ভারত–রাশিয়া সম্পর্ক: অতীতের আস্থা থেকে ভবিষ্যতের শক্তিতে—পুতিনের সফরে নতুন যুগের সূচনা

Story by  Sudip sharma chowdhury | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 2 Months ago
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে করমর্দন করছেন(ফাইল চিত্র)
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে করমর্দন করছেন(ফাইল চিত্র)
 
সুদীপ শর্মা চৌধুরী ঃ
 
ভারত ও রাশিয়ার সম্পর্কের শিকড় বহু পুরনো—আস্থা, পারস্পরিক স্বার্থ এবং অটুট বন্ধুত্বের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এই সম্পর্ক সোভিয়েত যুগ থেকেই দুই দেশের কূটনীতিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। স্বাধীনতার পর ভারতের শিল্প–উন্নয়ন, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, মহাকাশ গবেষণা থেকে পারমাণবিক শক্তি—প্রায় সব ক্ষেত্রেই সোভিয়েত ইউনিয়নের সহযোগিতা ভারতকে বিশ্বমঞ্চে দৃঢ় অবস্থান নিতে সাহায্য করেছিল। ১৯৭১ সালের ভারত–সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি দুই দেশের বন্ধুত্বকে আরও দৃঢ় ভিত্তি দেয়।

শীতল যুদ্ধ–পরবর্তী পরিবর্তন ও রাশিয়ার নতুন উত্থান

১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর রাশিয়া যখন অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, সেই সময় ভারতও অর্থনৈতিক উদারীকরণের পথে হাঁটছিল। এই পরিবর্তন দুই দেশের সম্পর্ককে কিছুটা শিথিল করলেও কৌশলগত বিশ্বাস কখনও নষ্ট হয়নি।

২০০৪ সালের পর ভ্লাদিমির পুতিনের নেতৃত্বে রাশিয়া আবারও শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে উঠে আসে—জ্বালানি রপ্তানির সাফল্য, অর্থনীতির শক্তিবৃদ্ধি, সামরিক ক্ষমতার সম্প্রসারণ এবং বিশ্ব–রাজনীতিতে নতুন আত্মবিশ্বাস রাশিয়াকে আবারও একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে রূপান্তরিত করে।

কেন রাশিয়া ভারতের জন্য অমূল্য অংশীদার

ভারত এখনও তার প্রায় ৬০% প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রাশিয়া থেকে পেয়ে থাকে—সুখোই–৩০ এমকেআই, ব্রহ্মোস, টি–৯০, অরিহন্ত সাবমেরিন, পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র—সবকিছুই দুই দেশের সম্পর্কের গভীরতা প্রমাণ করে।আন্তর্জাতিক মঞ্চে কাশ্মীর–ইস্যু থেকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদ—সব ক্ষেত্রেই রাশিয়া ভারতের পাশে থেকেছে।

 

বর্তমান মোদি সরকারের অধীনে সম্পর্ক নতুন উচ্চতায়

নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ভারত–রাশিয়া সম্পর্ক আবারও নতুন গতিতে এগোতে শুরু করেছে।পার্থক্য দূর করে কৌশলগত বিশ্বাস পুনর্গঠন,প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় অভূতপূর্ব অগ্রগতি,জ্বালানি, বাণিজ্য, পরমাণু শক্তি, মহাকাশ—সব ক্ষেত্রে বহুমাত্রিক সহযোগিতা,BRICS ও SCO–তে সমন্বিত নেতৃত্ব ।এসব কারণে মস্কো–নয়াদিল্লি অক্ষ আজ আবারও বিশ্বের এক গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

পুতিনের সফর: ভবিষ্যতের মজবুত বন্ধুত্বের দিশা

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের আসন্ন ভারত সফর দুই দেশের সম্পর্কে এক নতুন অধ্যায় যোগ করবে বলে কূটনৈতিক মহলে জোর আলোচনা চলছে।এই সফরের মাধ্যমে—প্রতিরক্ষা উৎপাদনে যৌথ উদ্যোগ,ভারতকে জ্বালানি–নিরাপত্তায় দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা,আর্কটিক অঞ্চলে নতুন বাণিজ্য রুট,রাশিয়ার দূর–প্রাচ্যে ভারতীয় বিনিয়োগ,এবং ব্রহ্মোস ও পরবর্তী প্রজন্মের সামরিক প্রযুক্তি উন্নয়নে গভীর অংশীদারিত্ব—সবগুলোরই ব্যাপক অগ্রগতি আশা করা হচ্ছে।

ভবিষ্যৎ: আরও শক্তিশালী কৌশলগত বন্ধুত্ব

বিশ্ব যখন দুই মেরুতে বিভক্ত হচ্ছে, তখন ভারত ও রাশিয়া উভয়ই বহুধ্রুব বিশ্বব্যবস্থা (Multipolar World Order)–এর পক্ষে।
এই অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি দুই দেশের সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করে তুলেছে।

ভারত বুঝেছে—পুরনো পরীক্ষিত বন্ধু কখনও ভুলে যাওয়া উচিত নয়।আর রাশিয়া জানে—দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের মতো নির্ভরযোগ্য কৌশলগত অংশীদার আর নেই।

পুতিনের সফর তাই শুধু কূটনৈতিক অনুষ্ঠান নয়—এটি নতুন ভবিষ্যতের দরজা খুলে দেওয়ার এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত।