১৯৯২ সাল থেকে অল অসম স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (AASU) ধারাবাহিকভাবে মনিকূট উৎসবের আয়োজন করে আসছে। এই উৎসবের মধ্য দিয়ে শুধু একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়, বরং সামাজিক সম্প্রীতির এক শক্তিশালী বার্তাও ছড়িয়ে দেওয়া হয়। আজ (১৫-০১-২৬) সেই উৎসবের সূচনা হচ্ছে এক বর্ণিল ও অর্থবহ পথযাত্রার মাধ্যমে, যেখানে সব সম্প্রদায়ের মানুষের অংশগ্রহণ থাকবে। মুসলিম সম্প্রদায়ের পবিত্র তীর্থ পোয়া মক্কা দরগাহ থেকে শুরু হয়ে এই শোভাযাত্রা শেষ হবে হাজোর ঐতিহাসিক ও ধর্মীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়গ্রীব মাধব মন্দিরে, যেন পথের মধ্যেই লেখা হচ্ছে সহাবস্থানের এক জীবন্ত কাব্য।
অসমের বুকে ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে অবস্থিত শান্ত শহর হাজো কেবল একটি তীর্থস্থানই নয়, এটি বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে সম্প্রীতির এক জীবন্ত প্রতীক। হিন্দু, ইসলাম ও বৌদ্ধ, এই তিন ধর্মের ‘ত্রিবেণী সঙ্গম’ নামে পরিচিত হাজো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সহাবস্থানের যে চেতনা বহন করে চলেছে, তা অসমের সাংস্কৃতিক পরিচয়কে সমৃদ্ধ করেছে। এখানে ঈশ্বরপ্রাপ্তির নানা পথ যেন নদীর মতো এসে মিশে যায় একই ভক্তির সাগরে।
হিন্দুদের কাছে হাজোর সর্বাধিক পবিত্র স্থান মনিকূট পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত হয়গ্রীব মাধব মন্দির। ১৫৮৩ খ্রিষ্টাব্দে আহোম যুগে রাজা রঘুদেব নারায়ণের নির্মিত এই মন্দির আহোম-কোচ স্থাপত্যরীতির অনন্য নিদর্শন, যার গায়ে খোদাই করা হাতি ও রামায়ণ-মহাভারতের নানা দৃশ্য আজও চোখে পড়ে। অশ্বমুখী বিষ্ণু, হয়গ্রীব রূপে নিবেদিত এই মন্দিরে প্রতি বছর হাজার হাজার ভক্তের সমাগম হয়। জনশ্রুতি অনুযায়ী, এখানেই বিষ্ণু ভক্তদের কাছে নিজেকে প্রকাশ করেছিলেন, আর মন্দিরের বিগ্রহটি স্বয়ম্ভূ বলে অনেকের বিশ্বাস। প্রাচীন অসমীয়া স্থাপত্যের সূক্ষ্ম অলঙ্করণে গড়া এই পাথরের মন্দির স্মৃতির অতীত কালের গল্প শোনায়।
তবে হয়গ্রীব মাধব মন্দিরের বিশেষত্ব এখানেই শেষ নয়। ভুটান, তিব্বত ও আরও দূরদেশের বৌদ্ধরাও এই স্থানকে গভীর শ্রদ্ধায় মানেন। তাঁদের বিশ্বাস, এখানেই বুদ্ধ পরিনির্বাণ, চূড়ান্ত জ্ঞানলাভে উপনীত হয়েছিলেন। মন্দিরের বাইরের দেয়ালে বিষ্ণুর নবম অবতার হিসেবে বুদ্ধের চিত্রায়ণ এই বিশ্বাসেরই ইঙ্গিত, যা সচেতন ধর্মতাত্ত্বিক সমন্বয়ের এক বিরল দৃষ্টান্ত। বিশ্বাসের এই ওভারল্যাপ হাজোকে এনে দিয়েছে এক অনন্য সার্বজনীনতা; যেখানে প্রতিযোগিতা নয়, সম্মিলিত শ্রদ্ধাই মুখ্য।
হয়গ্রীব মাধব মন্দির
মন্দির থেকে অল্প দূরত্বেই অবস্থিত পোয়া মক্কা, সুফি সাধক হজরত গিয়াসউদ্দিন আউলিয়ার দরগাহ। কিংবদন্তি অনুযায়ী, শতাব্দী আগে তিনি মক্কা থেকে এক মুঠো মাটি নিয়ে এসে এখানে দরগাহ নির্মাণ করেন, সেই থেকেই নাম ‘পওয়া মক্কা’, অর্থাৎ মক্কার এক-চতুর্থাংশ। আজও মুসলিম ভক্তদের ভিড় এখানে লেগেই থাকে, তবে এই পবিত্রতার পরিসর এক ধর্মে সীমাবদ্ধ নয়। বহু হিন্দুও এখানে এসে শ্রদ্ধায় মাথা নত করেন, ধূপ জ্বালান, করুণাময় সাধকের স্মরণে। বার্ষিক উরস উপলক্ষে হিন্দু-মুসলিম একসঙ্গে সমবেত হন; খাদ্য, সংগীত ও প্রার্থনায় ভাগ করে নেন ভ্রাতৃত্বের আনন্দ।
হাজোর বৌদ্ধ ঐতিহ্য এই ত্রিধারাকে পূর্ণতা দেয়। প্রাচীন কাহিনি ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন জানায়, পাল যুগে হাজো ছিল বৌদ্ধ শিক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। আশপাশে ছড়িয়ে থাকা ধ্বংসাবশেষে আজও প্রাচীন বিহার ও স্তূপের ইঙ্গিত মেলে। ভুটানসহ পার্শ্ববর্তী অঞ্চল থেকে আগত বৌদ্ধ তীর্থযাত্রীরা আজও গভীর ভক্তিতে হাজো দর্শনে আসেন, এখানে বুদ্ধের আশীর্বাদ বিরাজমান বলে তাঁদের বিশ্বাস। এভাবেই হাজো হয়ে ওঠে এক আধ্যাত্মিক সঙ্গম, যেখানে তিন ধর্মের প্রতীক ও সুর নির্বিঘ্নে মিলেমিশে যায়।
পোয়া মক্কা
তবে হাজোর প্রকৃত মাধুর্য কেবল তার স্থাপত্য বা কিংবদন্তিতে নয়, তার মানুষের মধ্যেই। সহাবস্থানের শিক্ষা এখানকার বাসিন্দারা দৈনন্দিন জীবনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ধারণ করে চলেছেন। একে অপরের উৎসব তাঁরা উদ্যাপন করেন, পবিত্র স্থান ভাগ করে নেন, পারস্পরিক শ্রদ্ধার এক নীরব নীতিতে জীবন যাপন করেন। উরসের সময় হিন্দু পরিবারের প্রদীপ জ্বালানো কিংবা মন্দিরের জন্য মুসলিম দোকানির প্রসাদ জোগান, এখানে এমন দৃশ্য অচেনা নয়। হাজোর চেতনা কেবল সহনশীলতা নয়, এটি গ্রহণযোগ্যতা, ভিন্নতাকে অন্তর থেকে সম্মান করার অভ্যাস।
পাহাড়ঘেরা এই জনপদে ব্রহ্মপুত্রের ধীর স্রোত বয়ে যায়, যেন হাজোর আধ্যাত্মিক শান্তিরই প্রতিবিম্ব। যখন হয়গ্রীব মাধব মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি উপত্যকায় প্রতিধ্বনিত হয় এবং পোয়া মক্কার আজানের সুর তার সঙ্গে মিশে যায়, তখন সময় যেন স্থির হয়ে দাঁড়ায়। বাতাসে ভেসে বেড়ায় না বিভেদের টানাপোড়েন, বরং শান্তির আশ্বাস। প্রতিটি কোণ ফিসফিস করে শোনায় এক চিরন্তন সত্য, ঈশ্বরের রূপ বহু, কিন্তু বাস এক হৃদয়েই।
হাজোর মনিকূট উৎসব উপলক্ষে হিন্দু ও মুসলমান উভয় জাতির একসঙ্গে শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ
আজকের সময়ে, যখন বিভাজন ও বিদ্বেষ প্রায়ই ঐক্য ও সহমর্মিতাকে আড়াল করে দেয়, হাজো দাঁড়িয়ে থাকে এক নীরব কিন্তু দৃঢ় বার্তা নিয়ে। এটি মনে করিয়ে দেয়, বিশ্বাস যদি দেয়াল না হয়ে সেতু হয়, তবে মানবসভ্যতা কতটা মানবিক ও সুন্দর হয়ে উঠতে পারে। হাজো আমাদের আহ্বান জানায় সম্প্রীতির পথে ফিরে আসার, শেখায় যে ঈশ্বরের সন্ধান বহু পথ দিয়ে শুরু হলেও তার শেষ গন্তব্য প্রায়ই এক ও অভিন্ন। ব্রহ্মপুত্রতীরের এই পবিত্র ভূমিতে তাই ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষ আজও একসঙ্গে প্রার্থনা করে, পাশাপাশি বসবাস করে, একসঙ্গে স্বপ্ন বোনে, প্রমাণ করে দেয় যে সর্বশ্রেষ্ঠ তীর্থযাত্রা কোনো নির্দিষ্ট উপাসনালয়ের দিকে নয়, বরং সহাবস্থান, শান্তি ও মানবতার চিরন্তন আত্মার দিকেই।