বিদুষী গৌর / নয়াদিল্লি
নয়াদিল্লির বিশ্ব বইমেলা ২০২৬-এ শব্দের অভাব ছিল না, কাগজে ছাপা অক্ষর, আলোচনার উত্তাপ, আর পাঠকের নীরব মনোযোগে ভরা ছিল চারপাশ। তবু সেই সমস্ত শব্দের ভিড়ের মধ্যেই হঠাৎ জন্ম নিল এক গভীর নীরবতা। কোনও ঘোষণা ছাড়াই, কোনও মঞ্চ ছাড়াই, একটি ওউদের সুর ধীরে ধীরে মানুষের কোলাহলকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে এল। কাতারের ওসামা বুকে জড়িয়ে রাখা প্রাচীন সেই বাদ্যযন্ত্রে আঙুল রাখতেই বইমেলা যেন নিজের গতি থামিয়ে শুনতে শুরু করল, শুধু কান দিয়ে নয়, হৃদয় দিয়ে।
বেস্টসেলার লেখক বা আলোচিত বক্তার চারপাশে নয়, সেদিন মানুষের বৃত্ত তৈরি হয়েছিল এক সংগীতশিল্পীকে ঘিরে। ওউদ বুকে ঠেসে বসেছিলেন ওসামা, নির্বাক, সংযত। তাঁর আঙুল যখন তার ছুঁতে শুরু করল, সুরের ভেতর যেন সময় ধীরে হয়ে এল। সেই সুর ছিল না উচ্চকিত, ছিল না প্রদর্শনীমুখী; ছিল গভীর, সংলগ্ন, আর আশ্চর্য রকমের অন্তরঙ্গ। মনে হচ্ছিল, এই সংগীত শোনার জন্য নয়, এর ভেতরে প্রবেশ করার জন্য।
ওউদের ইতিহাস সীমান্ত মানে না। এই বাদ্যযন্ত্র জন্ম নিয়েছিল এমন এক সময়ে, যখন ভূগোলের রেখা এত কড়া ছিল না, আর সংস্কৃতি ছিল চলমান নদীর মতো। সৌদি আরবে ওউদ শুধুই সঙ্গীতের মাধ্যম নয়, এ স্মৃতির বাহন, মজলিসে বসে বলা গল্পের সঙ্গী, অতীতের প্রশান্তি আর বর্তমানের অস্থিরতার মাঝখানে তৈরি এক নীরব সেতু। ওসামার বাজনায় সেই আরব উপদ্বীপের গন্ধ ছিল, কিন্তু একই সঙ্গে সুর ছুঁয়ে যাচ্ছিল আরও দূরের ভূখণ্ড।
যাঁরা দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় সংগীতচর্চার সঙ্গে পরিচিত, তাঁদের কানে এই সুরে ধরা পড়ছিল জাভানিজ গামেলানের ছায়া, ধীরে ধীরে উন্মোচিত হওয়া এক আবর্ত, যেখানে আবেগ হঠাৎ নয়, ধৈর্যের সঙ্গে প্রকাশ পায়। গামেলানে যেমন কেন্দাং তাল ধরে রাখে, তেমনই ওউদের সুর সেই মুহূর্তের আবহকে পথ দেখাচ্ছিল, কখনও বিষণ্ন, কখনও ভাবুক, কখনও বা অদ্ভুত শান্ত আনন্দে ভরা।
ওউদের শরীর নাশপাতির মতো বাঁকানো, এই রূপ কোনও আকস্মিক নকশা নয়, বরং শতাব্দীর অভিজ্ঞতার ফল। এর পেছনের গোলাকার অংশ তৈরি হয় আখরোট, রোজউড বা মহগনি কাঠ দিয়ে। পাতলা কাঠের রিব একে একে জুড়ে, তাপ আর আর্দ্রতার সাহায্যে হাতে বাঁকিয়ে তোলা হয়, যেন কাঠকে জোর করে নয়, বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে নিজের আকার নিতে দেওয়া হয়। সাউন্ডবোর্ড, সাধারণত স্প্রুস বা সিডার কাঠের, এমন নিখুঁত পাতলায় ছাঁটা হয় যাতে তা সহজে কেঁপে উঠতে পারে, আবার দীর্ঘদিনের স্পর্শ সহ্য করার শক্তিও রাখে।
ওউদ, একটি মধ্যপ্রাচ্যীয় বাদ্যযন্ত্র
সাউন্ডবোর্ডের কেন্দ্রে থাকে সূক্ষ্ম রোজেট খোদাই, লেসের মতো জটিল নকশা। এগুলো কেবল সৌন্দর্যের জন্য নয়; বাতাসের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে ওউদের স্বর তৈরি করে। সৌদি ঐতিহ্যে এই নকশায় প্রতিফলিত হয় ইসলামি শিল্পকলার জ্যামিতি, অন্তহীনতা, ভারসাম্য ও ধ্যানের ভাব। ওউদের গলা ছোট ও ফ্রেটবিহীন, ফলে সুরের মাঝখানে অনায়াসে পিছলে যাওয়া যায়। এই ফাঁকগুলোতেই বাস করে আবেগ, যেখানে দীর্ঘশ্বাস, আকুতি আর আনন্দ একই বাক্যে ধরা দেয়।
তারগুলো একসময় অন্ত্র দিয়ে তৈরি হতো, আজকাল নাইলন ও ধাতুই বেশি ব্যবহৃত হয়। জোড়ায় জোড়ায় টিউন করা এই তারে রিশা নামের পাতলা প্লেকট্রাম ছোঁয়ালে যে শব্দ বেরিয়ে আসে, তা চিৎকার করে না, কথা বলে। সৌদি আরবে এই সুরের সঙ্গে জুড়ে থাকে কবিতা, ধর্মীয় ভাবনা, আর দৈনন্দিন জীবনের গল্প। এই বৈশিষ্ট্য মালয় ও ইন্দোনেশীয় সংগীতধারার রেবাব বা গাম্বাসের সঙ্গেও মেলে, যেখানে সংগীত আলাদা কোনও মঞ্চের বিষয় নয়, বরং সামাজিক জীবনের স্বাভাবিক অঙ্গ।
সেদিন শ্রোতাদের ভিড় ছিল বিচিত্র, ছাত্র, কূটনীতিক, প্রকাশক, পরিবার। তবু ওউদ সেই সমস্ত পরিচয়ের দেওয়াল ভেঙে দিয়েছিল। এক শিশু সামনে মাটিতে বসে পড়েছিল। এক বৃদ্ধ চোখ বন্ধ করে শুনছিলেন। কেউ মোবাইলে মুহূর্ত বন্দি করছিল, কেউ শুধু উপস্থিত থাকছিল, সবাই যেন বুঝেছিল, কিছু অভিজ্ঞতা স্মৃতিতেই থাকাই ভালো। সেই বৃত্তে ওউদ হয়ে উঠেছিল পৃষ্ঠাহীন এক বই, যার গল্প অনুবাদের অপেক্ষা করে না।
২০২৬ সালের বিশ্ব বইমেলা, নয়াদিল্লিতে কাতারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের স্টল
শেষ সুরটি মিলিয়ে যাওয়ার পর কয়েক মুহূর্ত নীরবতা। তারপর ধীরে ধীরে উঠল করতালি উষ্ণ, অকৃত্রিম। ওসামা মৃদু হাসলেন। এই বিনয়ই ওউদের আত্মা। এই যন্ত্র আধিপত্য করে না; সে কথা বলে, শোনে, আর শোনায়। মরুভূমির আরব সমাজ থেকে ইন্দোনেশীয় গ্রামের মৌখিক ঐতিহ্যের মতো, এখানে অর্থ ভাগ করে নেওয়া হয়, প্রদর্শন করা নয়।
আজ ওউদের রূপ বদলাচ্ছে। নতুন কাঠ, কার্বন-রিইনফোর্সড গলা, আধুনিক অ্যাম্পলিফিকেশন, সবই যুক্ত হচ্ছে। তবু এর মূল সত্তা অটুট। এখনও তা তৈরি হয় এমন হাতে, যারা কাঠের দানা আর শব্দকে সম্মান করে; এখনও তা বাজানো হয় এমন সংগীতজ্ঞের দ্বারা, যারা জানেন, নীরবতা ছাড়া সুর অসম্পূর্ণ।
শব্দে ভরা বিশ্ব বইমেলার মাঝে ওউদ সেদিন মনে করিয়ে দিল, সব গল্প কালি আর কাগজে লেখা হয় না। কিছু গল্প জন্ম নেয় কাঠে খোদাই হয়ে, তারে বাঁধা থেকে, আর মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে যায় স্রেফ এক টুকরো সুর হয়ে। কাতারের ওসামার আঙুলে সেই প্রাচীন সৌদি বাদ্যযন্ত্র আবার প্রমাণ করল, সংগীতও শ্রেষ্ঠ বইয়ের মতোই, বহু দূর ভ্রমণ করে, আর শেষ হয়ে গিয়েও দীর্ঘদিন থেকে যায়।