতি।

এই চ্যালেঞ্জ বা প্রতিবন্ধকতাগুলোর মোকাবিলা আপনি কীভাবে করেছিলেন?

২০০৮ সালে মহারাষ্ট্রের প্রথম সংখ্যালঘু শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে আমি একটি কমিশনভিত্তিক বৃত্তি প্রকল্প চালু করি, যার আওতায় মুসলিম, খ্রিস্টান, জৈন ও শিখসহ সংখ্যালঘু ছাত্রছাত্রীদের প্রতি জনকে সর্বোচ্চ ২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত সহায়তা দেওয়া হতো। বছরে ৪০০–৫০০ কোটি টাকার বরাদ্দের মাধ্যমে এই প্রকল্প হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ ও সারা দেশে কর্মসংস্থান পেতে সক্ষম করে। কয়েক দশক পরেও এর প্রভাব ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে।
 
 
“গ্রামীণ এলাকার ছাত্রছাত্রীরা শহরে আসতে শুরু করে, হোস্টেলে থাকতে থাকে এবং পেশাদার জীবনের স্বপ্ন দেখতে শেখে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে সবচেয়ে স্পষ্ট পরিবর্তন দেখা গেছে কন্যাশিশুদের ক্ষেত্রে। তরুণীরা এখন উচ্চশিক্ষায় এগিয়ে যাচ্ছে, NEET-এর মতো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় সাফল্য অর্জন করছে এবং কম্পিউটার সায়েন্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ফিজিওথেরাপি ও স্বাস্থ্যসেবার মতো প্রযুক্তিগত ও উদীয়মান ক্ষেত্রে প্রবেশ করছে। আমার কাছে এটি একটি সহজ সত্যকে প্রমাণ করে—যখন বাধা সরিয়ে দেওয়া হয়, তখন আকাঙ্ক্ষা আপনাতেই নতুনভাবে গড়ে ওঠে।

আমার বাবা-মায়ের নামে প্রতিষ্ঠিত একটি দাতব্য ট্রাস্টের মাধ্যমে আমি স্বাস্থ্যসেবা, নার্সিং, ফিজিওথেরাপি এবং আইন শিক্ষার ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে সহায়তা করেছি। মহারাষ্ট্র নলেজ কর্পোরেশনের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে আমি মহারাষ্ট্রকে দেশের অন্যতম কম্পিউটার-সাক্ষর রাজ্যে পরিণত করার লক্ষ্যে কাজ করেছি। যদিও কেরালা এখনও ভারতের সাক্ষরতার মানদণ্ড, তবু আমি সবসময় বিশ্বাস করেছি—ডিজিটাল সাক্ষরতাই পরবর্তী সীমান্ত, যা বৃহৎ পরিসরে সুযোগকে গণতান্ত্রিক করতে সক্ষম।

আমি সাক্ষরতা, নেতৃত্বের দৃষ্টিভঙ্গি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক দেখি। কেরালা, কর্ণাটক, তেলেঙ্গানা, মহারাষ্ট্র ও গুজরাটের মতো রাজ্যগুলো শিক্ষিত কর্মশক্তি আকর্ষণ করতে পারে এবং শক্তিশালী আইটি পরিবেশ গড়ে তুলেছে। অন্যদিকে কিছু রাজ্য পিছিয়ে রয়েছে। বিহার, মধ্যপ্রদেশ ও উত্তরপ্রদেশের কিছু অংশে অপরাধ, সাম্প্রদায়িকতা ও সামাজিক বিভাজন কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘদিনের শিক্ষাগত অবহেলার ফল, যেখানে নেতৃত্বের মধ্যে পরিবর্তনের দৃষ্টিভঙ্গির অভাব রয়েছে। সাক্ষরতাই জাতীয় উন্নয়নের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সূচক। তাই শিক্ষা বাজেটকে ব্যয় নয়, বরং সামাজিক সংহতিতে বিনিয়োগ হিসেবে দেখা উচিত।


আপনি কি মনে করেন, মুসলিমরা অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের তুলনায় ভিন্ন ধরনের বাধার মুখোমুখি হন?

বিশেষ করে মুসলিমদের ক্ষেত্রে বাধাগুলো বহুস্তরবিশিষ্ট—অর্থনৈতিক পশ্চাৎপদতা, প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার অভাব এবং কাঠামোগত বঞ্চনা। অভিভাবকরা চান তাঁদের সন্তানরা পড়াশোনা করুক, কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে অনেক সময় শিক্ষার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব হয় না। আবার কন্যাসন্তানদের ক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষার পরিবর্তে এখনও অনেক পরিবার অল্প বয়সে বিয়ের দিকেই ঝুঁকে পড়ে। এই মানসিকতার পরিবর্তন অত্যন্ত জরুরি।

আমার প্রধান লক্ষ্য সবসময়ই ছিল শিক্ষার মাধ্যমে মুসলিমদের মূল স্রোতে নিয়ে আসা। ভারতের ইতিহাসে মুসলিমদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—স্বাধীনতা সংগ্রামে তারা সম্পদ, ত্যাগ এবং জীবন পর্যন্ত উৎসর্গ করেছেন। অথচ আজ অনেক মুসলিম নিজেকে প্রান্তিক ও লক্ষ্যবস্তু হিসেবে অনুভব করেন। উন্নত দেশগুলোতে সংখ্যালঘুরা সমান সুযোগ পায়; দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ভারতে এটি এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

পরিবর্তনের জন্য কী কী গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ প্রয়োজন?

আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, মুসলিম সমাজকে অবশ্যই কন্যাশিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। প্রবাদ আছে—“একজন নারীকে শিক্ষিত করলে একটি পরিবার শিক্ষিত হয়; আর একটি মেয়েকে শিক্ষিত করলে ভবিষ্যৎ শিক্ষিত হয়।” আজ বিভিন্ন ক্ষেত্রে মেয়েরাই ছেলেদের ছাড়িয়ে যাচ্ছে। সমাজকে শিক্ষাকে, বিশেষ করে কন্যাশিক্ষাকে, উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করতে হবে।

সাক্ষরতা কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়; এটি অপরিহার্য। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা, জাতিকে শক্তিশালী করা এবং সবার জন্য ন্যায়সংগত ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার জন্য এটি আমাদের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র।

“পঁচিশ বছর পর, এই উদ্যোগগুলোর মাধ্যমে শিক্ষিত শিক্ষার্থীরা যখন এই উত্তরাধিকার এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, তখনও আমার বিশ্বাস অপরিবর্তিত—শিক্ষাই অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতি গঠনের সবচেয়ে শক্তিশালী, এবং সম্ভবত একমাত্র, টেকসই উপকরণ।”