শান্তিপ্রিয় রায় চৌধুরী
কলকাতা ময়দানে মোহামেডান স্পোর্টিংয়ের দলবদল মানে শুধু ফুটবলার বদল নয়, অনেক সময় সেটাই হয়ে উঠেছে ইতিহাস বদলের সূচনা। মোহনবাগান ও ইস্টবেঙ্গলের পাশাপাশি দীর্ঘদিন ময়দানের তৃতীয় শক্তি ছিল মোহামেডান। তাদের উত্থান-পতনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কলকাতা ফুটবলের বহু স্মরণীয় অধ্যায়।
একসময় মোহামেডান খেললেই মাঠ ভরে যেত। গেট মানির সেই টাকা থেকেই ফুটবলারদের বুট, ভালো খাবার ও ডায়েটের ব্যবস্থা করা হতো, যা তখন ভারতের অধিকাংশ ক্লাবের কাছে ছিল বিরল। আর তারকা ফুটবলার দলে আনার পদ্ধতিও ছিল আলাদা। কোটি টাকার ট্রান্সফার ফি নয়, চাকরি, থাকার ব্যবস্থা, বেতন ও সম্মান দিয়েই তৈরি হতো শক্তিশালী দল।
১৯৩৬-৪০ সালে লিগ চ্যাম্পিয়ন মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের ছবি
১৯৩২ থেকে ১৯৩৮: ব্রিটিশ আধিপত্যে আঘাত
১৯৩২ সালে কলকাতা লিগের দ্বিতীয় ডিভিশন থেকে প্রথম ডিভিশনে উঠে আসে মোহামেডান। এরপর ক্লাব কর্তারা কোয়েটা-সহ বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রতিভাবান ফুটবলার এনে দল গড়তে শুরু করেন। বিশেষ করে ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মির ফুটবলারদের দলে আনা ছিল বড় সাফল্য।
এর ফল মিলল দ্রুত। ১৯৩৪ থেকে ১৯৩৮, টানা পাঁচবার কলকাতা লিগ চ্যাম্পিয়ন মোহামেডান।তখন কলকাতা ফুটবলে ব্রিটিশ সামরিক দলগুলির আধিপত্য। সেই একচেটিয়া দাপট ভেঙে ভারতীয় একটি দলের উত্থান সংবাদপত্রেও বিশেষ গুরুত্ব পায়।
৬ জুলাই ১৯৩৪-এ The Star of India শিরোনাম করেছিল, “The babies come, they saw, they conquered.” The Englishman ও Statesman-এও উঠে আসে ব্রিটিশ সামরিক ক্লাবগুলির আধিপত্য ভাঙার প্রসঙ্গ।
মোহামেডানের এই সাফল্য ফুটবলের গণ্ডি ছাড়িয়ে পৌঁছে যায় কবিতাতেও। কাজী নজরুল ইসলাম লেখেন ‘মোবারকবাদ’, আর গোলাম মোস্তফার ‘লিগ বিজয়’-এ উঠে আসে সেই সময়ের উচ্ছ্বাস, “নহে এ লিগ বিজয়, আজকে মোদের দিগ্বিজয়।”
চাকরি দিয়েই তৈরি হয়েছিল ‘ইংরেজ-বধের’ দল
মোহামেডানের সেই শক্তিশালী দলের নেপথ্যে ছিলেন ক্লাবকর্তা খাজা মাইনুদ্দিন। কোয়েটা থেকে তিনি নিয়ে এসেছিলেন জুম্মা খান, রশিদ বাক্কার ও নূর মোহাম্মদের মতো ফুটবলারদের। তাঁরা ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
তাঁদের ক্লাবে আনতে মোহামেডান দিয়েছিল চাকরি, কলকাতায় থাকার ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা।১৯৩৬ সালে ক্যালকাটা কাস্টমসের সেরা স্ট্রাইকারদের অন্যতম মাসুমকেও দলে নেয় মোহামেডান। তখন দলবদলের আনুষ্ঠানিকতাও ছিল সাদামাটা। একটি হাতে লেখা চিঠিতে লেখা থাকত, “আমি অমুক ক্লাবের হইয়া খেলিতে ইচ্ছুক।”সেই একটি চিঠি আর একটি সই-ই বদলে দিতে পারত একটি দলের ভবিষ্যৎ।
মোহামেডানের প্রথম লিগ জয় (১৯৩৪) কবিতা লিখেছিলেন নজরুল
১৯৪৭: দেশভাগে ভেঙে গেল শক্তিশালী দল
দেশভাগের পর মোহামেডানের সোনালি দল ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। জুম্মা খান, আব্দুল হামিদদের মতো ফুটবলার চলে যান ঢাকা ও করাচিতে। এরপর শুরু হয় উল্টো স্রোত। ১৯৪৯ সালে মোহামেডানের বাঙালি তারকা মাসুদ ফাকরিকে তুলে নেয় ইস্টবেঙ্গল। পরের বছর মোহনবাগানে চলে যান মোহামেডানের গোলকিপার শেখ দোশা মোহাম্মদ, যিনি ১৯৪০ ও ১৯৪১ সালে মোহামেডানের লিগজয়ী দলের সদস্য ছিলেন।
ফলাফল, ১৯৪৮ থেকে ১৯৫৬, টানা আট বছর কলকাতা লিগের শিরোপা অধরা মোহামেডানের।যে ক্লাব একসময় অন্য দলের তারকা তুলে নিত, এবার তার নিজের ফুটবলাররাই চলে যেতে শুরু করেছিলেন দুই প্রধানের ঘরে।পঞ্চাশ-ষাটের দশক: টাকা নয়, ছিল অন্যরকম দলবদল ।
আজকের কোটি টাকার ট্রান্সফার বাজারের সঙ্গে সেই সময়ের তুলনা চলে না। মোহামেডানের অন্যতম বড় শক্তি ছিল তাদের দর্শক। ম্যাচের গেট মানি ও সদস্যদের চাঁদায় ক্লাব চলত। সেই অর্থেই ফুটবলারদের সরঞ্জাম, বুট ও ভালো খাবারের ব্যবস্থা করা হতো।
আর ফুটবলার আনার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা ছিল চাকরির।পঞ্চাশের দশকে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান থেকে উসমান জান, জামাল খানের মতো ফুটবলাররা কলকাতা মোহামেডানে খেলতে আসতেন। বড় ট্রান্সফার ফি নয়, তাঁদের দেওয়া হতো চাকরি, বাড়ি এবং মাসে প্রায় ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা বেতন।তখন একটি দলের পুরো বছরের বাজেটই ছিল আনুমানিক এক থেকে দুই লাখ টাকা।
ষাটের দশকে থেমে গেল পুরনো মডেল
ষাটের দশকে পাকিস্তান থেকে ফুটবলার আনার ক্ষেত্রে সরকারি বিধিনিষেধ শুরু হওয়ায় মোহামেডানের পুরনো দলগঠনের মডেল ভেঙে পড়ে। দেশভাগের পর পৃষ্ঠপোষকদের একটা অংশ পাকিস্তানে চলে যাওয়ায় আর্থিক চাপও তৈরি হয়েছিল।
কোয়েটা-পেশোয়ার থেকে ফুটবলার এনে দল গড়ার যে পদ্ধতি একসময় মোহামেডানকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছিল, সেটাই আর আগের মতো চালানো সম্ভব হল না।
১৯৮০-৮১: ফের তারকা দলবদল
আশির দশকের শুরুতে আবার বড় দল গড়ার চেষ্টা করে মোহামেডান। ১৯৮০ সালে ইস্টবেঙ্গল থেকে আসেন আকবর। একই সময়ে দলে যোগ দেন ইস্টবেঙ্গলের জনপ্রিয় স্ট্রাইকার মোহাম্মদ সাবির আলি।
সাবিরকে দলে আনতে মোহামেডানের প্রস্তাব ছিল অভিনব, একটি ট্যাক্সি। তৎকালীন সময়ে অ্যাম্বাসাডর ট্যাক্সির দাম প্রায় ৪০ হাজার টাকা, যা সেই সময়ের হিসেবে বড় অঙ্ক।আকবরের ক্ষেত্রেও দলবদলের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল সম্মানের প্রশ্ন। তাঁর বক্তব্য ছিল, মোহামেডানের সমর্থকদের কাছ থেকে যে মর্যাদা তিনি পান, তা অন্যত্র পাওয়া কঠিন।এই নতুন দল গড়ার ফলও এল দ্রুত। ১৯৮১ সালের ফেডারেশন কাপ ফাইনালে মোহনবাগানকে হারিয়ে ট্রফি জেতে মোহামেডান।
মোহনবাগানের প্রাক্তন অধিনায়ক আব্বাস মির্জা
তিন শক্তির ময়দান, বদলে যাওয়া সময়
মোহামেডানের ইতিহাসের দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট, ক্লাবটি শক্তিশালী হলে কলকাতা ফুটবলের প্রতিযোগিতাও আরও জমে উঠত। মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল ও মোহামেডানের ত্রিমুখী লড়াই ছিল ময়দানের অন্যতম আকর্ষণ।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে দলবদলের অর্থনীতি বদলে গেছে। একসময় কোয়েটা-পেশোয়ার থেকে ফুটবলার আসতেন চাকরি ও থাকার আশ্বাসে। এখন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ফুটবলার তুলে এনে দল গড়াই নতুন বাস্তবতা।
আজকের মোহামেডান: ইতিহাস বনাম আর্থিক সংকট
শতবর্ষের ঐতিহ্য পেরিয়ে আজ মোহামেডান স্পোর্টিংয়ের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আর্থিক সংকট। ক্লাবের দেনা, ফুটবলার ও কোচদের পাওনা এবং FIFA transfer ban-এর মতো সমস্যায় দলগঠনের পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হয়েছে।আপনার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আর্থিক সমস্যার জেরে ক্লাবকে শীর্ষ স্তরের প্রতিযোগিতা থেকে নেমে যেতে হয়েছে। নতুন ফুটবলার নেওয়ার ক্ষেত্রেও রয়েছে বিধিনিষেধ, পাশাপাশি বর্তমান দলের বেতন-পাওনা নিয়েও তৈরি হয়েছে জটিলতা।
একসময় যে ক্লাব গেট মানির টাকায় বুট কিনত, ফুটবলারকে চাকরি দিয়ে কলকাতায় আনত, সেই ক্লাব আজ লড়ছে টাকার অভাবে।তবু মোহামেডানের ইতিহাসে দলবদল বরাবরই শুধু দল তৈরির কৌশল ছিল না, তা ছিল ময়দানের শক্তির ভারসাম্য বদলের হাতিয়ার।
কোয়েটা থেকে কলকাতা, চাকরির চিঠি থেকে কোটি টাকার ট্রান্সফার, দলবদলের ভাষা বদলেছে। কিন্তু মোহামেডানের গল্পে দলবদল এখনও কলকাতা ফুটবলের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ।