আওয়াজ দ্যা ভয়েস
বড়ো লোকসংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহী লোকনৃত্য ‘বাগুরুম্বা’ এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে উঠল গুয়াহাটিতে। অসম সরকারের উদ্যোগে আয়োজিত ‘বাগুরুম্বা দহৌ’ শীর্ষক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে রাজ্যের সহস্রাধিক শিল্পীর সম্মিলিত নৃত্য পরিবেশনে সরুসজাইয়ের অর্জুন ভোগেশ্বর বরুয়া ক্রীড়া প্রকল্প প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। খ্রাম ও সিফুংয়ের তালে তালে মুখরিত হয় সমগ্র প্রাঙ্গণ। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উপস্থিতিতে ১০ হাজারেরও বেশি শিল্পীর একযোগে বাগুরুম্বা নৃত্য পরিবেশন এই অনুষ্ঠানকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।
দু’দিনের সফরে শনিবার অসমে আসা প্রধানমন্ত্রী মোদী এই কর্মসূচিকে বড়ো সংস্কৃতির উদযাপন বলে মন্তব্য করে সমাজের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে সরকারের দায়বদ্ধতার কথা পুনরায় জোর দিয়ে বলেন। শুক্রবার এক্স-এ একটি পোস্টে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “এই কর্মসূচি বড়োদের মহান সংস্কৃতিকে উদযাপন করেছে। কেন্দ্র ও অসমের এনডিএ সরকার বডোফা উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মের স্বপ্ন পূরণে ব্যাপকভাবে কাজ করে চলেছে।”
বড়ো জনগোষ্ঠীর অন্যতম শ্রদ্ধেয় নেতা উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্ম ১৯৯০ সালে ৩৪ বছর বয়সে এক মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রয়াত হন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁকে ‘বডোফা’ (বড়োদের অভিভাবক) উপাধিতে সম্মানিত করা হয়।
রাজ্যপাল লক্ষ্মণ প্রসাদ আচার্য ও মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মাসহ অন্যান্যরাও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এই কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন।
‘বাগুরুম্বা দহৌ ২০২৬’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠানটি গুয়াহাটি মহানগরীর সরুসজাই এলাকার অর্জুন ভোগেশ্বর বরুয়া স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হয়। এতে ২৩টি জেলার ৮১টি বিধানসভা কেন্দ্রের প্রায় ৮,০০০ নৃত্যশিল্পীসহ মোট ১০,০০০-এরও বেশি শিল্পী অংশ নেন।
অসমের অন্যতম বৃহৎ খিলঞ্জিয়া জনগোষ্ঠী বড়ো সম্প্রদায়ের লোকনৃত্য ‘বাগুরুম্বা’ প্রকৃতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এটি ফোটা ফুলের প্রতীক এবং মানবজীবন ও প্রকৃতির পারস্পরিক সম্প্রীতির প্রতিচ্ছবি। বুইসাগু, বড়ো নববর্ষ ও ডোমাসির মতো উৎসবের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত এই নৃত্য শান্তি, উর্বরতা, আনন্দ ও সামষ্টিক সম্প্রীতির প্রতীক।
ঐতিহ্যগতভাবে এই নৃত্য নারীরা পরিবেশন করেন; পুরুষরা বাদ্যযন্ত্রবাদক হিসেবে তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন। প্রজাপতি, পাখি, পাতা ও ফুলের অনুকরণে এই নৃত্য অত্যন্ত আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে পরিবেশিত হয়।
গুয়াহাটিতে অনুষ্ঠিত এই নৃত্যানুষ্ঠানে বড়ো ভাষায় ‘ঢৌ’ অর্থাৎ ঢেউ বোঝানো শব্দ ‘দ্হৌ’ ব্যবহৃত হয়েছে। পাশাপাশি বড়ো ভাষার গান এবং খাম, চেরজা, সিফুং, জথা ও জাপশ্রিং-এর মতো ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্রের সংযোজন করা হয়। এর মধ্যে কয়েকটি বাদ্যযন্ত্র জিআই ট্যাগও পেয়েছে।
এই কর্মসূচিতে একাধিক বড়ো সংগঠন অংশ নেয়। ২৫ জন বিশেষজ্ঞ গুয়াহাটিতে ৪০০ জন মাস্টার ট্রেনারকে প্রশিক্ষণ দেন, যাঁরা পরে নিজ নিজ জেলায় শিল্পীদের প্রশিক্ষণ দেন। গত দু’বছরে রাজ্য সরকার একই ধরনের বৃহৎ পরিসরের বিহু ও ঝুমুর নৃত্য প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে, যেখানে প্রধানমন্ত্রী মোদী উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দু’দিনের সফরে শনিবার সন্ধ্যায় রাজ্যের রাজধানী গুয়াহাটিতে এসে এক বর্ণাঢ্য রোড শো-তে অংশ নেন। এই সফরে তিনি প্রায় ৭,০০০ কোটি টাকার প্রকল্প উদ্বোধন করবেন। লোকপ্রিয় গোপীনাথ বরদলৈ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বাইরে জাতীয় সড়ক-১৭-এ ঘূর্ণনপথ থেকে শুরু হওয়া এই রোড শো প্রায় চার কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে আজারায় শেষ হয়।
রোড শো চলাকালীন তাঁর যাত্রা ধীর হয়ে আসে এবং রাজপথে ‘মোদি জি জিন্দাবাদ’ ও ‘ভারত মাতা কি জয়’-এর মতো স্লোগান ধ্বনিত হয়। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মাসহ দলের অন্যান্য জ্যেষ্ঠ নেতারাও রোড শো-তে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন।
এদিকে, একই দিনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী পশ্চিমবঙ্গের মালদা থেকে প্রথম বন্দে ভারত স্লিপার ট্রেনের উদ্বোধন করেন। রেল মন্ত্রক জানিয়েছে, সাধারণ যাত্রীদের জন্য এর বাণিজ্যিক পরিষেবা শীঘ্রই শুরু হবে।
রেলওয়ের এক জ্যেষ্ঠ আধিকারিক বলেন, “এই ট্রেনটি এখনও সাধারণ যাত্রীদের বুকিংয়ের জন্য উপলব্ধ নয়। তবে বুকিং ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা চলছে। সাধারণ যাত্রীদের জন্য ট্রেনটি কবে চালু হবে, তা এখনও নির্ধারিত হয়নি।”
২০২৬ সালের ৮ জানুয়ারি মন্ত্রক ট্রেনটির সময়সূচি ও স্টপেজ সম্পর্কে একটি সার্কুলার জারি করে। সার্কুলার অনুযায়ী, কামাখ্যা স্টেশন থেকে সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিটে একটি ট্রেন সেট (ট্রেন নম্বর ২৭৫৭৬) যাত্রা শুরু করবে এবং ১৩টি স্টেশনে থেমে পরদিন সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে হাওড়ায় পৌঁছবে, ১৪ ঘণ্টায় ৯৭২ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করবে। অন্য ট্রেন সেটটি (ট্রেন নম্বর ২৭৫৭৫) হাওড়া থেকে সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটে যাত্রা শুরু করে পরদিন সকাল ৮টা ২০ মিনিটে কামাখ্যায় পৌঁছবে।
কামাখ্যা ও হাওড়ার মধ্যে ১৩টি স্টপেজ হলো, রঙিয়া, নিউ বঙাইগাঁও, নতুন আলিপুরদুয়ার, নিউ কোচবিহার, জলপাইগুড়ি রোড, নিউ জলপাইগুড়ি, আলুয়াবাড়ি রোড, মালদা টাউন, নিউ ফারাক্কা, আজিমগঞ্জ, কাটোয়া, নবদ্বীপ ধাম ও ব্যান্ডেল।
এছাড়াও, রবিবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী অসমের কাজিরাঙা জাতীয় উদ্যানে এলিভেটেড অ্যানিমাল করিডর এবং বিশ্বনাথ জেলা থেকে গোলাঘাট জেলার নুমলিগড় পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্র নদীর তলদেশ দিয়ে রেলপথসহ চার লেনের সড়ক প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন।