মুন্নী বেগম / গুয়াহাটি
মাঘ বিহুর কথা উঠলেই অসমের মাঘ বিহুর আগের রাত (উরুকা ) স্বাভাবিকভাবেই বিশেষ গুরুত্ব পায়। এই রাতে সাধারণত সুস্বাদু খাবার, ভোজ, হাঁস-মুরগি কিংবা পিঠা-পনা নিয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু উরুকার রাতের একটি গভীর দিক হলো—মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে এর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। আধুনিক যুগে যাকে আমরা মানসিক শান্তি, মানসিক সংযোগ, একাকীত্ব থেকে মুক্তি ইত্যাদি বলে থাকি, সেই সবই প্রাচীনকাল থেকেই উরুকার রাতে স্বাভাবিকভাবে বিদ্যমান ছিল।
আগে অসমের গ্রামাঞ্চলে উরুকার রাত মানেই ছিল একসঙ্গে জেগে কাটানোর একটি রাত। কৃষিভিত্তিক সমাজে এই সময়টা কেবল আনন্দের জন্যই নয়, নিরাপত্তার দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ফসল কাটার পর মাঠের পাশে তৈরি ভেলাঘরে জেগে থেকে মানুষ একসঙ্গে সময় কাটাত। এই একসঙ্গে জেগে থাকার অভ্যাস মানুষের মধ্যে গভীর সামাজিক বন্ধন তৈরি করত। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় বললে, এটি ছিল এক ধরনের ‘সমষ্টিগত আবেগগত ভাগাভাগি (collective emotional sharing)’, যা মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে এবং মানুষকে একাকীত্বের অনুভূতি থেকে মুক্ত করে।

উরুকার রাতে একসঙ্গে জেগে থেকে আগুনের উষ্ণতা নেওয়ার দৃশ্য
উরুকার রাতে বয়স, লিঙ্গ কিংবা সামাজিক অবস্থানের কোনো ভেদাভেদ ছিল না। বৃদ্ধ, যুবক-যুবতী ও শিশুরা সবাই একসঙ্গে আগুনের পাশে বসে নানা বিষয়ে কথা বলত। কেউ নিজের জীবনের অভিজ্ঞতার কথা শোনাত, আবার কেউ কৌতুক, লোককথা কিংবা গান গেয়ে পরিবেশকে আনন্দময় করে তুলত। এই কথোপকথনগুলো শুধু বিনোদনের জন্যই ছিল না; বরং এগুলো ছিল মানসিক চাপ কমানোর একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। আজকের সময়ে বহু মানুষ যে একাকীত্ব এবং মনের কথা বলতে না পারার যন্ত্রণা অনুভব করে, উরুকার রাত সেই অভাব অনেকটাই পূরণ করত।
আগুনের পাশে বসে থাকার অভিজ্ঞতাই নিজেই মানসিক স্বস্তি দেয়। আগুনের তাপ, জ্বলন্ত কাঠের শব্দ এবং রাতের নীরবতা—সব মিলিয়ে মানুষের মনে এক ধরনের স্থিরতা এনে দেয়। আধুনিক গবেষণাতেও প্রমাণিত হয়েছে যে, আগুন, জল বা খোলা আকাশের মতো প্রাকৃতিক উপাদানের সঙ্গে সময় কাটালে উদ্বেগ ও মানসিক অস্থিরতা কমে। উরুকার রাত ছিল এমনই এক প্রাকৃতিক থেরাপির সময়—যার কোনো নাম না থাকলেও এর প্রভাব ছিল অত্যন্ত গভীর।
উরুকার রাতে রান্নাবান্নার প্রক্রিয়াটিও মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। একসঙ্গে কাজ করা, দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া এবং সহযোগিতার মাধ্যমে রান্না করা—এই সবকিছুই মানুষকে নিজের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করায়। অনেক সময় মানসিক সমস্যার মূল কারণ হয় ‘আমি কোনো কাজের যোগ্য নই’—এই ধারণা। উরুকার রাতে প্রত্যেক মানুষকেই কাঠ জোগাড় করা, রান্না করা, পানি আনা কিংবা পাহারা দেওয়ার মতো কোনো না কোনো দায়িত্ব নিতে হতো। এই অংশগ্রহণের অনুভূতি প্রত্যেক ব্যক্তির নিজের চোখে আত্মসম্মান বাড়িয়ে তুলত।

উরুকার রাতে ভোজের জন্য রান্না করা মাংস ও চুঙাপিঠা
উরুকার রাতের হাসি-ঠাট্টাই ছিল মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী উপাদান। কৌতুক, ঠাট্টা-মশকরা, গান কিংবা খেলাধুলার মধ্য দিয়ে এক আনন্দময় পরিবেশ তৈরি হতো। হাসি শুধু আনন্দের প্রকাশ নয়; এটি মানসিক চাপ কমায় এবং শরীরে সুখের হরমোন নিঃসরণে সাহায্য করে। আজকের দিনে যখন মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নানা সচেতনতা অভিযান চালানো হচ্ছে, তখন এই স্বাভাবিক হাসির সংস্কৃতির গুরুত্ব আরও ভালোভাবে বোঝা প্রয়োজন।
উরুকার রাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ‘নিঃশব্দ চিকিৎসা’। এখানে কারও কথা বলাই বাধ্যতামূলক ছিল না। কেউ নীরবে বসে থাকলেও একসঙ্গে থাকার অনুভূতি লাভ করত। আধুনিক মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় ‘সাইলেন্ট কম্প্যানিয়নশিপ’ (silent companionship)—যেখানে কথা না বললেও উপস্থিতি মানুষের মনে মানসিক নিরাপত্তা জোগায়।
এই রাতে এক ধরনের মানসিক ভারসাম্যও বজায় থাকত। ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবাই একসঙ্গে আগুনের পাশে বসত। দৈনন্দিন জীবনে যেখানে সামাজিক মর্যাদা মানুষের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করে, উরুকার রাত সেই দেয়াল ভেঙে দিত। এই সমতার অনুভূতি হীনমন্যতা ও আত্মগ্লানি কমাতে সাহায্য করত—যেগুলি বহু মানসিক সমস্যার মূল কারণ।

প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি
উরুকার রাতটি আনন্দের উৎসব হলেও, এটি ছিল শোক ও দুঃখ ভাগ করে নেওয়ার এক নীরব মঞ্চও। কেউ সরাসরি নিজের দুঃখের কথা না বললেও, অন্যের কথার মধ্যেই নিজেকে খুঁজে পেত। “আমার মতো অন্যরাও কষ্ট পেয়েছে”—এই অনুভূতি মানুষকে মানসিকভাবে আরও শক্তিশালী করে তুলত। আধুনিক সমাজে যাকে আমরা ‘সাপোর্ট গ্রুপ’ বলে থাকি, উরুকার রাত ছিল তারই এক ভিন্ন রূপ।
শিশুদের মানসিক বিকাশেও উরুকার রাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। প্রবীণদের কথা শুনে তারা জীবনের পাঠ শিখত—ধৈর্য, সাহস, সহযোগিতা এবং সামাজিক আচরণ আত্মস্থ করত। আজকের ডিজিটাল যুগে শিশুরা অনেক সময় মোবাইল স্ক্রিনে ব্যস্ত থাকে, কিন্তু উরুকার রাতের মতো সামাজিক পরিবেশ তাদের বাস্তব জীবনের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনে সহায়তা করত।
অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো, আধুনিক জীবনযাত্রায় উরুকার রাতের এই মানসিক দিকটি ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। মোবাইল ফোন, সামাজিক মাধ্যম ও ব্যস্ততার ভিড়ে মানুষ শারীরিকভাবে একসঙ্গে থাকলেও মানসিকভাবে অনেক দূরে সরে যাচ্ছে। বর্তমানে উরুকার রাত কেবল খাওয়া-দাওয়ার একটি আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে।

উরুকার রাতে পরিবারের সদস্যদের একসঙ্গে বসে সময় কাটানোর দৃশ্য
তবুও উরুকার রাত আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নিতে সব সময় চিকিৎসালয় বা ওষুধই একমাত্র উপায় নয়। একসঙ্গে সময় কাটানো, মন খুলে কথা বলা, নীরবে পাশে বসে থাকা এবং হাসি-ঠাট্টা করাও এক ধরনের শক্তিশালী চিকিৎসা।
যদি আমরা উরুকার রাতের এই গভীর মানবিক অর্থটি বুঝে আধুনিক প্রেক্ষাপটে আবার তা জীবন্ত করে তুলতে পারি, তাহলে এটি কেবল একটি উৎসব হয়েই থাকবে না; বরং এটি মানসিক সুস্থতার এক প্রাচীন অথচ চিরকাল প্রাসঙ্গিক পথ হয়ে উঠবে।