জয়পুরের দোকানে এখনও হাতে লেখা সময়

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 14 d ago
হাজি আজিমুদ্দিন তাঁর দোকানে
হাজি আজিমুদ্দিন তাঁর দোকানে
 
ফারহান ইসরাইলি/ জয়পুর 

ডিজিটাল যুগে হাতে লেখা ক্যালেন্ডারের কথা কখনও শুনেছেন? জয়পুরের রামগঞ্জ বাজারের সরু ও ব্যস্ত গলির ভেতরে একটি ছোট্ট দোকান আজও এমন এক ক্যালেন্ডার ছাপে, যা কম্পিউটারে নয়, মানুষের হাতে লেখা। দোকান নম্বর ১৩০, ‘কুরআন ঘর’ ও ‘নাঈম বুক ডিপো’, প্রায় এক শতাব্দী ধরে এই অনন্য ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রেখেছে। এই দোকানই রাজস্থানের বিখ্যাত ‘কোটা ক্যালেন্ডার’-এর একমাত্র বিক্রেতা। এই ক্যালেন্ডার শুধু তারিখের হিসেব নয়; এটি সময়, বিশ্বাস, ঐতিহ্য এবং মানুষের অটুট আস্থার এক জীবন্ত দলিল।
 
এই ক্যালেন্ডারের নেপথ্যের মানুষ ৭৫ বছর বয়সি হাজি আজিমুদ্দিন। গত ১৫ বছর ধরে তিনি নিজ হাতে এই ক্যালেন্ডার লিখে চলেছেন। গোলাপি ও সাদা রঙে ছাপা এই সাদামাটা চাঁদের ক্যালেন্ডার আজও মানুষের হৃদয়ে বিশেষ জায়গা দখল করে আছে, কারণ এর নির্মাতাদের উপর মানুষের বিশ্বাস কখনও টলেনি।
কোটা ক্যালেন্ডারের সূচনা করেছিলেন কাজি সালাউদ্দিন। সাধারণ মানুষের জন্য নির্ভুল ইসলামি চান্দ্র তারিখ পৌঁছে দেওয়াই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য। সেই সময়ে আধুনিক প্রযুক্তি তো দূরের কথা, পর্যাপ্ত সম্পদও ছিল না। হাতে লেখা এই ক্যালেন্ডার তখন মাত্র ১০০–১৫০ জন মানুষের কাছেই পৌঁছত।
 
প্রায় ১৫ বছর আগে কাজি সালাউদ্দিন এই ক্যালেন্ডারের দায়িত্ব রামগঞ্জ বাজারের নাঈম বুক ডিপোর হাতে তুলে দেন। সেখানেই হাজি আজিমুদ্দিন ক্যালেন্ডার লেখার সূক্ষ্ম কৌশল আয়ত্ত করেন। ধীরে ধীরে ব্যবসায়িক মহল এটিকে একটি সম্ভাবনাময় উদ্যোগ হিসেবে দেখতে শুরু করে।
 
কোটা ক্যালেন্ডার
 
শুরুতে মাত্র ১০–১২টি ক্যালেন্ডার ছাপা হতো। কিন্তু মানুষ যখন দেখল, ধর্মীয় ও দৈনন্দিন জীবনে এর তথ্য নির্ভুল ও বিশ্বাসযোগ্য, তখন চাহিদা বাড়তে থাকে। আজ প্রতি বছর প্রায় ৩০,০০০ কোটা ক্যালেন্ডার ছাপা হয় এবং রাজস্থানের প্রতিটি জেলায় তা পৌঁছে যায়। শুধু জয়পুর বা কোটা নয়, এখন এই ক্যালেন্ডার মধ্যপ্রদেশের রতলাম ও ইন্দোরেও পৌঁছেছে। এমনকি জয়পুর ও রাজস্থান থেকে বিদেশে থাকা মানুষজন হংকং, আমেরিকা সহ নানা দেশে এই ক্যালেন্ডার নিয়ে যান। এভাবেই কোটা ক্যালেন্ডার ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক পরিচিতিও পাচ্ছে।
 
কোটা ক্যালেন্ডারের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, একই সঙ্গে তিন ধরনের তারিখের তথ্য দেওয়া-- হিন্দি পঞ্জিকার তারিখ, ইংরেজি গ্রেগরিয়ান তারিখ, ইসলামি চান্দ্র তারিখ। এর পাশাপাশি এতে উরস ও অন্যান্য ধর্মীয় উৎসবের উল্লেখ, গুরুত্বপূর্ণ ইসলামি দিন, চাঁদের হিসেব (মাস ২৯ না ৩০ দিনের হবে), এবং চান্দ্র গণনার ব্যাখ্যা সাধারণ মানুষের ভাষায় তুলে ধরা হয়। ক্যালেন্ডারের পাতায় ছড়িয়ে থাকা ছোট ছোট অর্থবহ বার্তা একে নিছক তারিখের তালিকা থেকে অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে। এ কারণেই মানুষ সারা বছর ধরে এই ক্যালেন্ডারের উপর নির্ভর করে এবং যত্ন করে ঘর বা দোকানে রেখে দেয়।
 
হাজি আজিমুদ্দিন তাঁর দোকানে কোটা ক্যালেন্ডার তৈরির কাজের কিছু মুহূর্ত
 
হাজি আজিমুদ্দিন জানান, কোটা ক্যালেন্ডার তৈরি করা মোটেও সহজ কাজ নয়। বছরের শুরু হওয়ার প্রায় ছয় মাস আগে থেকেই প্রস্তুতি শুরু হয়। প্রথমে পুরো ক্যালেন্ডারের কাঠামো কাগজে হাতে লেখা হয়। এরপর প্রতিটি তারিখ, বার এবং চান্দ্র তারিখ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বসানো হয়। চান্দ্র তারিখ নির্ধারণই সবচেয়ে কঠিন কাজ, কারণ প্রতি মাসে সিদ্ধান্ত নিতে হয় মাসটি ২৯ দিনের হবে, না ৩০ দিনের।
 
এর জন্য গণনার পাশাপাশি প্রয়োজন বহু বছরের অভিজ্ঞতা। পুরো ক্যালেন্ডার প্রস্তুত হওয়ার পর তা কম্পিউটার লেআউটের জন্য ডিজাইনারের কাছে পাঠানো হয়। সেখান থেকে প্রুফ বেরিয়ে এলে প্রতিটি পৃষ্ঠা একাধিকবার খুঁটিয়ে দেখা হয়, যাতে কোনও ভুল না থাকে। হাজি আজিমুদ্দিন বলেন, মানুষ সারা বছর এই ক্যালেন্ডারের উপর ভরসা করে, তাই সামান্য ভুলও বড় সমস্যার কারণ হতে পারে।
 
হাজি আজিমুদ্দিন তাঁর দোকানে
 
তিনি বিশ্বাস করেন, চান্দ্র তারিখ শুধু অঙ্কের হিসেব নয়, এতে জীবনের অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধিরও ভূমিকা আছে। এখনও পর্যন্ত এতে কোনও বড় ভুল হয়নি। ৭৫ বছর বয়সেও হাজি আজিমুদ্দিন প্রতিদিন দোকানে বসে নিজে ক্যালেন্ডারের প্রতিটি কাজ তদারকি করেন। তাঁর কাছে এটি শুধু জীবিকার মাধ্যম নয়, এটি এক দায়িত্ব, এক ইবাদত।
 
নাঈম বুক ডিপো শুধু একটি দোকান নয়, এটি একটি উত্তরাধিকার। হাজি আজিমুদ্দিনের বাবা হাফিজ আলিমুদ্দিন তাঁর বড় ছেলের নামে এই দোকানটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। দোকানের নামের সঙ্গে ‘কুরআন ঘর’ যুক্ত, কারণ এখানে পবিত্র কুরআন ও ইসলামি সাহিত্য সংক্রান্ত সব ধরনের কাজ করা হয়। এই দোকানে ১৫টিরও বেশি ভাষায় পবিত্র কুরআন পাওয়া যায়। পাশাপাশি হাজি আজিমুদ্দিন নিজেও একাধিক বই লিখেছেন। বিশেষ করে শিশুদের জন্য তিনি নিয়মিত নতুন বই তৈরি করেন, যেগুলোর চাহিদা আজও প্রচুর।
 
নাঈম বুক ডিপো
 
গত ৪২ বছর ধরে হাজি আজিমুদ্দিন এই দোকান সামলাচ্ছেন। আজ তাঁর সঙ্গে কাজ করছেন ছেলে   মৈনুদ্দিন ও নাতি ফজলুদ্দিন, যাতে এই ঐতিহ্য ভবিষ্যতেও অটুট থাকে। সময়ের সঙ্গে কোটা ক্যালেন্ডারের দাম বদলেছে, শুরুতে যেখানে দাম ছিল প্রায় পাঁচ টাকা, ১৫ বছর আগে তা ছিল ৮–১০ টাকা, আর এখন দাম ৪০ টাকা। কিন্তু মানুষের বিশ্বাস একটুও কমেনি। কোটা ক্যালেন্ডার আজও প্রমাণ করে,যেখানে নিষ্ঠা, সততা ও বিশ্বাস আছে, সেখানে সময়ও মাথা নত করে।