সাকিব সেলিম
“আমরা সবাই ভাইয়ের মতো একসঙ্গে বসবাস করেছি… ব্রিটিশদের অনুপস্থিতিতে আমরা প্রমাণ করে দিয়েছিলাম যে হিন্দু–মুসলমান প্রশ্ন বলে কিছুই ছিল না।” দিল্লির লালকেল্লায় অনুষ্ঠিত আইএনএ-র ঐতিহাসিক বিচারপর্বের পর জনসমাবেশে এই কথাগুলি বলেছিলেন জেনারেল শাহ নওয়াজ।
সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বে গঠিত আজাদ হিন্দ ফৌজ ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় গড়ে ওঠা অধিকাংশ আন্দোলনের তুলনায় ছিল সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে যেখানে অন্য অনেক গোষ্ঠী ধর্ম, জাতি বা ভাষার আশ্রয় নিয়েছিল, সেখানে আজাদ হিন্দ ফৌজ সেই পথ অনুসরণ করেনি। জমিয়ত-ই-উলেমা, হিন্দু মহাসভা এমনকি মহাত্মা গান্ধীও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে ধর্মীয় যুক্তি ব্যবহার করেছিলেন।কিন্তু আজাদ হিন্দ ফৌজ কোনো ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক প্রতীক ছাড়াই স্বাধীনতার যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল।
সুভাষচন্দ্র বসুর সচিব আবিদ হাসানের ভাষায়, “কেউ আমাদের বলেনি যে আমাদের তামিল বা ডোগরা, পাঞ্জাবি মুসলমান বা বাঙালি ব্রাহ্মণ, শিখ বা আদিবাসী হওয়া ছেড়ে দিতে হবে। আমরা এগুলো সবই ছিলাম, হয়তো আগের চেয়েও বেশি দৃঢ়ভাবে। কিন্তু এসব পরিচয় ব্যক্তিগত বিষয়ে পরিণত হয়েছিল। আমরা এই ধরনের গোষ্ঠীগত পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকিনি, কারণ ভারতই আমাদের লক্ষ্য হয়ে উঠেছিল এবং ভারতের মহত্ত্ব প্রতিষ্ঠাই ছিল আমাদের সাধনা। আমরা যখন বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠীতে ছিলাম, তখন আমাদের কোনো গুরুত্ব ছিল না; কিন্তু সমগ্র জাতির অংশ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিলাম।”
সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বাধীন আরজি হুকুমাত-ই-আজাদ হিন্দ সরকার (মুক্ত ভারতের অস্থায়ী সরকার) ও তার সেনাবাহিনী আজাদ হিন্দ ফৌজ কখনোই ‘সম্প্রদায়গত প্রতিনিধিত্ব’-এর প্রশ্নে জড়ায়নি, যে প্রশ্ন কংগ্রেস ও মুসলিম লিগের মধ্যে তীব্র বিতর্কের বিষয় ছিল। এর কারণ ছিল সুভাষচন্দ্র বসুর বিশ্বাস। তিনি বলেছিলেন, “মুসলমানরা নির্বাহী পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পাচ্ছে, এতে আমাদের আপত্তি থাকা উচিত নয়। আসল প্রশ্ন হলো, কী ধরনের মুসলমান সেই পরিষদে আসবেন। যদি মৌলানা আবুল কালাম আজাদ, আসফ আলী ও রফি আহমদ কিদওয়াইয়ের মতো মুসলমানরা আসেন, তবে ভারতের ভাগ্য নিরাপদ থাকবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি, এমন দেশপ্রেমিকদের পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়াই সঠিক। একজন দেশপ্রেমিক হিন্দু ও একজন দেশপ্রেমিক মুসলমানের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।”

সুভাষচন্দ্র বসু ও আরজি হুকুমাত-ই-আজাদ হিন্দ সরকার এমন এক ভারতীয় রাষ্ট্রের মডেল উপস্থাপন করেছিলেন, যেখানে বিভিন্ন ধর্ম, জাতি ও ভাষাগত গোষ্ঠীর মানুষ শান্তি ও সম্প্রীতির সঙ্গে বসবাস করতে পারে। এখানে মুসলমানরা সরকার ও সেনাবাহিনীর অংশ ছিলেন প্রতিনিধিত্বের দাবিতে নয়, বরং তাঁরা ছিলেন ভারতীয় নাগরিক বলেই। আমার বিশ্বাস, আজাদ হিন্দ ফৌজের এই সৈনিকরা যদি জানতে পারতেন যে ২০২৬ সালে কেউ তাঁদের ধর্মের ভিত্তিতে শ্রেণিবদ্ধ করছে, তবে তাঁরা গভীর বেদনা অনুভব করতেন।
আজ সুভাষচন্দ্র বসুর ভারতীয় রাষ্ট্রের স্বপ্ন কী ছিল, তা বোঝা অত্যন্ত জরুরি। তাঁর সঙ্গে থাকা মুসলমানরা কেমন ছিলেন এবং ভারতীয় রাষ্ট্র সম্পর্কে তাঁদের ধারণা কী ছিল, সেটাও জানা প্রয়োজন।
আবিদ হাসান সাফরানি
আবিদ হাসান সাফরানি: সুভাষচন্দ্র বসুর অন্যতম সাহসী ও বিখ্যাত কৃতিত্ব ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানি থেকে জাপান পর্যন্ত ৯০ দিনের সাবমেরিন যাত্রা। এই যাত্রায় তাঁর সঙ্গী ছিলেন আবিদ হাসান, একজন ইঞ্জিনিয়ারিং স্নাতক, যাঁর সঙ্গে সুভাষের পরিচয় হয়েছিল জার্মানিতে এবং যাঁকে তিনি ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে নিয়োগ করেন। এর মাধ্যমে আবিদ হাসান ও সুভাষচন্দ্র বসু সাবমেরিনে যাত্রাকারী প্রথম ভারতীয় হিসেবে ইতিহাসে স্থান পান।
এই যাত্রার সময় তাঁরা ভবিষ্যতের আইএনএ গঠনের পরিকল্পনা করেন। এখানেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে নারীদের নিয়ে একটি যোদ্ধা বাহিনী গড়ে তোলা হবে এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বসবাসরত ভারতীয় প্রবাসীদের নিয়োগ করা হবে। আইএনএ গঠনের আলোচনা চলাকালীন আবিদ হাসান ছিলেন সুভাষের ছায়াসঙ্গী।
জনপ্রিয় আলোচনায় আবিদ হাসান ‘জয় হিন্দ’ স্লোগানের প্রবর্তক এবং ‘জন গণ মন’-এর শব্দরূপ পরিবর্তনের জন্য পরিচিত, যা আজাদ হিন্দ সরকারের জাতীয় সংগীত হিসেবে গ্রহণ করা হয়। কিন্তু খুব কম মানুষই জানেন যে তিনি ইম্ফল ফ্রন্টে আইএনএ-র নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, যা ছিল যুদ্ধের অন্যতম ভয়াবহ অধ্যায়। ১৯৮৫ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি আজাদ হিন্দ ফৌজের আদর্শ প্রচার করে গেছেন।
আব্দুল হাবিব ইউসুফ মারফানি
আব্দুল হাবিব ইউসুফ মারফানি: রেঙ্গুনে বসবাসকারী ধনী গুজরাটি ব্যবসায়ী আব্দুল হাবিব ইউসুফ মারফানি ১৯৪৩ সালে আজাদ হিন্দ সরকার গঠনের পর নিয়মিতভাবে একবারে দুই থেকে তিন লক্ষ টাকা করে দান করতে শুরু করেন। এই অনুদান চলতে থাকে ৯ জুলাই ১৯৪৪ পর্যন্ত, যেদিন সুভাষচন্দ্র বসু একটি জনসভায় তহবিল সংগ্রহের আহ্বান জানান।
মারফানি তাঁর সমস্ত গয়না, সম্পত্তির দলিল ও নগদ অর্থ একটি রুপোর থালায় রেখে নেতাজির হাতে তুলে দেন। তখন এর মূল্য ছিল প্রায় এক কোটি টাকা। সবকিছু দান করার পর তিনি আজাদ হিন্দ ফৌজের একটি খাকি ইউনিফর্ম চেয়েছিলেন। নেতাজি তাঁকে আজাদ হিন্দ সরকারের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান ‘তামঘা-ই-সেবক-ই-হিন্দ’ প্রদান করে বলেন, “কিছু মানুষ বলে হাবিব পাগল হয়ে গেছে। আমি একমত। আমি চাই তোমরা সবাই পাগল হয়ে যাও। আমাদের দেশ ও মাতৃভূমির স্বাধীনতা অর্জনের জন্য আমাদের এমনই পাগল মানুষ দরকার।”
ক্যাপ্টেন মহম্মদ আক্রম: আইএনএ-র প্রথম শহিদ ক্যাপ্টেন মহম্মদ আক্রামকে আমরা কি চিনি? গিয়ানি কেশর সিং আইএনএ গঠনের ইতিহাস বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, “আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠিত হয়েছিল জিতরায় এবং ক্যাপ্টেন মোহন সিংকে জেনারেল অফিসার কমান্ডিং করা হয়। এই প্রথম আকাশ ফেটে উঠেছিল ‘আজাদ হিন্দুস্তান জিন্দাবাদ’ ও ‘আজাদ হিন্দ ফৌজ জিন্দাবাদ’ ধ্বনিতে। ক্যাপ্টেন মহম্মদ আকরম খান ও জমাদার সাধু সিং ছিলেন প্রথম দুই সদস্য।”
১৩ মার্চ ১৯৪২-এ আকরম, স্বামী সত্যানন্দ পুরী, সর্দার প্রীতম সিংসহ অন্যান্য নেতারা টোকিও যাওয়ার পথে বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হন। কর্নেল নরঞ্জন সিং গিল তাঁদের “আমাদের আন্দোলনের প্রথম শহিদ” বলে অভিহিত করেন।
সুলতানা সেলিম: সুভাষচন্দ্র বসুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে সুলতানা সেলিম ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মির (আইএনএ) রাণী ঝাঁসি রেজিমেন্টে যোগদান করেন। যুদ্ধকালীন সময়ে তিনি আইএনএর কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন সেলিমের সঙ্গে পরিচিত হন এবং সুভাষচন্দ্র বসুর আশীর্বাদে তাঁদের বিবাহ সম্পন্ন হয়। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর তাঁকে যুদ্ধবন্দি হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ১৯৪৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রাণী ঝাঁসি রেজিমেন্ট থেকে আসা যুদ্ধবন্দিদের প্রথম দলে তিনি ভারতে প্রত্যাবর্তন করেন।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকা ১৯৪৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে লেখে, “মিসেস সেলিম অনুভব করতেন যে তাঁর কাছে একমাত্র দেশ হলো হিন্দুস্থান এবং একমাত্র জাতি হলো হিন্দুস্তানি। তিনি সাম্প্রদায়িকতা বা প্রাদেশিকতাবাদে বিশ্বাস করতেন না। ভারতের ঐক্যই ছিল তাঁর কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয়। পূর্ব এশিয়ায়, তিনি বলেন, ধর্মীয় বা আঞ্চলিক ভেদের কোনো চেতনা নেই এবং অস্পৃশ্যতার সমস্যাও নেই। তাঁর বিশ্বাস ছিল, ভারত স্বাধীনতা অর্জন করলে দেশের বহু সমস্যাই খুব সহজে সমাধান হয়ে যাবে।”
লেফটেন্যান্ট কর্নেল এহসান কাদির
লেফটেন্যান্ট কর্নেল এহসান কাদির: আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠনের জন্য জেনারেল মোহন সিং এহসান কাদিরকে আজাদ হিন্দ রেডিওর পরিচালক হিসেবে নিয়োগ করেছিলেন। ১৯৪৩ সালে রাসবিহারী বসু সুভাষচন্দ্র বসুকে আন্দোলনের নেতৃত্ব অর্পণ করার পর, কাদির অস্থায়ী আজাদ হিন্দ সরকারের (আরজি হুকুমত-ই-আজাদ হিন্দ) সামরিক সচিব হিসেবে যোগ দেন। তিনি ৩০,০০০-এরও বেশি সদস্য নিয়ে গঠিত স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী ও আজাদ হিন্দ দলের নেতৃত্ব দেন।
হিন্দু-মুসলমান ঐক্য জোরদার করার জন্য একটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি পরিষদ গঠন করা হয় এবং কাদিরকে এর সভাপতি করা হয়। এই পরিষদ নিশ্চিত করত যাতে আজাদ হিন্দ ফৌজে কোনো ধর্মীয় বিভেদ সৃষ্টি না হয়। নেতাজির বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে কাদির তা বিশ্বাস করতে পারেননি এবং মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন।
কর্নেল শওকত আলি মালিক
কর্নেল শওকত আলি মালিক: ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বিজয় অর্জনের পর ভারতের মাটিতে জাতীয় পতাকা উত্তোলনকারী প্রথম ভারতীয় ছিলেন কর্নেল শওকত আলি মালিক। ১৯৪৪ সালের ১৪ এপ্রিল তিনি আজাদ হিন্দ ফৌজের বাহাদুর গ্রুপের কমান্ডার হিসেবে এই ঐতিহাসিক কৃতিত্ব অর্জন করেন। তিনি মণিপুরের মইরাঙে ব্রিটিশ বাহিনীকে পরাজিত করে একটি অসামরিক সরকার প্রতিষ্ঠা করেন।
পতাকা উত্তোলনের পর তিনি বলেন, “ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি ইন্দো-বর্মা সীমান্ত অতিক্রম করেছে এবং ব্রিটিশ শাসনের কবল থেকে ভারতবাসীকে মুক্ত করার সংগ্রামে আমরা আজ মণিপুরের প্রাচীন দুর্গ মইরাঙে উপস্থিত। আমাদের অঙ্গীকার দিল্লির দিকে অগ্রসর হওয়া এবং লালকেল্লায় ত্রিরঙ্গা উত্তোলন করা। আমাদের অনেক সহযোদ্ধা এই পথে শহিদ হয়েছেন, আরও অনেক দিল্লির পথে প্রাণ দেবেন। কিন্তু ভারতের পবিত্র ভূমি থেকে শত্রুকে উৎখাত করা আমাদের কর্তব্য। ভারতের স্বাধীনতা খুব কাছেই, তা আমাদের হাতের মুঠোয়। আমরা এই যুদ্ধে জয়ী হব এবং এরপর ভারতের জনগণের জন্য অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করব।”
শওকতের নেতৃত্বাধীন সরকার ১৯৪৪ সালের ১৫ জুলাই পর্যন্ত মইরাঙে কার্যকর ছিল। পরবর্তীতে আইএনএ যুদ্ধক্ষেত্রে বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়। তাঁর অসামান্য সাহসিকতার জন্য সুভাষচন্দ্র বসু তাঁকে তামঘা-ই-সর্দার-ই-জং, সর্বোচ্চ বীরত্ব পুরস্কারে ভূষিত করেন।
মেজর জেনারেল শাহনওয়াজ খান
মেজর জেনারেল শাহনওয়াজ খান: শাহনওয়াজ খান ছিলেন আইএনএর অন্যতম পরিচিত মুখ। যুদ্ধের পরে লালকেল্লায় আইএনএ সৈন্যদের বিচারের সময় তিনি ধিলন ও সেহগালের সঙ্গে আইএনএর প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন। তিনি আরাকান, নাগাল্যান্ড ও অন্যান্য সীমান্ত অঞ্চলে আজাদ হিন্দ ফৌজের নেতৃত্ব দেন।
তিনি লেখেন, “যখন আমাদের সৈন্যদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়, তখন উভয় বিভাগের কমান্ডারই ছিলেন মুসলমান, মেজর জেনারেল এম. জেড. কিয়ানি এবং আমি। ১৯৪৫ সালের আগস্টে নেতাজি যখন বিমানে টোকিওর উদ্দেশ্যে তাঁর শেষ যাত্রায় রওনা হন, তখন তিনি কর্নেল হাবিবুর রহমানকে তাঁর সঙ্গী হিসেবে নির্বাচন করেন। এই অনুভূতি কেবল সেনাবাহিনীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সাধারণ নাগরিকদের মধ্যেও নেতাজির বহু বড় সমর্থক ছিলেন মুসলমান। রেঙ্গুনের ধনী ব্যবসায়ী হাবিব নেতাজির জন্য এক জোড়া কাপড় কিনতে নিজের প্রায় এক কোটি টাকার সম্পত্তি দান করেছিলেন। এই সত্যগুলোর কারণেই আমরা আজাদ হিন্দ ফৌজ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, সব ভারতীয় একত্রে ভাই-বোনের মতো বসবাস করতে পারে এবং একটি মহান, মুক্ত ও ঐক্যবদ্ধ ভারতের জন্য কাজ করতে পারে।”
কর্নেল মেহবুব আহমদ: ১৯৪৩ সালে সিঙ্গাপুরে সুভাষচন্দ্র বসুর ভাষণ শুনে মেহবুব আহমদ আজাদ হিন্দ ফৌজে যোগ দেন। তিনি বলেন, “আমার জীবন একটিই। হাজার জীবন থাকলেও স্বেচ্ছায় সব সুভাষচন্দ্র বসুর চরণে উৎসর্গ করতাম।”
তিনি আরাকান ও ইম্ফল অভিযানের সময় শাহনওয়াজ খানের উপদেষ্টা ছিলেন। সুভাষ তাঁকে সামরিক সচিব নিযুক্ত করেন এবং অস্থায়ী আজাদ হিন্দ সরকার ও আইএনএর মধ্যে যোগাযোগ রক্ষাকারী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব দেন।
কর্নেল হাবিবুর রহমান
কর্নেল হাবিবুর রহমান: কর্নেল হাবিবুর রহমান জেনারেল মোহন সিংয়ের সঙ্গে আজাদ হিন্দ ফৌজের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। তিনি সদর দপ্তরের প্রশাসনিক বিভাগের প্রধান ছিলেন। সুভাষচন্দ্র বসু নেতৃত্ব গ্রহণের পর তাঁকে প্রশিক্ষণ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিযুক্ত করেন।
১৯৪৩ সালের ২১ অক্টোবর আজাদ হিন্দ সরকার গঠনের সময় তিনি মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। পরে তিনি ডেপুটি চিফ অফ আর্মি স্টাফ হন এবং ১৯৪৫ সালের ১৮ আগস্ট নেতাজির শেষ পরিচিত বিমানযাত্রায় তাঁর সঙ্গী ছিলেন।
মেজর জেনারেল মহম্মদ জামান খান কিয়ানি: জেনারেল মোহন সিং যখন আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠন করেন, তখন মহম্মদ জামান খান কিয়ানি জেনারেল স্টাফের প্রধান হন। সুভাষচন্দ্র বসু দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি আইএনএর প্রথম ডিভিশনের মন্ত্রী ও কমান্ডার নিযুক্ত হন। তাঁর ডিভিশনে নেহরু, আজাদ ও গান্ধী নামে তিনটি রেজিমেন্ট ছিল। বার্মা ফ্রন্টে তাঁর নেতৃত্বেই আইএনএ যুদ্ধ করে। নেতাজি যখন শেষবারের মতো সিঙ্গাপুর ত্যাগ করেন, তখন কিয়ানিকে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
আজাদ হিন্দ সরকারের উপদেষ্টা ও পুরস্কার: অস্থায়ী আজাদ হিন্দ সরকারের ছয়জন উপদেষ্টার মধ্যে করিম ঘানি ও ডি. এম. খান ছিলেন দু’জন। রাসবিহারী বসুও এই পরিষদের সদস্য ছিলেন। আজাদ হিন্দ ফৌজের পঞ্চাশেরও বেশি সৈন্যকে বিভিন্ন বীরত্ব পদকে ভূষিত করা হয়। এই পদকগুলো হলো, তামঘা-ই-সরদার-ই-জং, তামঘা-ই-বীর-ই-হিন্দ, তামঘা-ই-বাহাদুরি, তামঘা-ই-শত্রু নাশ এবং সেনাদ-ই-বাহাদুরি। বহু মুসলমান সৈন্য এই পদক লাভ করেন।
তামঘা-ই-সর্দার-ই-জং
* কর্নেল এস. এ. মালিক
* মেজর সিকন্দর খান
* মেজর আবিদ হুসেন
* ক্যাপ্টেন তাজ মহম্মদ
তামঘা-ই-বীর-ই-হিন্দ
* লেফটেন্যান্ট আশরাফি মণ্ডল
* লেফটেন্যান্ট ইনায়াত উল্লাহ
তামঘা-ই-বাহাদুরি
* হাবিলদার আহমেদ দিন
* হাবিলদার দিন মহম্মদ
* হাবিলদার হাকিম আলি
* হাবিলদার গুলাম হায়দার শাহ
তামঘা-ই-শত্রু নাশ
* হাবিলদার পীর মহম্মদ
* হাবিলদার হাকিম আলি
* নায়েক ফৈজ মহম্মদ
* সিপাহী গুলাম রসুল
* নায়েক ফৈজ বক্স
সেনাদ-ই-বাহাদুরি
* হাবিলদার আহমদ-উদ-দিন
* হাবিলদার মহম্মদ আখতার
* হাবিলদার গুলাব শাহ
এই তালিকা সম্পূর্ণ নয়। এতে বসির আহমদ, মুনাওয়ার হুসেন, আজিজ আহমদ খান, ইনায়াত কিয়ানি, নাজির আহমদ কিংবা ভিয়েতনামে ইন্ডিয়া ইন্ডিপেনডেন্স লিগের নেতা শেখ মহম্মদের মতো অনেকের নামই বাদ পড়েছে। প্রকৃতপক্ষে সবার নাম লেখা সম্ভব নয়।
আইএনএ এবং সুভাষচন্দ্র বসুর ইতিহাস আমাদের শেখায়, ভারতীয়রা জাতীয়তাবাদের আদর্শে ঐক্যবদ্ধ হতে পারে। এক সমন্বিত ভারত সম্ভব, যেখানে মানুষকে তাঁর ধর্মের জন্য নয়, তাঁর যোগ্যতা ও দেশের প্রতি ভালোবাসার জন্য বিচার করা হবে।