অসলো
ইরানের বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী ও নোবেল শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্ত নার্গিস মোহাম্মদির গ্রেপ্তারকে ঘিরে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছে নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি। এক কড়া বিবৃতিতে কমিটি জানিয়েছে, মোহাম্মদির নিরাপত্তা ও বন্দিদশা নিয়ে তারা গভীরভাবে শঙ্কিত।
নোবেল কমিটি জানায়, নার্গিস মোহাম্মদিসহ একাধিক নাগরিক সমাজের কর্মীকে যেভাবে সহিংসতার মাধ্যমে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাতে তারা “চরমভাবে বিচলিত”। বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, ২০২৩ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্ত নার্গিস মোহাম্মদি দীর্ঘদিন ধরেই ইরানে মানবাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের পক্ষে নির্ভীক কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচিত।
কমিটি ইরানি কর্তৃপক্ষের কাছে অবিলম্বে মোহাম্মদির অবস্থান প্রকাশ করার, তাঁর শারীরিক নিরাপত্তা ও সুস্থতা নিশ্চিত করার এবং কোনো শর্ত ছাড়াই তাঁকে মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। পাশাপাশি, ইরানে শান্তিপূর্ণভাবে মানবাধিকার, আইনের শাসন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করা সকল মানুষের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেছে নোবেল কমিটি।
গ্রেপ্তারের সময়কাল নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে কমিটি। তারা উল্লেখ করেছে, ইরান ও ভেনেজুয়েলার ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে এই গ্রেপ্তার অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ একই সময়ে ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদো নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন।
উল্লেখযোগ্যভাবে, নার্গিস মোহাম্মদি ২০২৩ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন তখনও তিনি ইরানের কারাগারে বন্দি ছিলেন। গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে উঠেছেন, বিশেষত নারী অধিকার আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য। ২০০৩ সালে নোবেলজয়ী শিরিন এবাদির প্রতিষ্ঠিত ‘ডিফেন্ডার্স অব হিউম্যান রাইটস সেন্টার’-এ যোগ দিয়ে তিনি রাজনৈতিক বন্দিদের পক্ষে কাজ করেন, মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতা করেন এবং ইরানি কর্তৃপক্ষের নির্যাতন ও যৌন সহিংসতার চিত্র বিশ্বদরবারে তুলে ধরেন।
এই সক্রিয়তার মূল্য তাঁকে বারবার দিতে হয়েছে। নার্গিস মোহাম্মদি এখন পর্যন্ত ১৩ বার গ্রেপ্তার হয়েছেন এবং মোট ৩১ বছরের কারাদণ্ড ও ১৫৪ বেত্রাঘাতের সাজা পেয়েছেন। ২০২৩ সালের অক্টোবরে নোবেল পুরস্কার ঘোষণার সময় তিনি তেহরানের কুখ্যাত এভিন কারাগারে বন্দি ছিলেন।
কারাগারের ভেতর থেকেও তিনি আন্দোলনের কণ্ঠস্বর হয়ে থেকেছেন। ২০২২ সালের শরতে মাহসা জিনা আমিনির মৃত্যুর পর ইরানজুড়ে যে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, মোহাম্মদি সেই আন্দোলনকে জেলের ভেতর থেকেই সমর্থন ও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিলেন। ওই বিক্ষোভে সরকারের দমন-পীড়নে ৫০০-রও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়, হাজার হাজার মানুষ আহত হন এবং অন্তত ২০ হাজার জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
নোবেল পুরস্কার প্রসঙ্গে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে মোহাম্মদি বলেছিলেন, এই সম্মান তাঁর লড়াইকে আরও শক্তিশালী করবে। তাঁর কথায়, “গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও সমতার জন্য আমার সংগ্রাম কখনও থামবে না।” তিনি আরও বলেন, নোবেল শান্তি পুরস্কার তাঁকে আরও দৃঢ়, সহনশীল ও আশাবাদী করে তুলেছে।
নোবেল কমিটির এই তীব্র প্রতিক্রিয়া ইরানে রাজনৈতিক বন্দি ও মানবাধিকার রক্ষকদের প্রতি রাষ্ট্রের আচরণ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে বাড়তে থাকা উদ্বেগকেই স্পষ্ট করে তুলেছে, বিশেষত তাঁদের ক্ষেত্রে, যাঁরা শান্তিপূর্ণ উপায়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আছেন।