হিংসার আগুনে পুড়ে ছাই হয়েও জাগ্রত সংস্কৃতির প্রদীপ: ছায়ানট

Story by  Debkishor Chakraborty | Posted by  Aparna Das • 1 Months ago
হিংসার আগুনে পুড়ে ছাই হয়েও জাগ্রত সংস্কৃতির প্রদীপ: ছায়ানট
হিংসার আগুনে পুড়ে ছাই হয়েও জাগ্রত সংস্কৃতির প্রদীপ: ছায়ানট
 
দেবকিশোর চক্রবর্তী 

ভোরের আলো ফোটার আগেই গানের সুরে জেগে ওঠে রমনা। শিশিরভেজা ঘাস, বটগাছের ছায়া আর একদল মানুষের সম্মিলিত কণ্ঠ, এই চিত্রই বাঙালির কাছে ছায়ানটের প্রতীক। কিন্তু সেই চিরচেনা আনন্দের ভোর একদিন রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল। হিংসার নিষ্ঠুর আগুনে পুড়েছিল সংস্কৃতির অঙ্গন, কেঁপে উঠেছিল পুরো জাতির হৃদয়।
 
ছায়ানট কেবল একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান নয়, এটি বাঙালির আত্মপরিচয়ের এক দৃঢ় উচ্চারণ। ভাষা আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে, পাকিস্তানি শাসনের দমন-পীড়নের মধ্যেও যে প্রতিষ্ঠান গান, কবিতা আর অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল, সেই ছায়ানটই পরিণত হয় উগ্রবাদী সহিংসতার লক্ষ্যবস্তুতে।
 
২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল। বাংলা নববর্ষ। ভোরের প্রথম প্রহর। হাজারো মানুষ জড়ো হয়েছে রমনা বটমূল-এ। কারও হাতে ফুল, কারও চোখে স্বপ্ন, কারও কণ্ঠে গান। ঠিক তখনই বিকট বিস্ফোরণ। মুহূর্তের মধ্যে আনন্দের ভোর রূপ নেয় বিভীষিকায়। ছিন্নভিন্ন দেহ, আর্তনাদ, ধোঁয়া আর রক্ত, সংস্কৃতির পবিত্র মঞ্চে নেমে আসে মৃত্যুর ছায়া।
 
এই হামলা ছিল নিছক একটি সন্ত্রাসী ঘটনা নয়। এটি ছিল পরিকল্পিতভাবে বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনার ওপর আঘাত। যারা এই নৃশংসতা চালিয়েছিল, তারা জানত, ছায়ানট মানেই রবীন্দ্রনাথ, মানেই বৈশাখ, মানেই মুক্তচিন্তা। তাই গান থামাতে চেয়েছিল তারা, থামাতে চেয়েছিল উৎসব।
 
ঘটনার পরপরই দেশজুড়ে নেমে আসে শোকের স্তব্ধতা। সংবাদপত্রের শিরোনাম, মানুষের মুখের ভাষা, নিঃশব্দ চোখের জল, সবকিছুতেই ছিল একটাই প্রশ্ন: “আমরা কি নিরাপদ নই আমাদের সংস্কৃতির মাঝেও?” নিহতদের লাশের পাশে দাঁড়িয়ে স্বজনদের কান্না যেন পুরো জাতির কান্নায় পরিণত হয়।
 
কিন্তু এই কান্নাই একসময় রূপ নেয় প্রতিবাদে। শিল্পী, লেখক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, সবাই বুঝে যায়, ভয় পেলে চলবে না। কারণ ভয়ই হিংসার সবচেয়ে বড় সাফল্য। তাই শোককে শক্তিতে রূপান্তর করার সিদ্ধান্ত নেয় সমাজ।
 
ছায়ানটও পিছু হটেনি। রক্তাক্ত স্মৃতি নিয়েই তারা আবার গানের প্রস্তুতি নেয়। পরের বছর যখন আবারও বৈশাখের গান ভেসে আসে বটমূল থেকে, তখন সেই সুর ছিল আরও দৃঢ়, আরও গভীর। প্রতিটি কণ্ঠে ছিল এক অদৃশ্য শপথ, “সংস্কৃতিকে কেউ হত্যা করতে পারবে না।”
 
দীর্ঘদিন পর বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত হয়। আইনের শাসনের এই দৃষ্টান্ত কিছুটা হলেও স্বস্তি দেয়। তবে ক্ষত পুরোপুরি শুকায়নি। প্রতি বছর পহেলা বৈশাখ এলে অনেক চোখ আজও ভিজে ওঠে। গানের ফাঁকে ফাঁকে স্মৃতিতে ভেসে ওঠে সেই ভোরের বিভীষিকা।
 
তবু ইতিহাস বলে, হিংসা যত বড়ই হোক, সংস্কৃতি তার চেয়েও শক্তিশালী। ছায়ানটকে পুড়িয়ে ছাই করার চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু সেই ছাই থেকেই জন্ম নিয়েছে আরও দীপ্ত এক সাংস্কৃতিক প্রদীপ। বাঙালির গান আজও থামেনি, থামবেও না।
 
কারণ সংস্কৃতি শুধু বিনোদন নয়, এটি অস্তিত্বের ভাষা। আর সেই ভাষা যতদিন বেঁচে থাকবে, ছায়ানট ততদিন বাঙালির ভোর জাগিয়ে তুলবে গানের সুরে।